লবিং ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্রিটেনের রাজনীতি

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:২৪
বর্তমান সময়ে লবিং (তদবির) বিষয়টি মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় লবিং অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় না। অনেক সরকারও অন্য কোনো প্রভাবশালী দেশের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য লবিং করে থাকে। তবে এই লবিং যখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে রাজনীতিবিদদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হয়ে উঠে, তখন স্বয়ং গণতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ে। উদার গণতন্ত্রের দেশ ব্রিটেন এখন তেমনই এক হুমকির মুখোমুখি। অনৈতিক লবিং কেলেংকারিতে জড়ানোর কারণে সম্প্রতি তিনজন পিয়ারসহ (হাউজ অব লর্ডসের সদস্য) একজন এমপি’র রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটেছে। বাস্তবিক অর্থে এসব সংসদ সদস্য লবিং করে কাউকে কিছু পাইয়ে দেননি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন অর্থের বিনিময়ে তারা ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে ব্যবহার করেন এবং সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির এমপি এবং হুইপ পেট্রিক্স মার্সারের কাছে একান্ত সাক্ষাতের জন্য আসেন ড্যানিয়েল ম্যান নামের এক ব্যক্তি। ড্যানিয়েল নিজেকে এ্যালেস্টেয়ার্স এ্যান্ডুস কমিউনিকেশন্স নামের একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি এমপিকে জানান, তার কোম্পানির লন্ডন এবং সিডনিতে অফিস রয়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠান ২০১২ অলিম্পিকে একজন ব্রিটিশ এ্যাথলেটকে স্পন্সর করেছিল। এমপি পেট্রিক্সের সাথে সাক্ষাতের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড্যানিয়েল বলেন, তিনি ফিজির একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ফ্রেন্ডস অব ফিজি। এই প্রতিষ্ঠানের চাওয়া ব্রিটিশ সরকার দ্বীপ রাষ্ট্র ফিজির ওপর থেকে সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশটিকে পুনরায় কমনওয়েলথভুক্ত করুক। এ ব্যাপারে তিনি পেট্রিক্সের সহযোগিতা কামনা করেন। প্রকৃত পক্ষে এ্যালেস্টেয়ার্স এ্যান্ডুস কমিউনিকেশান্স এবং ফ্রেন্ডস অব ফিজি নামে কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এসব ছিল বিবিসি’র প্যানোরমা অনুষ্ঠানের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পাতানো ফাঁদ। আর ঐ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদেরই একজন কনসালটেন্ট সেজে হয়েছিলেন ড্যানিয়েল ম্যান। ফিজিকে আবার কমনওয়েলথভুক্ত দেশের তালিকাভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় লবিং করার শর্তে পেট্রিক্স প্রতি মাসে ২ হাজার পাউন্ড করে পাবেন—এই মর্মে তারা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনার পুরোটাই গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী পেট্রিক্স ঠিক মতই কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি গত ২৬ মার্চ ফিজি বিষয়ে আলোচনার জন্য হাউজ অব কমন্সে আর্লি ডে মোশন (কোনো বিশেষ বিষয়ে বিতর্ক) আনতে সক্ষম হন। এ বিতর্কে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনোরুদ্ধারের জন্য ফিজি’র সরকার প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ অবস্থায় ফিজিকে কমনওয়েলথ তালিকার বাইরে রাখা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। এ বিষয়ে অগ্রগতি দেখে আসার জন্য তিনি মন্ত্রী পর্যায়ের একটি সফর আয়োজনেরও দাবি জানান। পার্লামেন্টে দেয়া তার এ বক্তব্যের পুরোটাই লিখে দিয়েছিলেন ড্যানিয়েল ম্যান। এছাড়া পেট্রিক্স ফিজি বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য একটি সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি গ্রুপ তৈরি করেন। ২০ জন এমপিকে তিনি ফিজি সফর করার জন্য রাজি করান এবং এ বিষয়ে বাজেট সরবরাহ করার জন্য ড্যানিয়েলকে পরামর্শ দেন। লবিং কেলেংকারির যথেষ্ট রসদ পেয়ে যাওয়ায় ঘটনা আর আগায়নি প্যানোরমা কর্তৃপক্ষ। গত ২ জুন প্যানোরমার সাংবাদিকরা পেট্রিক্সের কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বলেন এবং জানতে চান, সংসদীয় আচরণবিধি লঙ্ঘন করার ঘটনায় তার প্রতিক্রিয়া কী? ঐ রাতেই পেট্রিক্স কনজারভেটিভ দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ঘোষণা দেন আগামীতে তিনি আর কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। এর পরদিনই সানডে টাইমসে হাইজ অব লর্ডসের তিনজন পিয়ার লর্ড কানিংহাম, লর্ড মেকেনজি এবং লর্ড লেয়ার্ড একই ধরনের লবিং কেলেংকারিতে জড়িত বলে সংবাদ প্রচার করে। সানডে টাইমসের সাংবাদিকরা একটি সাজানো এ্যানার্জি কোম্পানির পক্ষে লবিং করার জন্য এসব লর্ডদের অর্থ দিয়েছিলেন। ঐ দিনই এদের দুইজনকে দল থেকে বহিষ্কার করে লেবার পার্টি। অন্যজন নিজেই পদত্যাগ করেন। এসব অনুসন্ধানী সংবাদকদের মতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বেশিরভাগ সদস্যকে অর্থের বিনিময়ে সরকারের সিন্ধান্ত প্রভাবিত করার কাজে লাগানো সম্ভব। হাউজ অব কমন্সের স্পিকার জন বার্কো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ৮৩টি সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি গ্রুপের কার্যক্রম স্থগিত করেছেন। এসব গ্রুপের কাজে কারো কোনো অনৈতিক স্বার্থ জড়িত কিনা সে বিষয়ে তদন্ত করার জন্য হাউজ অব কমন্স একটি কমিশনকে দায়িত্ব দিয়েছেন।