বাংলাদেশি মেয়ে পারমিতা মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠানরত মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিতেছে। এই প্রথম কোন বাংলাদেশি নারী বহির্বিশ্বে এমন একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করিয়াছে। শনিবার স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিকে এই খবরটি বেশ গুরুত্বের সহিত প্রকাশিতও হইয়াছে। অবশ্য এ সংবাদটি যে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশের দাবি রাখে সে কথাতো বলাই বাহুল্য। কেননা, সুদূর আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কন্যার মিস আমেরিকা বনিবার আশা পূরণ হইলে উহা নিশ্চয়ই বিরল সৌভাগ্য বলিয়াই বিবেচিত হইবে। যুক্তরাষ্ট্র মাল্টি রেসিয়াল ও মাল্টি কালচারাল দেশ। বলিতে গেলে বিশ্বের সকল দেশ হইতেই নারী-পুরুষেরা সেখানে পাড়ি জমাইয়াছে। ফলে ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়ার মানুষেরা সেখানে যাইয়া এক দেহে লীন হইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশি-চীনা-জাপানি-শ্রীলংকান, পাকিস্তানি, ভারতীয়সহ বিশ্বের সকল দেশের মানুষের সংস্কৃতি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়া যেন শত ফুলের সমারোহ রূপে শোভাবর্ধন করিতেছে। কে না জানে যে, মার্কিন সমাজে জ্ঞানীর ও গুণীর কদর রহিয়াছে। একটি প্রতিযোগিতামূলক সমাজের বাসিন্দাদেরকে সর্বদাই নিজ মেধার স্বাক্ষর রাখিতে হয় নচেত্ পদে পদে তাহাকে হোঁচট খাইতে হইবে বৈকি! মার্কিন মুল্লুকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা তথা নিজ মেধা বিকাশের স্বাধীনতা আছে, এসব ক্ষেত্রে আছে অফুরন্ত সুযোগ। কর্মঠ ব্যক্তি মাত্রেই পরিশ্রমের মাধ্যমে একেবারেই সমাজের নিচু স্তর হইতে উপরের স্তরে সহজেই উঠিয়া আসিতে পারে ঐ দেশে। এখানে রাষ্ট্র কিংবা কোন দল বা গোষ্ঠী ব্যক্তির বিকাশের পথে বাধা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না। কেননা, দেশের সংবিধানে বর্ণিত নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানের ব্যাপারে আইন সেখানে একপায়ে খাড়া। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগেরও রহিয়াছে সুনিশ্চিত নিশ্চয়তা। ফলে বাংলাদেশি কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অখ্যাত কোন দেশ হইতে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী কোন ব্যক্তি বা যুবকের সেখানে নাসা কিংবা বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তি পদে অধিষ্ঠিত হইতে কোন বাধা নাই। এখানে কেবল একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয় আর উহা হইল ব্যক্তির মেধা। এই একই কারণে পারমিতা মিত্রদের জন্য সেখানে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের দ্বার অবারিত থাকে।
পক্ষান্তরে, আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী দলগুলিকে কেবলই দলবাজি করিতে দেখি। মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে নিজ দলের বা ব্যক্তিবিশেষের খয়ের খাঁ বানাইবার আয়োজন চলে এসব দেশের সর্বত্র। ফলে মেধাবীরাও এক পর্যায়ে মেধাহীন ও নির্গুণ জড়পিণ্ডে পরিণত হয়। তাহাছাড়া, মেধাহীন ও পছন্দের লোকদেরকে জোরপূর্বক রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন স্থানগুলিতে বসাইয়া দেওয়ার উদ্ভট মানসিকতায় এইসব দল এমনই আচ্ছন্ন থাকে যে, উহার করুণ পরিণতি স্বরূপ সমাজ-সংসার অনেকটা চলত্শক্তি রহিত হইয়া পড়ার জোগাড় হয় বৈকি! যোগ্যতমের সরব উপস্থিতি ঊর্ধ্বতন যে সমাজে স্বীকৃত নহে সে সমাজতো স্থবির, পশ্চাদপদ এবং কলহপূর্ণ থাকিয়া যাইবেই।
তৃতীয় বিশ্বে মেধার প্রতি যে সীমহীন অবজ্ঞা এবং প্রতিভার অকাল বিনষ্টি দেখিতে পাওয়া যায় উহা উন্নত ও গণতান্ত্রিক বিশ্বে কল্পনারও অতীত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেধার বিকাশ এবং যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য স্থান লাভে নিশ্চয়তার বিধান দেশোন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা হইতেছে এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা লাভ। পরিশ্রম আর মেধার সমন্বয় ঘটানোর ব্যাপারে রাষ্ট্র যদি উহার নাগরিকদের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া না দেয় তাহা হইলে উন্নতি ও সাফল্য লাভ সম্ভব নহে। আর এই একই কারণে গণতন্ত্রও কেবল মুখের বুলি হইয়া বারবার বাতাসে মিলাইয়া যায়।
