[ নি র্বা চ ন ]

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৩, ২১:৪৫
আজ (১৫ জুন) দেশের চারটি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন হলেও এই চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যেমন আগ্রহ-কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি এই নির্বাচনের ফলাফল দেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হলে সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরোধী দলের দাবি নাকচ করা যাবে। আবার বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী জিতলে সরকার পড়বে চাপের মধ্যে। তবে সেক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব—সে দাবি জোরালো হবে। স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন অরাজনৈতিকভাবে হওয়ার কথা থাকলেও দেখা যাচ্ছে সিটি নির্বাচন প্রকৃত অর্থে অরাজনৈতিক নেই। প্রার্থী মনোনয়ন দলীয়ভাবে না হলেও ঘটা করে দল বা জোটের পক্ষ থেকে মেয়র প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জানানোয় এই নির্বাচনকে কেউ আর নির্দলীয় বা অরাজনৈতিক বলে মনে করছেন না। নিজ নিজ দলের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে জাতীয় নেতৃবৃন্দও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। দলগুলো এই নির্বাচনে জেতা-হারাকে মর্যাদার লড়াই হিসেবেই নিয়েছে। গণমাধ্যমেও এই নির্বাচনের বিভিন্ন খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে চার সিটি নির্বাচনকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ড্রেস রিহার্সেল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটা বলা যায় যে, নির্বাচনকে ঘিরে কেবল চার সিটির ভোটারদের মধ্যেই উত্তেজনা বিরাজ করছে না, সারাদেশেই রাজনীতি সচেতন নাগরিকদের চোখ এখন খুলনা, রাজশাহী, সিলেট এবং বরিশালের দিকে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে চার সিটির বাইরেও আগ্রহী মানুষজনের মধ্যে। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক তেমন কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। শুধু বরিশাল সিটি করপোরেশনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের নিরাপত্তাকর্মী হারুন ১২ জুন সন্ধ্যায় পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। মেয়র প্রার্থী কামালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাকে লক্ষ্য করেই পুলিশ গুলি ছুঁড়েছে। কিন্তু পুলিশের ভাষ্য হলো, আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনের বিরুদ্ধে ‘আপত্তিকর’ লিফলেট বিলির সময় কামালের চারজন নারী কর্মীকে গ্রেফতার করা হলে তাদের ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং তখন ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে কামালের দেহরক্ষী গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যমূলক মনে না করে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখাই সম্ভবত শ্রেয় হবে। তবে এটা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ানো অথবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সুযোগ কামালের পক্ষ থেকে হাতছাড়া না করারই কথা। চারটি সিটি করপোরেশনেই নির্বাচনী প্রচারণা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে সব প্রার্থীর বিরুদ্ধেই। আওয়ামী লীগ বা ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থীরাই কেবল আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন তা নয়, বিএনপি তথা ১৮ দলীয় সমর্থিত প্রার্থীরাও আচরণবিধি লঙ্ঘনে কম যাননি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিস দেয়া ছাড়া আর কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশনের জন্য চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন একটি বড় পরীক্ষা। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কি-না তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি শুরু থেকেই অনাস্থা প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সরকার অনুগত বলেও মনে করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অমূলক বা ভিত্তিহীন সেটা প্রমাণের সুযোগ নির্বাচন কমিশন পেয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়ায় নির্বাচন কমিশনকে শতভাগ আন্তরিকতা নিয়ে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ যেন কেউ না পায়। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া ভোটকেন্দ্রে আসা-যাওয়ার পথেও ভোটারদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি তোলা হলেও নির্বাচন কমিশন তা বাতিল করেছে। নির্বাচন কমিশন যে ভুল করেনি, তা তাদেরই প্রমাণ করতে হবে। স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনে সাধারণত প্রার্থীর ব্যক্তিগত গুণাগুণ, যোগ্যতা ও স্থানীয় সমস্যাবলী ভোটারদের কাছে প্রধান বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু এবার সিটি নির্বাচনে এগুলোর বাইরে জাতীয় রাজনীতির বিষয়ও সামনে আসছে। চারটি সিটি করপোরেশনেই আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন, অর্থাত্ সদ্য বিদায়ী চার মেয়রই সরকারি দলের। ফলে এবার তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়ন ভোটাররা করবেন এটাই স্বাভাবিক। