বর্ষা আসিয়াছে, দুকূল ছাপাইয়া আমাদের প্রধান নদীগুলি প্রাকৃতিক নিয়মে প্রমত্তা হইয়া উঠিতেছে। সেই সঙ্গে ঝুঁকি বাড়িতেছে নৌ-দুর্ঘটনার। আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৌপথের ব্যবহার ব্যাপক। বরিশাল বিভাগের সকল জেলা, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলার অধিবাসীদের আন্তঃজেলা ও ঢাকার সহিত যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এই নদীপথ। ইহা জনপ্রিয়ও বটে। নদীমাতৃক এই দেশের প্রকৃতিদত্ত নদীপথ অসর্তকতা ও অব্যবস্থাপনায় কখনো কখনো হইয়া উঠিয়াছে নির্মম প্রাণঘাতী। অর্থাত্ জনপ্রিয় জলপথগুলিই এক্ষণে আতঙ্কের প্রতিমূর্তি হইয়া উঠিয়াছে।
পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, দেশে পাঁচ শতাধিক নৌযান দুর্ঘটনায় সাড়ে ৮ হাজার যাত্রীর প্রাণহানি ঘটিয়াছে গত ৩০ বত্সরে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করিয়াছেন অসংখ্য মানুষ। বিপদের সবচেয়ে বড় ফাঁদ পাতা রহিয়াছে চাঁদপুর নৌপথে। বরিশাল, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, ভোলা, মতলব প্রভৃতি অঞ্চলও পিছাইয়া নাই নৌ দুর্ঘটনার ‘প্রতিযোগিতা’য়। ২০০১ সালে চাঁদপুর মোহনায় এমভি রাজহংসী, ২০০২ সালে সালাউদ্দিন-২ ও ২০০৩ সালে এমভি নাসরিন নাম্নি লঞ্চ ডুবিয়া কয়েক সহস্র লোকের সলিল সমাধি ঘটাইয়াছিল। কিন্তু এইসকল মর্মন্তুদ ঘটনার পরও আমাদের নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিতরকার গলদ দূরীভূত হয় নাই খুব একটা। এই দশ বত্সরে আরও তিন শতাধিক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহার কারণ মূলত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা।
দুর্ঘটনার সহজ সাদা যেইসকল কারণ রহিয়াছে, তাহার ভিতরে যাত্রীবাহী লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ অধিক মালামাল লঞ্চের খোলের ভিতরে, ছাদে ও মেঝেতে বহন করিবার প্রবণতা কমে নাই একবিন্দুও। নৌদুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভিতরে সমন্বয়ের যেই ঘাটতি রহিয়াছে, অদ্যাবধি আমরা তাহার প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতিও দেখিতে পাই নাই। নৌপথে প্রয়োজনীয় বয়া, বিকন বাতি ও মার্ক নাই। দিনে নৌপথে চলাচল করা সহজ হইলেও রাত্রিকালে অনেকাংশে আন্দাজের উপর নৌযান চালাইতে হয়। তাহাছাড়া অনিয়ম অন্যায় রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কখনই নিয়ম করিয়া নিয়মিত পরিচালিত হয় না। ইহাতে অন্য জটিলতাও রহিয়াছে। দেশের কোন পোর্ট অফিসারকে লঞ্চ ও নৌযান হইতে জরিমানা আদায় বা দোষী লঞ্চের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক বিচারকাজ পরিচালনা করিবার ক্ষমতা প্রদান করা হয় নাই। তাহারা শুধুমাত্র মামলা গ্রহণ করিয়া তাহার ধারা উল্লেখপূর্বক মেরিন কোর্টে পাঠাইয়া দিয়া দায় সারেন। দেশে যেহেতু একটিমাত্র মেরিন কোর্ট শুধুমাত্র ঢাকাতে রহিয়াছে, সেই হেতু মেরিন কোর্টে দোষী লঞ্চ ও সারেং-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে আটকা পড়িয়া যায়। ইহাতে অনিয়ম ও অপরাধ করিয়া পার পাইবার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তত্সঙ্গে বৃদ্ধি পায় অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করিবার মানসিকতাও। অব্যবস্থাপনার সমস্যার সহিত ইহাও আমাদের নৌপথকে আরো বিপদসংকুল করিয়া তুলিয়াছে।
এই সঙ্গে আমরা দেখিয়াছি, যেইসকল নৌযান দুর্ঘটনায় ডুবিয়া যায়, তাহাদের উদ্ধার ব্যবস্থাপনাতে রহিয়াছে বড় ধরনের সঙ্কট। যাত্রীবাহী লঞ্চসহ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার ৫ শত নৌযান দেশের বিভিন্ন নদীর তলদেশে আটকা রহিয়াছে। সরকারের প্রয়োজনীয় শক্তিশালী বড় উদ্ধার জাহাজ না থাকায় ডুবিয়া যাওয়া অসংখ্য নৌযান উদ্ধার করা সম্ভবপর হয় নাই বিভিন্ন সময়। ফলে এই সকল নৌযানে পলি জমিয়া ডুবোচরের সৃষ্টি করিয়া নদীর তলদেশ ভরাট হইয়াছে অনেক স্থানে। অন্য অসংখ্য কারণের সহিত এই কারণেও সংকীর্ণ হইয়াছে নৌপথ। অথচ নদীর তলদেশে ডুবিয়া থাকা এইসকল নৌযান উদ্ধার না করিয়াই সরকার সারাদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩টি নদী খনন প্রকল্প হাতে লইয়াছে।
দুর্ঘটনা এড়াইতে ও পরিবহনের অবস্থান সহজেই শনাক্ত করিতে উন্নত দেশগুলোতে যেই ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, তাহা এইবার আমাদের পরিবহন ও নৌযানসমূহে ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেমের আওতায় আনা হইয়াছে। প্রযুক্তির এই আধুনিক ব্যবহার নি:সন্দেহে প্রশংসার। তবে একই সঙ্গে নৌযানের নির্মাণত্রুটি দূরীকরণ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও ডেকে মালামাল বহন বন্ধকরণ, পর্যাপ্ত লাইফবয়া, প্লাস্টিক বল, দড়ি ইত্যাদি ব্যবস্থায় জোর নজরদারিসহ দোষীদের শাস্তি প্রদানে কালক্ষেপণ দূর করিতে হইবে। সুতরাং ভরা বর্ষার জলমত্ত নদীপথের বিপদের ঝুঁকি হ্রাস করিতে সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তরিক হউক জনগণের জানমাল রক্ষায়।
