প্রস্তাবিত বাজেট সম্প্রারণরমূলক। কিন্তু কৃষি বাজেট সংকোচনমূলক। বিশাল আকৃতির নয়া বাজেটে ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের জন্য অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন মিলে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৃহত্তর কৃষি খাতের জন্য ব্যয় হবে ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। চলতি ২০১২-১৩ অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটের প্রবৃদ্ধির হার ১৭.৫২ শতাংশ। পক্ষান্তরে বৃহত্তর কৃষি খাতের বাজেট হ্রাস পেয়েছে ১১.৯৫ শতাংশ। কৃষির বিভিন্ন উপখাতের মধ্যে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ শস্য উপখাতের হিস্যা হ্রাস পেয়েছে সবচেয়ে বেশি, শতকরা ১৭.৫৩ ভাগ। অর্থাত্ যে হারে মোট বাজেট বেড়েছে , সে হারে কমেছে শস্য বাজেট। যার প্রতিফলন ঘটেছে বৃহত্তর কৃষি খাতে। এর সঙ্গে প্রায় ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি যোগ করা হলে বৃহত্তর কৃষি খাতের ব্যয় শতকরা প্রায় ২০ ভাগ এবং শস্য খাতের ব্যয় শতকরা প্রায় ২৫.৫৩ ভাগ হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে কৃষি খাতের প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতা দেখানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান। এর পরিণামে কৃষি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। বেড়ে যাবে মূল্যস্ফীতি। দারিদ্র্য বিমোচনের গতি শ্লথ হয়ে আসবে। হ্রাস পাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি।
কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে পল্লী উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার সুসংহতকরণ। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রাস্তাঘাট মেরামত করার সঙ্গে কৃষিপণ্য বিপণনের সুবিধাদি জড়িত। কৃষি বহির্ভূত গ্রামীণ খাতের সমপ্রসারণের উপরও কৃষি খাতের বিকাশ ও বহুধাকরণ নির্ভরশীল। সে কারণে কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে পল্লী উন্নয়নকে এক সঙ্গে বিবেচনা করে বাজেটের বরাদ্দ সঞ্চালন করা হয়। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে পল্লী উন্নয়নের বরাদ্দ ৯.৬৬ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকারের বরাদ্দ ১.৯৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কৃষি, মত্স ও প্রাণিসম্পদ, ভূমি, পরিবেশ ও বন, পল্লী উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার ও পাট মন্ত্রণালয় মিলে সার্বিক কৃষি ও গ্রামীণ খাতের বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে ৭.৩৮ শতাংশ। মোট বাজেটে শস্য খাতের শরিকানা ২০১২-১৩ সালের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৭.৮৬ শতাংশ, প্রস্তাবিত ২০১৩-২০১৪ সালের বাজেটে তা হ্রাস পেয়েছে ৫.৫১ শতাংশ। বৃহত্তর কৃষি খাতের শরিকানা ১০.৪৮ শতাংশ থেকে কমে গেছে ৭.৮৫ শতাংশে। পল্লী উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকারসহ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতের শরিকানা হ্রাস পেয়েছে ১৮.৪১ শতাংশ থেকে ১৪.৫১ শতাংশে। এটি বৃদ্ধি করে মোট বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাত্ ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।
কৃষি বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপকরণ ভর্তুকি। গত ৪ বছর এ খাতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার ১২২ কোটি টাকা। প্রতি বছর গড়ে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আসছে অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। এটা কৃষি জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ। অর্থাত্ এবারের প্রকৃত খরচ থেকে আগামী বছরের উপকরণ সহায়তার অংক ৩ হাজার কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ কম। তাতে উপকরণ মূল্য বৃদ্ধি পাবে। হ্রাস পাবে কৃষি উত্পাদন।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, সারের মূল্য কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য নন-ইউরিয়া সারের মূল্য ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা হয়েছে। অবশ্যই তাতে নন-ইউরিয়া সারের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার ইউরিয়া সারের মূল্য বাড়িয়েছে কেজিপ্রতি ৮ টাকা (১২ টাকা থেকে ২০ টাকা)। শতকরা হিসেবে এই মূল্য বৃদ্ধির হার ৬৭ ভাগ। তাতে কৃষকগণ ইউরিয়া সার ব্যবহারে উত্সাহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমেছে। অপরদিকে কৃষি খাতে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে শতকরা ৩০ ভাগ। