ঢাকা-দোহার সড়কের চরম দুরবস্থা

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৩, ২১:৪৭
অতি গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-দোহার সড়কটিকে এখন আর সড়ক বলিবার উপায় নাই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ উপেক্ষার পরিণামে সড়কটির বৃহদংশই পরিণত হইয়াছে মৃত্যুফাঁদে। ঢাকার গুলিস্তান হইতে দোহার উপজেলার বাহ্রা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার সড়কের ৪০ কিলোমিটারই বড়ো বড়ো গর্ত ও বিপজ্জনক খানাখন্দে ভরা। দোহার উপজেলার কার্তিকপুর বাজার হইতে শুরু করিয়া চরকুশাই, করিমগঞ্জ, বাঁশতলা, লটাখোলা মোড় হইয়া জয়পাড়া বাজার পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন স্থানের পিচ, ইট ও সুরকি সবই উধাও হইয়া গিয়াছে। তৈরি হইয়াছে এক হইতে দেড় ফুট গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলি পানিতে ভরিয়া যায়। ফলে দুর্ঘটনা ও দুর্ভোগই হইয়া দাঁড়াইয়াছে এই পথে যাতায়াতকারী যাত্রী ও যানবাহনগুলির নিয়তি। ভুক্তভোগীরা জানাইয়াছেন যে ২০০৫ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দোহারের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে সড়কটি সংস্কার করা হইয়াছিল। ইহার পর গত ৮ বত্সরে কেহ এইদিকে নজর দেয় নাই। কেন দেন নাই তাহা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলিতে পারিবেন। সর্বশেষ গত মে মাসে বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়কটির দুরবস্থা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া গিয়াছেন। অস্থায়ী ভিত্তিতে গর্ত ও খানাখন্দ ভরাট করিয়া সড়কটি চলাচলের উপযোগী করিবার নির্দেশও দিয়াছিলেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে। কিন্তু গত একমাসেও সংস্কার কাজ শুরু হয় নাই। শুধু তাহাই নহে, আগামী শুষ্ক মৌসুমের আগে যে সংস্কার কাজ শুরুর কোনো সম্ভাবনা নাই— তাহাও নিশ্চিত করিয়াছেন সওজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তবে ইহাও নির্ভর করিতেছে অর্থবরাদ্দ প্রাপ্তির উপর। জনদুর্ভোগ ইতিমধ্যে চরমে পৌঁছিয়াছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো আছেই, সেই সাথে অপচয় হইতেছে অঢেল সময়ও। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের শ্রীনগর বাইপাস হইয়া দোহারের বাহ্রা ঘাট পর্যন্ত মাত্র ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হইতেছে দুই ঘন্টায়। প্রতিকারহীন এই দুর্ভোগের কারণে বাসমালিক-শ্রমিক হইতে শুরু করিয়া স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী পর্যন্ত সকলেই ক্ষুব্ধ। দলমতনির্বিশেষে দোহারের জনগণ দীর্ঘদিন যাবত্ সড়কটি সংস্কারের দাবি জানাইয়া আসিতেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কেন ইহাতে কর্ণপাত করিতেছেন না— তাহা তাহাদের বোধগম্য নহে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দেশটি যে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি দ্বারা বিভাজিত হইয়া পড়িয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সড়ক ও সেতু নির্মাণ বা সংস্কারের মতো সর্বজনীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও যে এই অসুস্থ প্রবণতা হইতে মুক্ত নহে— তাহাও দেশবাসীর অজানা নহে। কারণ সরকার বদল হইবার সাথে সাথে জনগুরুত্বপূর্ণ বহু উন্নয়ন কাজ মাঝ পথে বন্ধ হইয়া যাইবার অভিজ্ঞতা যেমন তাহাদের আছে, তেমনি বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণের বিষয়টিও এক প্রকার ‘ওপেন সিক্রেট’ই বলা যায়। ঢাকা-দোহার সড়কটিও অনুরূপ কোনো সংকীর্ণ মানসিকতার শিকার হইয়াছে কিনা আমরা জানি না। কারণ যাহাই হউক, দীর্ঘ ৮ বত্সর ধরিয়া এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক সংস্কার না হওয়ার বিষয়টি যে খুবই দুর্ভাগ্যজনক তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নহে। দেশের বেশিরভাগ সড়ক-মহাসড়কের অবস্থাই অত্যন্ত শোচনীয়। কারণ হিসাবে প্রায়শ অর্থাভাবের কথা বলা হইতেছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠিতে পারে যে অর্থাভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলির সংস্কারই যেইখানে দুঃসাধ্য হইয়া পড়িয়াছে, সেইখানে নূতন নূতন এতো সড়ক নির্মাণ করিবার আবশ্যকতা কী? প্রসঙ্গত ইহাও বলা প্রয়োজন যে সড়ক বা সেতু কখনো কোনো দলের হইতে পারে না। যে বা যাহারাই ইহা নির্মাণ করুক আখেরে জনগণই তাহার সুফল ভোগ করিয়া থাকে। শত শত বত্সর ধরিয়া এইভাবেই চলিয়া আসিতেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন বলিয়াই আমরা জানি। আমাদের সংবিধানেও সকল অঞ্চলের সমতাভিত্তিক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে। অতএব, এই ধরনের কাজে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা অন্য যে কোনো প্রকার বৈষম্য বিষবত্ জ্ঞানে পরিত্যাজ্য বলিয়া আমরা মনে করি। অনতিবিলম্বে ঢাকা-দোহার সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হইবে— ইহাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন