স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে বুঝায়। স্বাস্থ্যই জীবনের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মূলধন। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না। কোন কাজে মন বসে না। তাই দেহ ও মনের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। ফলে “সুস্থ দেহ সুন্দর মন”— এই প্রবাদটি সর্বকালে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দৈহিক ও মানসিক সুস্থতাকেই পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য নামে অভিহিত করা যায়। তাই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা, স্বাস্থ্য রক্ষা এবং শরীরের বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাদ্যের অতি প্রয়োজন। যে সকল খাদ্য শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখে সেগুলোই পুষ্টিকর খাদ্য। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার না খেলে শরীর ও মনের বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
আজকাল ছেলে-মেয়েরা ভাত, মাছ, ডাল, সবজি, ফলমূল ইত্যাদি খাবারের চেয়ে পিজ্জা, কেএফসি, সিপি চকলেট জাতীয় খাবার খেতে অত্যন্ত পছন্দ করে এবং এ সমস্ত খাবারের জন্য রীতিমতো বায়না ধরে। শরীরের জন্য ভাল নয় অথচ তীব্র স্বাদ ও গন্ধযুক্ত আকর্ষণীয় ও মজাদার নানা খাবারে তাদের পছন্দ বেশি। রাসায়নিক দ্রব্য সংমিশ্রণে তৈরি এ সমস্ত জাংক ফুডে (চিপস, বার্গার, ক্রিপস, কেক, বিস্কুট প্রভৃতি) উচ্চমাত্রায় প্রাণিজ চর্বি থাকে। বিভিন্ন মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্য ও পানীয়তে (কোলা, লেমোনেড জাতীয়) অধিকমাত্রায় চিনি ব্যবহূত হয়। বেশিমাত্রায় এ ধরনের খাদ্য গ্রহণে শরীর মোটা হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত চিনি দাঁত ও চামড়ার ক্ষতি করে। মূলত এসব জাংক ফুডে তেমন ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে না অথচ ভিটামিন ও খনিজ লবণ শরীরের জন্য অপরিহার্য। স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুষম খাদ্য অর্থাত্ খাদ্যের সকল উপাদানের উপস্থিতি। কম খরচে সুষম খাদ্যের প্রতি আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি আবশ্যক।
আজকাল বেশিরভাগ স্কুল-কলেজে যথাযথ খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। খেলাধুলার মাধ্যমে দেহে ও মনের সুসামঞ্জস্য উন্নয়ন সাধন করে, শরীরকে চাঙ্গা করে, দৈহিক গঠন সুন্দর ও মজবুত করে, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, একঘেয়েমি দূর করে। সুতরাং খেলার মাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। স্কুল-কলেজে প্রয়োজনীয় শারীরিক শিক্ষার অভাব, এটাও তাদের মোটা হওয়ার পেছনে একটা কারণ। সংসার-যাত্রায় আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু কাম্য। কিন্তু তা লাভের প্রকৃষ্টতম পন্থা হলো সুস্থ, সবল ও নীরোগ শরীর গঠন। খেলাধুলা, শরীরচর্চা বলিষ্ঠ স্বাস্থ্য লাভের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। সেই বলিষ্ঠ স্বাস্থ্যই জীবনে সাফল্য লাভের প্রধানতম হাতিয়ার। উপযুক্ত খেলাধুলার মধ্যদিয়ে শরীরের মাংসপেশীগুলো হয়ে ওঠে সুদৃঢ় এবং শরীর হয়ে ওঠে মজবুত ও অধিক দুঃখ সহনশীল। নিয়মিত ব্যায়াম এবং পরিমিত খাদ্য গ্রহণের দ্বারা শরীরের বৃদ্ধি ও পুষ্টি অবধারিত।
খাদ্যে মোট ছয়টি উপাদান যা আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। আমিষ দেহ গঠন করে। দেহের বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণ করে। দেহে কর্মশক্তি যোগায় এবং রোগরোধে সাহায্য করে। চাল, ডাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংস ইত্যাদি হতে আমিষ পাওয়া যায়। আমিষের অভাব হলে দেহের ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, মেজাজ খিটখিটে হয়। শর্করা দেহে তাপ ও কর্মশক্তি যোগায়। চাল, ডাল, গম, আলু, খেজুর, কলা, আপেল ইত্যাদি হতে শর্করা পাওয়া যায়। স্নেহপদার্থ দেহে তাপ ও শক্তি উত্পাদন করে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বাদাম ইত্যাদি হতে স্নেহপদার্থ পাওয়া যায়। স্নেহজাতীয় খাবারের অভাব হলে ত্বক শুকনো ও খসখসে ভাব ধারণ করে। ফলে ফ্যাটি এসিডের অভাবে দেহে একজিমা দেখা দেয়। ভিটামিন শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। রক্ত গঠনে সাহায্য করে। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে রাতকানা রোগ হয়। চোখের জেরোপথ্যালামিয়া রোগ হয়। চামড়ায় শুষ্কতা দেখা দেয়। মাছ, কলিজা, ডিম, দুধ, মাখন ইত্যাদিতে ভিটামিন “এ” পাওয়া যায়। ভিটামিন “ডি”-এর অভাবে রিকেট (শিশুদের) ও অস্টিওম্যালেসিয়া (বয়স্কদের) রোগ হয়। ফলে পায়ের হাড়গুলো বেঁকে যায়। এতে ক্রমশ হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিম, দুধ, কলিজা ইত্যাদিতে ভিটামিন “ডি” পাওয়া যায়। ভিটামিন “সি”-এর অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। এতে দাঁতের মাড়ি ফুলে ওঠে। দাঁতের গোড়া দিয়ে রক্ত পড়ে। এনিমিয়া দেখা দেয়। সহজেই সর্দি-কাশি হয় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। আমলকি, পেয়ারা, লেবু, টমেটো, তাজা শাক-সবজি ইত্যাদিতে ভিটামিন “সি” পাওয়া যায়। এছাড়া ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ভিটামিন “কে”, ভিটামিন “ই”— এরা দেহের ভেতরে বিভিন্ন কাজকর্মকে সচল রাখে এবং দেহকে রক্ষা করা ইত্যাদি কাজ-কর্ম করে থাকে। খনিজ লবণ দেহে চব্বিশ প্রকারের দেখা যায়। এরমধ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও গন্ধক প্রাণীদেহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে। এদের প্রধান খনিজ লবণ বলে। দুধ, ডিম, কলা, ডাবের পানি ইত্যাদিতে এসব খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। পানি দেহে দ্রাবকরূপে কাজ করে। পানির জন্যই দেহে রক্তসঞ্চালন এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। পানি দেহ থেকে দূষিত পদার্থ অপসারণ করে। দেহে পানির পরিমাণ ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে দেহের স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সুষম খাদ্য পরিবেশনের ব্যর্থতা বাংলাদেশে অত্যন্ত ব্যাপক। সুস্থ সবল দেহের জন্য পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত দরকার।
দেশ তথা জাতির প্রকৃত সম্পদ হলো তার সুস্থ সবল জনগণ। আজকের এই শিশুরাই হবে একদিন দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ এবত্ জাতির কর্ণধার। তাই সবশেষে বলতে চাই, শরীরই সর্বস্ব। শরীরই সুখ, শরীরই সম্পদ। সেজন্য চাই সুস্থ, সবল ও নীরোগ শরীর। ধনৈশ্বর্য নয়, বিষয়-আশয় নয়, শরীরই সব। কবি তাই বলেন— ‘চাই বল, চাই স্বাস্থ্য আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু সাহস-বিস্তৃত বক্ষপট’।
লেখক :ব্যাংকার
