শিক্ষা

শিক্ষার প্রয়োগ

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২২:১৯
শিক্ষা হল জ্ঞানকে ব্যবহার করার কৌশল বা কায়দা-কানুন। জ্ঞানস ষ্টা প্রদত্ত যার যতটুকু জ্ঞানের প্রয়োজন আল্লাহ তা নির্ধারণ করে দেন। জ্ঞান একপ্রকার মানসিক শক্তি যা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, মানুষকে স ষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক জ্ঞাপনে সচেষ্ট হয়। মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে যথাযথ প্রয়োগ করলে তা কল্যাণ বয়ে আনে এবং শিক্ষার অপপ্রয়োগ হলে আর্থ-সামাজিক জীবনে অকল্যাণ বয়ে আনে। বর্তমান বিশ্বে যে সমস্ত অকল্যাণকর ঘটনা বা সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় তা শিক্ষার অপ-প্রয়োগের ফসল এবং যা কল্যাণকর হয়েছে তা শিক্ষার যথাযথ প্রয়োগের ফলস্বরূপ। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে কর্মোপযোগী এবং বাস্তব ক্ষেত্রে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য নিজেদেরকে গড়ে তুলি। কিন্তু এখানে বিভিন্ন প্রকার শিক্ষানীতি বা পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। আমাদের দেশে বর্তমান সরকারের পূর্বে পাকিস্তান আমল থেকে কোন শিক্ষানীতি প্রবর্তিত হয়নি। শিক্ষক সমাজ জোড়াতালি দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। ইদানীং সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বলে এক পদ্ধতির কথা প্রচলিত আছে। আমার মনে হয়, ইহা পাণ্ডিত্বের প্রতারণার এক প্রয়াসমাত্র যার মাধ্যমে টাকার সংশ্রব থাকতে পারে। কারণ শিক্ষা নিজেই সৃজনশীল সুতরাং সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বলে কিছু থাকতে পারে না। তাছাড়া মানুষের দু’টি গুণ আছে একটি মনুষ্যত্ব, অপরটি পশুত্ব। শিক্ষার মাধ্যমে পশুত্বের দিকটিকে খর্ব করে মনুষ্যত্বের দিকটিকে শক্তিশালী করা যায়। এই সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির দ্বারা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে না বরং পরিমাণগত দিকটি বৃদ্ধি করা যায়। তাতে শিক্ষার প্রয়োগে সফলতা আসে না, মানবতার কল্যাণ স্তিমিত হয়ে পড়ে। যেমনটি আমরা ইদানীং প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি, ইভটিজিং, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি দেখতে পাই। এই শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয় সমাজ থেকে তলিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে এবং মানুষ মরে বাঁচার চেষ্টা করে অর্থাত্ মনুষ্যত্বের বিকাশ তার কার্যক্রমের দ্বারা সমাজ উপকৃত হয় এবং মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে এবং একজন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে নৈতিকতার দিকটি উপেক্ষিত হওয়ায় প্রকৃত মানুষ আমরা গড়ে তুলতে পারছি না। তাছাড়া আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা অধ্যয়নরত তারা কিশোর বয়স থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়ায় তাদের মেধা রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হয় এবং জ্ঞান চর্চার জন্য শিক্ষার দিকটি জীবনের প্রথমেই খসে পড়তে শুরু করে। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শই তার কাছে প্রবল হয়ে উঠে। তার কাছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কথা মুখ্য না হয়ে তার রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মীর কথাই তার কাছে জীবন গড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। তাই এভাবেই শিক্ষার তাত্পর্য ব্যাহত হতে চলেছে। তাছাড়া মেধা বা অন্যকিছুর মাধ্যমে নিজেকে বিশিষ্ট করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে না। ফলে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছাত্ররা তাদের চেয়ে সেরা কোনকিছুকে জানে না। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমেই মেধাবীরা প্রতিভাধরদের চিনতে পারে। ফলে মেধা লুকায়িত হয়ে ছায়ার মধ্যে সূর্যঘড়ির কাজ করে এবং মূল্যবোধ আটকা পড়ে। রাজনীতির মাধ্যমে বিশ্ব পরিচালিত হয়। যারা দেশ শাসন করেন তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমেই দেশের শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন। যারা দেশকে ভালবাসেন দেশের মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকেন তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু অনেক দেশই গণতান্ত্রিক পন্থায় বা অগণতান্ত্রিক পন্থায় নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থক হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। সেখানে তখন রাজনৈতিক শিক্ষার উপকরণ প্রতিফলিত হয় না। সেখানে কল্যাণকর রাষ্ট্রের কাছে অকল্যাণকর রাষ্ট্রের নায়ক হিসাবে ধরা দেন। তখনই শাসক গোষ্ঠির সঙ্গে দেশের মানুষের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগে শাসক গোষ্ঠি সাময়িক কামিয়াব হলেও তাদের শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ব্যক্তি ও পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা তথা সারা বিশ্বের মানুষের মানসিক সুস্থতা নির্ভর করে শিক্ষার প্রয়োগের উপর। উন্নত বিশ্বের দাবিদার হিসাবে যারা গ্রীন হাউসকে মানব কল্যাণের চিত্র তুলে ধরে অনুন্নত বিশ্বের অকল্যাণ ঢাকার চেষ্টা করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের হোতা হিসাবে আড়াল করার চেষ্টা করেন তারা কিন্তু প্রকৃত আড়ালে থাকতে পারে না। কারণ মানসিক গুণসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের কাছে মূল্যবোধের জবাবদিহি একদিন করতেই হয়। সুতরাং নিজের তথা সামগ্রিক কল্যাণে শিক্ষা প্রয়োগে সচেতন হলেই মানব কল্যাণ দ্বারস্থ হয়। লেখক :সাবেক অধ্যক্ষ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন