চীনের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ এখন তীব্র পানি সংকট। খরা, ভূগর্ভস্থ পানির অতিমাত্রায় নিষ্কাশন প্রভৃতি কারণে সেখানে দিনদিন পানির জন্য মানুষের হাহাকার বাড়ছে। সরকার সবার কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পানি পৌঁছে দেবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও হচ্ছে না। তবে আশার জায়গা হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরে দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে সাগর তীরবর্তী এলাকায় একটি নোনা পানি শোধনাগার তৈরি হচ্ছে যা থেকে এ সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে বলে তাদের বিশ্বাস। এদিকে দেশটিতে চরম পানি সংকট হওয়ায় রীতিমতো বিপাকে পড়েছে সরকার। এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা বিভিন্ন এলাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে পানি বণ্টন শুরু করেছেন।
দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি বড় শহরের নাম তিয়ানজেন। এখানকার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হচ্ছে নানসিনজুয়াং। এখানে খাবার পানির তীব্র সংকট। দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই কলে পানি থাকে না। সামান্য যেটুকু সময় পানি ভরে রাখার জন্য তারা পান, তাতে দেখা যায় এক বালতি পানি ভরতেই ঘণ্টা পার হয়ে যায়। নানসিনজুয়াংয়ের দরিদ্র কৃষক ওয়াং (৬০) জানান, তাদের পাঁচ সদস্যের পরিবারে পানির জন্য বেশ কষ্ট পেতে হয়। সামান্য যেটুকু পানি সঞ্চয় করে রাখেন তা দিয়েই তাদের দৈনন্দিন কাজ সারতে হয়। তার রয়েছে ছোট্ট একখণ্ড ফসলি জমি। এখানেও তার সেচের জন্য যথেষ্ট পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু পানির সংকট তাকে দিনের পর দিন চরম অবস্থায় ফেলেছে। ওয়াং বলেন, যখন আমি বয়সে তরুণ ছিলাম তখন বসন্তের পানি দিয়ে আমরা নাশপাতিসহ নানা রকম ফল উত্পাদন করতাম। কিন্তু আজ সেদিনগুলো শুধু স্বপ্নের মতোই মনে হয়। এমন অবস্থা শুধু নানসিনজুআংয়েই নয়, আশপাশের অনেক এলাকায় এ সমস্যা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার।
এ সমস্যা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য চীনা সরকার তাদের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা বলছেন, সাগর তীরবর্তী এলাকায় নোনা পানি সংগ্রহের মাধ্যমে একদিকে তা থেকে তারা লবণ উত্পাদন করবেন; অপরদিকে এই নোনা পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে তারা খাবার পানির সংকট দূর করবেন। বিশেষ করে বোহাই সাগর থেকে পানি সংগ্রহ করে লবণাক্ততা দূরীকরণের মাধ্যমে তাদের দুঃখ ঘোচাবেন। আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে তারা ৩৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করছেন। সরকার দেশটিতে ক্রমবর্ধমান খরা দূরীকরণে শত শত ডলার ব্যয়ে এরই মধ্যে আরো অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এমনকি দক্ষিণের জলাময় স্থান থেকে পানি সংগ্রহের মাধ্যমে তারা উত্তরের খরা দূরীকরণের চেষ্টা করছেন। তবে এটা সব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এর কিছু ভূমিকা রয়েছে। তিয়ানজেনে সাগর তীরবর্তী এলাকায় ‘ডিস্যালাইনেশন প্লান্ট’ স্থাপনের মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে এ থেকে চীনের পানির কষ্ট অনেকটা দূরীভূত হবে। আশা করা হচ্ছে ৩০ ভাগ নগরবাসীর সমস্যাই এতে দূর হবে। প্লান্ট ম্যানেজার গু কিগ্যাং বলেন, আমাদের বিশুদ্ধ পানির খুবই অভাব। তাই এটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এতে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুতের ব্যবহার হলেও এটা পরিবেশবান্ধব। এখান থেকেই লবণাক্ত পানি প্রক্রিয়াজাত করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আর লবণটা শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হতে পারে। গু কিগাং আরো বলেন, একটা রিসাইক্লিনিং মডেলের মাধ্যমে আমরা খাবারযোগ্য পানি উত্পাদন করে থাকি। আশা করছি, এ থেকে পানির সমস্যা অনেকটা সমাধান হবে।
তবে এটাও সত্য যে, পানির এ সমস্যা তাত্ক্ষণিকভাবে দেশটিতে সমাধান হচ্ছে না। সরকার যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তার সুফল ভোগ করতে গেলে আরো অনেক সময় তাদের অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে পানির সমস্যা নিয়ে অনেকটা বিপাকেই আছে সরকার। ইতিমধ্যে এ সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠায় তারা বিভিন্ন এলাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে পানি বণ্টনের ব্যবস্থা শুরু করেছেন।