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে শতকরা ৫৫ ভাগ। সেই সঙ্গে বেড়েছে কৃষি শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়। ফলে ফসলের উত্পাদন খরচ বেড়েছে। লাভের অংক কমেছে। তাতে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম ৩ বছর কৃষি খাতের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। ২০১১-১২ সালে তা নেমে আসে প্রায় ২ শতাংশে। চলতি অর্থ বছরেও নিম্ন হারের প্রবৃদ্ধি আশংকা করা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ ফসল উপখাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস। এ সময় মত্স্য ও পশুসম্পদ খাতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও প্রধান উপখাত শস্য উত্পাদনের প্রবৃদ্ধিতে নিম্ন হার পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ উপখাতের বরাদ্দ ও ভর্তুকি হ্রাস পেলে আগামীতে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আরো নিচে নেমে আসবে। তাতে হ্রাস পাবে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এর জন্য কৃষি বাজেটের বরাদ্দ পনর্বিবেচনা করা দরকার। ভর্তুকি বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ হওয়া উচিত কৃষি জিডিপির ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ। এক্ষণে এর পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের দেশে বর্তমানে যে কৃষি ভর্তুকি দেয়া হয় তা মূলত ব্যয় করা হয় রাসায়নিক সার বিপণন ও বিতরণ খাতে। সারের আমদানি বা উত্পাদন খরচ এবং কৃষকের নিকট থেকে প্রাপ্ত মূল্যের মধ্যকার ব্যবধান বা ‘ট্রেড গ্রুপ’ মেটাতেই কৃষি ভর্তুকির সিংহভাগ টাকা খরচ হয়ে যায়। এ টাকা চলে যায় সরাসরিভাবে সার আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের পকেটে। কৃষি ভর্তুকি প্রদানের এ পদ্ধতিতে এখন পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমানে দেশে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রর্বতন করা হয়েছে। এর সংখ্যা ১ কোটি ৪৩ লক্ষ ৭৫ হাজার। তাছাড়া মাত্র ১০ টাকা জমা দানের বিনিময়ে প্রায় ১ কোটি কৃষকের নামে খোলা হয়েছে ব্যাংক একাউন্ট। যথাযথভাবে এগুলো ব্যবহার করা দরকার। কৃষি ভর্তুকির টাকা পরোক্ষভাবে প্রদান না করে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের ভিত্তিতে সরাসরিভাবে কৃষকদের ব্যাংক একাউন্টে তা প্রেরণ করা উচিত।
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে যে, জৈব সারের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ১৮ লক্ষ কৃষকের বসত ভিটায় কম্পোষ্ট সারের স্তূপ স্থাপন করা হয়েছে। আসছে অর্থবছরে আরো প্রায় ১৫ লক্ষ ৫০ হাজার কৃষকের বসতভিটায় কম্পোষ্ট সারের নতুন স্তূপ স্থাপন করা হবে। এটি ভাল উদ্যোগ। কৃষকগণ নিজেরাও তা উদ্যোগী হয়ে করতে পারে। অপরদিকে রাসায়নিক সারের আভ্যন্তরীণ উত্পাদন ২০০৫-০৬ সালে ছিল ১৭.৮৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে তা নেমে আসে ১০.১২ লক্ষ মেট্রিক টনে। ৭ বছর আগে মোট ব্যবহারের শতকরা ৫৯ ভাগ রাসায়নিক সার নিজ দেশে উত্পাদিত হতো। এখন মোট ব্যবহূত সারের মাত্র ২৯ শতাংশ আমরা দেশে উত্পাদন করতে সক্ষম হচ্ছি। বাকি সার আমদানি করছি বিদেশ থেকে। এ বিপুল ঘাটতি মেটানোর জন্য পুরনো সার কারখানাগুলোর সংস্কার ও নতুন কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব বাজেটে সন্বিবেশিত করলে দেশবাসী খুশি হতো।
কৃষিখাতে বর্তমানে একটি রূপান্তর চলছে। এই রূপান্তর সুসংহত করছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় উত্তরণ প্রক্রিয়াকে। একে ত্বরান্বিত করার জন্য কৃষকদের নিকট আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা উচিত। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই সরকার দেশের ৩৫টি জেলায় ২৫ শতাংশ ভর্তুকিতে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও হার্ভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের ব্যবস্থা নিয়েছে। এর আওতা আরো সম্প্রসারিত করে দেশের প্রতিটি জেলায় কৃষকদের নিকট এ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া উচিত। ভর্তুকির হারও বাড়ানোর উচিত। তাছাড়া সেচ যন্ত্রের উপর, বিশেষ করে গভীর নলকূপের উপর ভর্তুকি প্রদান আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
উপকরণ ভর্তুকি ছাড়াও কৃষকদেরকে সহায়তা দেওয়ার মতো একটি উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে উত্পাদিত পণ্যে মূল্য সমর্থন প্রদান। আমাদের দেশে ধান, চাল ও গম সংগ্রহ করা হয় মূল্য সমথর্েনর উদ্দেশ্যে। কিন্তু তা অনেকটাই অকার্যকর। মোট উত্পাদিত খাদ্যেশস্যের মাত্র শতকরা ৪ থেকে ৫ ভাগ সংগ্রহ করে খোলা বাজারে তেমন কার্যকর প্রভাব ফেলা সম্ভব নয়। এ খাতে কৃষকদেরকে সত্যিকার সহায়তা দিতে চাইলে মোট উত্পাদিত খাদ্যশস্যের শতকরা ১০ ভাগ সরকার নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৪০ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে। এখন এই ধারণ ক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টন। আগামী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ২০ লাখ টনে উপনীত হবে। তাছাড়া কৃষি উপকরণ মূল্য ও উত্পাদিত পণ্যের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি কৃষি মূল্য কমিশন গঠন করা দরকার।
নয়া বাজেটে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। গত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ২.৭২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এটি বাড়ানো দরকার। কৃষি ঋণের সুদের হার কমিয়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা উচিত। সেই সংগে মসলা ফসলের জন্য ৪ শতাংশ হারে ঋণ প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। তাছাড়া কৃষিপণ্য বিপণন ও সংরক্ষণ কাজে স্বল্প সুদে বেশি ঋণ দিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে খাদ্যগুদাম নির্মাণ ও কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করা দরকার।
গত ৩টি বাজেট বক্তৃতায় কৃষি বীমা স্কিম চালু করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০১১-১২ সালে এ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। ওই বছর হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় কৃষি বীমা স্কিম। কিন্তু তার অগ্রগতির খবর আমরা কমই জানি। এবছরের বাজেট বক্তৃতায় কৃষি বীমার কথা বলা হয়েছে কিন্তু সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এ খাতে কোন বরাদ্দও রাখা হয়নি। আসছে অর্থবছরে তা সম্প্রসারণের উদ্য্যোগ নিতে হবে। শুধু শস্যবীমা নয়, মত্স্য ও পশু-পাখি খাতেও এরূপ বীমা স্কিম চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে রি-ইন্সুরেন্সের দায় বহন করতে হবে। এ কাজে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কোম্পানিকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড এবং ফাস্ট স্টার্ট ফান্ড থেকে সাহায্য নিয়ে জাতীয় ক্লাইমেট চেইঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ডের মাধ্যমে কৃষি বীমা অর্থায়নের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য কৃষি উপকরণ উন্নয়ন, ভূমি উন্নয়ন, পানি সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি গবেষণায় যুগপথ বিনিয়োগ বাড়িয়ে যেতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণায়। উন্নত দেশগুলোতে জনপ্রতি কৃষি গবেষণা ব্যয় ১২ ডলারের বেশি। এ খাতে বিশ্বের গড় জনপ্রতি খরচ ৪ ডলার। সে তুলনায় এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী আমাদের কৃষি গবেষণায় কৃষি জিডিপির মাত্র ০.৩৩ শতাংশ অর্থ খরচ করা হচ্ছে। এটি কৃষি জিডিপির ২ শতাংশ বা মোট জিডিপির ১ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। নয়া বাজেটে কৃষি গবেষণার জন্য বিশেষ কোন বরাদ্দের উল্লেখ নেই। কৃষি গবেষকদের চাকরির বয়স ৬৫ বছরে উন্নীতকরণ, তাদের ইনসিটু পদোন্নতি এবং হরাইজন্টাল ও ভার্টিক্যাল মবিলিটির বিষয়ে কোন ইতিবাচক সাড়া নেই। গবেষনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের বিষয়েও কোন দিকনির্দেশনা নেই। আমাদের কৃষি গবেষণা ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করার জন্য উল্লেখিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দরকার। কৃষি গবেষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল ঘোষণার নিমিত্তে আলাদা পে-কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসন খাত বরাদ্দ পেয়েছে ৩২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। এটা মোট বাজেটের ১৪.৪২ শতাংশ। বিদায়ী অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। এখানে প্রবৃদ্ধির হার ১৫০.৭৯ ভাগ। তাছাড়া নতুন পে-কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে যদি দুর্নীতি হ্রাস পায় তবে দেশের জন্য তা হবে মঙ্গলজনক। অন্যথায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। প্রতিরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর খাতেও এবারের বাজেট বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। তাতে বুঝা যায়, নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকার অনুত্পাদনশীল ব্যুরোক্রেসি, সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর উপর অধিকতর মনোনিবেশ করছে। তবে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব সর্মথনযোগ্য।