ভর্তি পরীক্ষা ও নটরডেম কলেজ

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২২:১৯
মানুষ গড়ার জন্য নটরডেম কলেজ যে বিষয়গুলোকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে তার মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা অন্যতম। শুধু আসনসংখ্যার তুলনায় অনেকগুণ বেশি একই ফলাফল অর্জনকারী ছাত্র আবেদন করার কারণেই ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন তা নয়, ভর্তি পরীক্ষার (লিখিত) মাধ্যমে একজন ছাত্রের মনোবৃত্তি বা ঝোঁক বোঝা সহজ হয় যদি তাতে সন্দর্শন (ইন্টারভিউ) পরীক্ষাও থাকে। নটরডেম কলেজ দুটিই করে থাকে। এমনকি অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পশ্চিমাদের অনুকরণে ভর্তির সময় ছাত্রের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও ইন্টারভিউ নেয়া শুরু করেছে। একটু উন্নত বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা খরচ বহনের দায়িত্ব মূলত সরকারের। অর্থায়ন হয়ে থাকে তিনটি লেভেল থেকে। স্টেট, লোকাল ও ফেডারেল। বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের পক্ষে বর্তমানে এটি সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে যে সকল প্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে গড়ে উঠেছে সেগুলো ধ্বংস করার রাস্তা থেকে সরে এসে গঠনমূলক কাজে সহযোগিতা করা সকলের উচিত। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা স্তরটি চারটি ভাগে বিভক্ত। প্রি. এলিমেন্টারি, সেকেন্ডারি, পোস্ট সেকেন্ডারি স্কুল। সেকেন্ডারিটি দুই ভাগে বিভক্ত। মিডল ও হাই। হাইস্কুল লেভেলটিও আবার দুইভাগে বিভক্ত, জুনিয়র ও সিনিয়র হাইস্কুল। এই লেভেলটি আমাদের কলেজের সমতুল্য। এই লেভেলটিতে ভর্তির জন্য তারা যে পরীক্ষাটি নেয় তার নাম সেকেন্ডারি স্কুল এডমিশন টেস্ট (এসএসএটি)। পরীক্ষার বিষয়গুলা হচ্ছে রাইটিং, কমপ্রিহেনসন, কোয়ান্টিটেটিভ ও ভারবাল। সরকারি উদ্যোগেই সেখানে অন্যান্য জেলার ছাত্রদের ভর্তির জন্য ‘ম্যাগনেট স্কুল’ নামে বেশ কিছু স্কুল রয়েছে যেগুলোর অন্যতম কাজ হচ্ছে নিজ জেলার বাইরের ছাত্রদের ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রাইভেট কলেজগুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় সরকারের হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। যুক্তরাজ্যে প্রাইভেট স্কুলগুলোকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুল বলা হয়। তাদের সেকেন্ডারি বা হাইস্কুল আমাদের কলেজের সমান। সেখান থেকে তারা এ লেভেল সার্টিফিকেট পায়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রমের মধ্যে রেখেছে ইন্টারভিউ সিস্টেম ও ধর্ম পালনের বাধ্যবাধকতা। নটরডেম কলেজ ক্যাথলিক ফাদারদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এখানে কোন নির্দিষ্ট ধর্মের বাধ্যবাধকতা নেই। অস্ট্রেলিয়ার স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। ক্যাথলিক ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট। ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুলের মধ্যে আবার রয়েছে প্রটেস্ট্যাস্ট, জুইশ, ইসলামিক ও মন্তেসসরী স্কুল। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভর্তি পদ্ধতি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুলগুলো প্রায়ই অস্ট্রেলিয়ান এডুকেশন ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টির সমালোচনার মুখোমুখি হয় কারণ তারা উচ্চহারে ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন নেয়ার পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকেও টাকা নেয়। জ্ঞাতার্থে জানাই নটরডেম কলেজ সরকারের কাছ থেকে কোন টাকা নেয় না। সিনিয়র সেকেন্ডারি এডুকেশন এন্ট্রান্স ইগজামিনেশন যা চীনে ঝংকাও নামে পরিচিত। এটি একটি এইচএসসি সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরীক্ষা। মজার ব্যাপার হল কোন প্রতিষ্ঠান যদি ৫০০ ছাত্র ভর্তি নিতে চায় তাহলে সে ৪০০ ছাত্রের মেধা তালিকা তৈরি করে ও ১০০ ছাত্রের অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করে। এই ১০০ ছাত্রের মধ্যে যে যত নম্বর সিরিয়াল নীচে আছে সে ততগুণ টাকা ডোনেশন হিসেবে দিতে পারলে কলেজে ভর্তি হতে পারবে। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া বিশ্বমানের শিক্ষাদান প্রচেষ্টায় রত নটরডেম কলেজকে ছাত্রের কাছ থেকে কোন ডোনেশন নিতে হয় না। প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাইস্কুল বা কলেজ থেকে ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রিটিশ সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক কারণে পাবলিক স্কুল নামে পরিচিত। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির জন্য কমন এন্ট্রান্স টেস্ট বা সিইটি নামক ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। এভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন বোর্ডের প্রশ্নপ্রত্রের ভিন্নতা, পরীক্ষা কেন্দ্রের কক্ষ পরিদর্শনের ভিন্নতা এবং আসন সংখ্যার তুলনায় অনেকগুণ বেশি একই গ্রেডধারী ছাত্র থাকলে লিখিত পরীক্ষা অবধারিত হয়ে যায়। সর্বোপরি লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে এসএসসি পরীক্ষার বিশেষ কারণে খারাপ রেজাল্টধারী ছাত্ররা তাদের সবলতা দেখানোর সুযোগ পায়। মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে একজন ছাত্রের আচার-ব্যবহার, কথা বলার ভঙ্গি, চাল-চলন, চেহারা, পোশাকের অস্বাভাবিকতা, উত্তর প্রদানের সঠিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধি যাচাই করা যায়। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। তাই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই দাড়িপাল্লায় মাপা উচিত নয়। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে চলার স্বাধীনতা দেয়া উচিত যদি তারা সাফল্যের সাথে জাতি গঠনে অবদান রাখে। লেখক:প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, নটরডেম কলেজ, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন