আগামী ৩০ জুন সংসদে পাস হবে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বাজেট। কিছু সংশোধনী ও নতুন প্রস্তাব সংযুক্তির মধ্যদিয়ে ১লা জুলাই ২০১৩ হতে কার্যকর হবে এ বাজেট। নতুন অর্থ বছরের বাজেট-বৈশিষ্ট্য, ব্যাখ্যা, কর আদায়, রাজস্ব ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয় ইত্যাদির যাত্রা শুরু হবে ১০ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে। সংবিধান সম্মতভাবে অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন করার কথা। অন্যকোন কারণে সংসদ ভাঙ্গা হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করে নেয়ার কথা। সরকার দলীয় জোট এবং বিরোধী দলীয় জোট নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো নিয়ে পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারছে না। সে কারণে মানুষ সন্দিহান। মানুষ ভাবছে রাজনীতির অহিংস আন্দোলন যে কোন সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করতে পারে।
বাজেট তৈরির কাজ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণী গোষ্ঠী নানা ধরনের সুপারিশ ও প্রস্তাব দিয়ে গেছেন অর্থমন্ত্রীকে। তিনি কারো প্রস্তাব গ্রহণ অথবা কারোরটা গ্রহণ করতে পারেন নাই। তার এই বাজেট প্রস্তাবনা ৬ তারিখেই জানার কথা সাধারণ্যে। কিন্তু না তিনি বাজেট পেশপূর্ব গোপনীয়তা ধরে রাখতে পারেন নাই। সহজ সরল ভঙ্গিমায় বলে ফেলেছেন কোনটা তিনি রাখবেন কোনটা কেঁটে ফেলে দিবেন। এফবিসিসিআই ও এনটিভি’র যৌথ ব্যবস্থাপনায় বাজেটপূর্ব এ আলোচনা সভায় ‘রাবিশ’ বলে থামিয়ে দিলেন এক উদ্যোক্তাকে মাননীয় অর্থমন্ত্রী। বাজার কিন্তু থেমে নেই। বাজার দৌড়াচ্ছে পাগলা ঘোড়ার মত। আমরা দেখলাম বাজেট ঘোষণার পূর্বেই বাজারে কিছু পণ্যের মূল্য বেড়ে গেল। আবার বাজেট ঘোষণার পর আরও কিছু পণ্য-সামগ্রীর দাম হুরহুর করে বাড়তে থাকলো। অডিট বিভাগ ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ উপঢৌকনে এড়িয়ে যায় মাত্র। এ ধরনের অবৈধ বা বাড়তি উপার্জন কালো টাকার সামিল। কালো টাকার আয় ও বাজেট ঘোষণার প্রভাবে ইতিমধ্যে দাম বেড়ে যাওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে নিউজ প্রিন্ট, চাউল, আটা, চিপস্, গুড়াদুধ, ঔষধ, নতুন মডেলের গাড়ী শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তামাক ও সিগারেটের মূল্য। মূল্য কমার কথা টিভি, ক্যামেরা, মোবাইলসেট, সীমকার্ড, চিকিত্সা যন্ত্রপাতি, রি-কন্ডিশন গাড়ী ইত্যাদির।
দেশের ইতিহাসে বৃহত্ বাজেটের ঘাটতি ৫৫ হাজার কোটি টাকার উপরে। ঘাটতি মেটানো এখন বড় প্রশ্ন সাধারণ্যে। উন্নয়ন অর্থনীতিতে পড়েছিলাম, অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে GDP’র ৫% পর্যন্ত ঘাটতি একটি উন্নয়নকামী দেশের বাজেটে থাকতে পারে। সেই হিসাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঘাটতির মাত্রা জিডিপি’র ৪.৬% মাত্র। দেশের অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত বলতে কতক উপাদানের স্থিতিস্থাপকতা থাকা দরকার। এখন আমাদের সামনে মূল আলোচ্য বিষয়- ঘাটতি পূরণে অর্থায়নটা কিভাবে হতে যাচ্ছে? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দুটো বিভাগ কাস্টম-ভ্যাট এবং কর বিভাগকেই মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে। এখানকার কর্মীবাহিনী সততা ও দক্ষতার সাথে কাজ করলে রাজস্ব আদায় যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়ে যাবে। পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ ও হ্যান্ডিলিং বিভাগ সক্ষমতার সংগে দায়িত্ব পালন করলে ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে সক্ষম হবে যা ঘাটতি পূরণে অবদান রাখতে পারে। অন্যভাবে সরকার বৈদেশিক সাহায্য ও ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে পারে। আর তা করতে পারলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ও ঋণের সুদ সামঞ্জস্য পর্যায়ে থাকবে। ফলে বাড়বে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান। ঘাটতি মেটানো বড় চ্যালেঞ্চ তাই ঋণ নির্ভর না হয়ে অনুদান নির্ভর হওয়া ভাল। সামগ্রিক GDP’র হার বৃদ্ধির আন্তরিকতার মধ্যে থাকতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যেই ২০১৩-১৪ অর্থবছরে GDP’র লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৭.২% আবার পরের বছর অর্থাত্ ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে এ মাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৮%। এটা অর্থমন্ত্রী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকা ভাল ছিল। অপরপক্ষে বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি দেখানো হয়েছে ৭% প্রকৃতপক্ষে চলতি অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়াবে ১২% এর উপরে। আর GDP অর্জিত হবে মাত্র ৫.৮%।
সরকার, বিশিষ্ট জন এবং আমরা আশা করছি, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বানাতে হলে এ ধরনের বাজেট চাহিদার মধ্যে থাকতে পারে। শুধু দরকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা। গ্রাম ও শহর উন্নয়নের ফলেই দেশের হবে সামগ্রিক উন্নয়ন। সেজন্য গ্রামকে ও কৃষককে প্রাধান্য দিতে হবে। গ্রাম অঞ্চলের কৃষক উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদী মাস্টার প্লান নেয়া হয়েছে। সরকারের স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর গত ৪ বছরে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক, দেড় হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। আরো করা হয়েছে সাড়ে বার হাজার বিদ্যমান পাকা রাস্তার সংস্কার কাজ। দেশের অনেকগুলো খালও পুনঃখনন হয়েছে। তবে নদী খনন ও শোধনে বরাদ্দ থাকলেও লোক দেখানো কাজ হয়েছে মাত্র। প্রায় চারশত স্ল্যুইসগেট ও ৫০০ কি:মি: ভেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। তাছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়নে বাঁধ নির্মাণ ও পুন:নির্মাণ হয়েছে। এর জন্যে ৭৫ হাজার হেক্টর কৃষি জমি সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে। প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রোথ সেন্টার নির্মাণ ও সংস্কারের কারণে বাজার উন্নয়ন ও কৃষক তার ন্যায় পণ্য মূল্য পেতে সমর্থ হয়েছে। পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের জন্য ধরা সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেটে আলাদা রাখতে পারে। নিউজ প্রিন্ট আমদানি শুল্কবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাই ভালো হয়।
লেখক :সাবেক ট্রেজারার, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