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষিতে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এটি মোট বাজেটের প্রায় ৩ শতাংশ। কিন্তু দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ সেতুটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ সরাসরিভাবে উপকৃত হবে। পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে দেশের মোট ১৬ কোটি মানুষ। এটি কৃষি উন্নয়ন ও কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাতকরণে সহায়ক হবে। তাছাড়া এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক ছোট-বড় কলকারখানা গড়ে উঠবে। তাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। তদুপরি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌবন্দর মংলা ও সর্ববৃহত্ স্থলবন্দর বেনাপোল থাকায় ওসব বন্দরের সংগে সড়কপথে যোগাযোগ অনেক সহজতর হবে। তাতে যোগাযোগের ব্যয় ও সময় কমে যাবে। ফলে এ সেতুটি আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হবে। তবে ভবিষ্যতে যাতে এ সেতুটির অর্থায়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সংশ্লিষ্ট করা যায় সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
দেশের প্রধান রফতানি খাত আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প। অতি সম্প্রতি সংগঠিত তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড এবং সাভারের রানা প্লাজায় ভবন ধসে বহু জীবনের ক্ষয়ক্ষতি এ শিপ্লের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বাজেটে থাকা উচিত। শ্রমিকের জীবন ও গোষ্ঠী বীমার জন্য সরকারি সহায়তা এবং বিপন্ন শ্রমিকদের জন্য সাহায্য প্রদানের নিমিত্তে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। তাছাড়া যত দ্রুত সম্ভব ঢাকার মুন্সিগঞ্জে এবং চট্টগ্রামে দুটো আলাদা গার্মেন্ট ইপিজেড স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা দরকার।
আমাদের পোল্ট্রি শিল্প এখন কঠিন সময় অতিবাহিত করছে। এ শিল্পের পুনর্বাসন ও উন্নয়নে কতিপয় আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এর মধ্যে আছে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও কর অবকাশ প্রদান ইত্যাদি। এগুলো সর্মথনযোগ্য। পোল্ট্রি ফিডের উপাদান বিনা শুল্কে আমদানির প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য। দেশের দুগ্ধ শিল্পকে উত্সাহিত করতে বিদেশ থেকে গুঁড়া দুধ আমদানির উপর শুল্ক বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাও সর্মথনযোগ্য। তবে নিউজ প্রিন্টের আমদানির উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ সর্মথনযোগ্য নয়। এটি দেশের সংবাদপত্র তথা প্রকাশনা শিল্পের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে নাগরিকদের অঘোষিত আয় নির্ধারিত হারে কর প্রদানের বিনিময়ে কোন প্রশ্ন ছাড়া বৈধ ঘোষণা করার রীতি প্রচলিত আছে। এ বিষয়টিকে কালো টাকা সাদা করার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ বিষয়টির বৈধতা দেয়া হয়েছে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে তা আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগও অবারিত করা হয়েছে। তাতে ফ্লাট ও জমির মূল্য দ্রুত বেড়ে যাবে। এগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। এ সুযোগ রহিত করা উচিত। কালো টাকা সাদা করার সুযোগে দেশে দুর্নীতি প্রশ্রয় পাচ্ছে।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেট একটি বড় অংকের ঘাটতি বাজেট। সার্বিক বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪.৬ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে আসবে ২১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৮ শতাংশ), যা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ সূত্র হতে নেয়া হবে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা (জিডিপির ২.৯ শতাংশ), যার মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা হতে সংগৃহীত হবে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা (জিডিপির ২.২ শতাংশ)। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক থেকে এত বেশি পরিমাণ ঋণ নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের টাকা পাওয়া যাবে না। অপরদিকে মূল বাজেট অর্থায়নে রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা, যা জি.ডি.পির ১৪.১ শতাংশ। বিদায়ী অর্থ বছরের তুলনায় তা ১৯.৯ শতাংশ বেশি। বর্তমানে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। দেশের অর্থনীতি এখন রুগ্ন, ক্ষত-বিক্ষত। সামনের ৬ মাস নির্বাচনের জন্য দেশ থাকবে উত্তপ্ত। পরের ৬ মাস নতুন সরকার থাকবে ঘর গোছাতে ব্যস্ত। এমতাবস্থায় রাজস্ব আহরণে এত বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন করা খুবই দুরূহ হবে। তাতে পুরো বাজেটকে মধ্যমেয়াদে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে।
লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ
