সরকার তড়িঘড়ি করিয়া সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০১৩ পাস করিয়াছে এবং সর্বমহলে ইহা সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। বিশেষত আইন বিশেষজ্ঞরা মত দিয়াছেন, এই আইনের অপপ্রয়োগ হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে এবং ইহার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হইবে। তাহারা এইরকমও মনে করিতেছেন যে, যেইসব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই সংশোধনী আনা হইয়াছে সেইসব অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট আইন দেশে বিদ্যমান রহিয়াছে। এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের ফলে অতীতের ন্যায় ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা লংঘনের যথেষ্ট আশংকা রহিয়াছে। সম্পত্তি সুরক্ষায় অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করিয়াছে। আইনটিতে পুলিশকে দেওয়া হইয়াছে অবাধ ক্ষমতা। বিরোধীদলীয় শক্তিকে দমন করিবার অভিপ্রায় এই আইনের সংশোধনের মধ্যে লুক্কায়িত রহিয়াছে। উপরন্তু, আইনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের বিধিও অন্তর্ভুক্ত করিয়াছে, কিন্তু তাহা করিয়াছে বহিস্থ সংস্থার চাপের মুখে। বিগত ৩ জুন এই আইন সংক্রান্ত বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। মাত্র আটদিনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষার পর মঙ্গলবার বিলটি পাস করা হয়।
এই সংশোধিত আইনটি আদালতের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায় বিচার পাইবার অধিকার হরণ করিয়াছে, জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ক্ষমতা বৃদ্ধি করিয়াছে। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিবার অধিকার ডিসিদের দেওয়া হইয়াছে। অন্যদিকে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বক্তব্য বিনা বাক্য ব্যয়ে গ্রহণ করিতে আদালতকে বাধ্য করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। সংশোধনীতে দেশের প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের পরিবর্তে পুলিশের বক্তব্য গ্রহণ করিতে বলা হইয়াছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী আনয়নের ফলে নির্বাহী বিভাগের শক্তিবৃদ্ধির মাধ্যমে বিরোধীদের দলনকার্যে সরকার এই আইনটি যে ব্যবহার করিবে ইহা সন্দেহ করিবার অবকাশ রহিয়াছে। তবে বিরোধীদলের দিক হইতে এই সংশোধনীর ব্যাপারে যথাযথ প্রতিবাদ-ব্যাখ্যা হাজির করিতে দেখা যাইতেছে না। এই সংশোধিত আইন অতীতের কিছু কালাকানুন যেমন, জননিরাপত্তা আইনের মতোই চেহারা পাইয়াছে।
সংশোধিত আইনটি মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার হইতে জনসাধারণকে বঞ্চিত করিতে চায়। বিশেষত এই আইনে বলা হইয়াছে ব্লগ-টুইটার-স্কাইপের বক্তব্য, স্থির ও চলচ্চিত্র সাক্ষ্য হিসাবে আদালতে হাজির করা যাইবে। ইন্টারনেটে সামাজিক মাধ্যমে জনগণের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের প্রবণতাটি পৃথিবীর সব সরকারই ভীতির চোখে দেখিতেছে। অনলাইন ব্যবহারকারীরা কেবল স্বাধীনভাবে মতই দেয় না, তাহারা পরস্পর মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারবিরোধী মতামত গড়িয়া তুলিতেছে— অনেকক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগত্ হইতে প্রকৃত জগতে আসিয়া প্রতিবাদ জানাইতেছে। এই স্বাধীন মত প্রকাশের ধারাটিকে কর্তন করিবার জন্য সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যকে আইনের আওতায় আনিয়া বিচার করিতে চাহিতেছে সরকার। তাই অসাংবিধানিক হইলেও, এই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করিতে সচেষ্ট হইয়াছে সরকার, এই সংশোধিত আইনের মাধ্যমে।
অন্যদিকে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফটিএফ) চাপে এবং কালো তালিকাভুক্তি এড়াইতে এই সংশোধিত আইনটি পাস করা হইয়াছে। আগামী সপ্তাহে নরওয়েতে সংস্থাটির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী কমিটির বৈঠক হইবার কথা। যেইসব দেশ এফটিএফের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে না, তাহাদের প্রতি বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয় এবং সন্দেহভাজন তালিকায় তাহাদের নাম উঠিয়া আসে। ৩৬টি দেশ লইয়া গঠিত এই সংস্থা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাজ করিয়া থাকে। এফটিএফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুদিন ধরিয়াই এইরূপ একটি আইন প্রবর্তনের জন্য চাপ দিয়া আসিতেছিল যাহাতে তথাকথিত সন্ত্রাস দমন ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শক্তি এই দেশে বাধাহীনভাবে কাজ করিতে পারে। সংসদের এখতিয়ারবহির্ভূত এবং সংবিধানপরিপন্থি এই বিল উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কেননা সংবিধান পরিপন্থি কোন আইন কোন সংসদ প্রণয়ন করিতে পারে না। আর সংবিধানেই বলা হইয়াছে কোন আইন যতটুকু সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততটুকু বাতিল বলে গণ্য হইবে। তাই এই সংশোধিত আইনটি সরকার কিংবা আদালতের কোনো এক পর্যায় হইতে রহিত করা হইবে, এই আমাদের বিশ্বাস।
