আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মুখে যতই গণতন্ত্রের কথা বলুন না কেন, বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদানকালে ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাহাদের অনেকেই যেন গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি-সহিষ্ণুতাবোধ ইত্যাদিকে বেমালুম ভুলিয়া যান। ফলে জনগণের মনে এই নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্য-বিধেয় সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবে নানান দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংশয় দেখা দেয়। গত বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বিএনপি’র সমাবেশে দলটির ঢাকা মহানগরীর আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা যে বক্তব্য দিয়াছেন উহা গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের সহায়ক নহে। কেননা, এ ধরনের বক্তব্য প্রদানের ফলে অনেকেই ইহাকে উস্কানি, প্ররোচনা বা উত্তেজনা সৃষ্টির প্রয়াস হিসাবে গ্রহণ করিতে পারে আর সে কারণে সত্যি সত্যি সংঘর্ষসংকুল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাও বিচিত্র নহে। সুতরাং এইরূপ বক্তব্য প্রদানের ব্যাপারে যদি নেতৃবৃন্দ সংযত ও সতর্ক না হন তাহা হইলে আমাদের গণতন্ত্র মজবুত করিবার আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত হইতে বাধ্য। সাদেক হোসেন খোকা বলিয়াছেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়া হলে দেশে রক্তের গঙ্গা বয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলিয়াছেন, ‘রক্তের বন্যা বয়ে যাবে তবুও শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।’ তাহার এই সকল উক্তির মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন হুমকি রহিয়াছে তাহা গণতন্ত্র চর্চার প্রতিবন্ধক এবং কোন প্রকারেই অভিপ্রেতও নহে। ইহা গণতন্ত্রের ভাষা নহে। ‘নির্বাচন হইতে দিব না’ এবং প্রয়োজনে ‘রক্তের গঙ্গা বহানো হইবে’ এই জাতীয় বক্তব্যে আতঙ্কিত না হইয়া পারা যায় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা উহাকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করাইবার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হওয়াই রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাজ। কোন প্রকার উস্কানি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করিয়া কিংবা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করিয়া গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করিবার পন্থা সঠিক বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না।
রাজনীতির উদ্দেশ্য যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা দখল নহে, রাজনীতি হইতেছে ক্ষমতায় যাইবার উপায় মাত্র। সুতরাং জনগণকে তাহাদের অধিকার, ন্যায্য দাবি ও করণীয় সম্পর্কে যুক্তির ভাষায় এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে উজ্জীবিত করাটাই রাজনীতিকের কর্তব্য। সেই পাকিস্তান আমলে আমাদের সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক সংগ্রামের তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বরেণ্য নেতৃবৃন্দ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অনেক সময় কঠোর ভাষা প্রয়োগ করিয়াছেন বটে কিন্তু চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রের পথে ক্ষমতারোহণের কিংবা জনগণকে উস্কানি দিয়া সহিংস পথে আন্দোলন পরিচালনার ব্যাপারে বরাবরই যথেষ্ট সংযত থাকিতে সচেষ্ট ছিলেন তাহারা। তখন মানুষের সার্বিক মুক্তি ও তাহাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হইয়াছে। হিংসা-হানাহানি বা ব্যক্তিগত পর্যায়ের অশালীন বাক্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের অগণতান্ত্রিক ও অভব্য প্রয়াস-প্রচেষ্টা কদাচিত্ লক্ষ্য করা গিয়াছে সেসব দিনে। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করিয়া বর্তমানে পরমতসহিষ্ণুতাকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে গালিগালাজ, গিবত্ করা ইত্যাদিই অনেক ক্ষেত্রে এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পর্যবসিত হইয়াছে। আর এই ধরনের অপরাজনীতির চর্চার ফলেই অনেক নেতার কণ্ঠে প্রায়ই নানান বেফাঁস কথা শোনা যাইতেছে।
সাদেক হোসেন খোকার বক্তব্যটিকে নিছক কথার কথা বলিয়া উড়াইয়া দিতে পারিলে স্বস্তি পাওয়া যাইতো, কিন্তু দলের যে পর্যায়ে তাহার অবস্থান সেখান হইতে এই ধরনের উক্তি করিলে উহাকে অনেকেই গুরুত্ব না দিয়া পারিবেন না নিশ্চয়ই। আর সে ক্ষেত্রে দেশে যে গোলযোগ সৃষ্টির আশঙ্কা রহিয়া যাইবে ইহা অস্বীকার করার উপায় নাই।
আমরা কেহই রক্তপাতে বিশ্বাস করি না। দেশবাসী কায়মনোবাক্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর দেখিতে চাহে। আর এই জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকেই নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে থাকিয়া কথা বলিতে হইবে। মোদ্দাকথা, সকলকেই নিয়মের মধ্যে থাকিতে হইবে। নিয়ম ভঙ্গ করা চলিবে না। শতকরা একশত ভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই, তা সে উন্নত কিংবা অনুন্নত যে দেশই হউক না কেন, সম্ভব নহে। ভুল-ত্রুটির মধ্য দিয়া আগাইতে আগাইতে এবং শুধরাইতে শুধরাইতে অর্থাত্, নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়া একদিন আমরা গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাইতে পারিব নিশ্চয়ই।