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, আমাদের দেশের ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়ে থাকেন। ক্ষমতায় থাকলে বা নির্বাচিত হলে সবার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব হয় না বলেই পরের নির্বাচনে আগের বিজয়ীদের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এবার বরিশাল, খুলনা, সিলেট এবং রাজশাহী থেকে যেসব খবর পাওয়া গেছে তা থেকে এটা বলা যায় না যে, ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। চারটি সিটিতেই বিদায়ী মেয়রদের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্যের পাল্লা ভারী বলেই শোনা যায়। তাছাড়া সরকারদলীয় প্রার্থীদের তুলনায় বিরোধী দলের প্রার্থীরা গুণে-মানে সেরা এটাও একবাক্যে কেউ বলতে পারছেন না। সেজন্য বিরোধী দলের সমর্থিত প্রার্থীরা তাদের পক্ষে হাওয়া তৈরি করতে পারেননি। কোনো প্রার্থীর পক্ষেই জোয়ার তৈরি হয়নি। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, কোনো সিটি থেকেই এমন তথ্য পাওয়া যায়নি যা থেকে বলা যায় যে, বিশেষ কোনো প্রার্থী অনায়াসে জয়লাভ করবেন। লড়াই হবে সমানে সমান। এই নির্বাচনের একটি বড় রাজনৈতিক তাত্পর্যের দিক হচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রশ্নে এতদিন বিএনপির মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এবার তারা অত্যন্ত পরিষ্কার অবস্থান নিতে পারায় দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে সর্বত্রই বিএনপি নেতৃত্ব বহুধাবিভক্ত। (আওয়ামী লীগও তাই)। সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চারটি সিটিতে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দলীয় সমর্থিত প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে আনার জন্য নেতাকর্মীরা নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে নেমে পড়েছেন বলেই জানা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মধ্যে সমস্যা রয়েই গেছে। কেন্দ্র থেকে উদ্যোগ নিয়েও সব জায়গায় দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামানো গেছে— এই দাবি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করা হলেও মানুষের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। বরিশালে মেয়র পদে একজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছেন। নির্বাচনে জেতার জন্য প্রার্থীরা টাকা ছড়াচ্ছেন—এমন খবর মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে। কিন্তু টাকা ছড়ানো বন্ধ করার কোনো কার্যকর উপায় নিয়ে কোনো কথা কেউ বলছেন না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এর বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি। টাকা দিয়ে ভোট কেনার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে ভোটারদের সচেতন প্রতিরোধের চেয়ে ভালো বিকল্প কিছু নেই। তবে নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর নাশকতা পরিকল্পনার যে খবর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ভেতর অস্থিরতা তৈরির কোনো অশুভ পরিকল্পনা কেউ যাতে নির্বাচনকে ঘিরে বাস্তবায়ন করতে না পারে সেদিকে প্রশাসনের সতর্ক নজরদারি থাকতে হবে। বোমাবাজি, ভোটকেন্দ্র দখল ইত্যাদি ঘটনা যেন কোনো মহল থেকেই ঘটাতে না পারে সেটা নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন কিংবা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপর সব দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী এবং ভোটারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ভালো নির্বাচন হওয়া সম্ভব। চার সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও নিশ্চয়ই এমন কিছু করবেন না, যাতে সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে অন্তরায় সৃষ্টি হতে পারে। গত ১২ জুন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই বলে অভিযোগ করেছেন যে, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার ছলে-বলে-কৌশলে অন্যায়ভাবে জনপ্রিয় প্রার্থীদের পরাজিত করার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ভীত হয়ে জনগণের রায় কারচুপি ও চক্রান্ত করে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। এটা করলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। সেখান থেকেই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে মির্জা ফখরুলের বক্তৃতায়। নির্বাচনে তাদের প্রার্থী জিতলে তারা বলবেন সরকারের বিরুদ্ধে গণরায় পাওয়া গেছে, এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতেই হবে। আর যদি তাদের প্রার্থী জিততে না পারেন তাহলে বলা হবে কারচুপি হয়েছে, বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। কাজেই নির্বাচনের এই ফল মানি না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের পরের দিনই হরতাল কর্মসূচি নাকি ঠিক করেই রাখা হয়েছে। বিএনপিকে এটা বুঝতে হবে যে, পরিকল্পনা বা নকশা করে আন্দোলন হয় না। কোন ঘটনায় কখন মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে সেটা আগে থেকে বলা যায় না। তবে এটা বলা যায় যে, দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। নির্বাচনের মাধ্যমেই পরিবর্তন চায়। সংঘাত-সংঘর্ষ-হানাহানি চায় না। নির্বাচনে মানুষ যে রায় দেবে সেটা সবাই মেনে নেবেন—এটাই দেশবাসীর বড় প্রত্যাশা। নির্বাচনের ফলাফল যার বিরুদ্ধে যাবে, তার কাছ থেকে সংযম ও সহনশীল আচরণ পাওয়া না গেলে দেশে গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হবে কীভাবে? লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট ই-মেইল :[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন