অনেক বড় মাপের মানুষের সাথে আমাদের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা তৃতীয় প্রজন্মের অনুজদের স্মৃতি, সখ্য কম থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। নাট্যব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী স্যারের সাথে আমার তেমনই দূরত্বের সম্পর্ক। এই দূরত্ব অবশ্যই শ্রদ্ধার। তার সাথে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজের সময় একাধিক ইন্টারভিউ নেবার ছলে কথা, আলাপ, প্রশ্নের উত্তর শুনে নিজেকে সমৃদ্ধ করা এটুকুই ছিল পরম পাওয়া। কিন্তু একুশে টিভির ‘মিডিয়া গসিপ’ অনুষ্ঠান সঞ্চালনার কল্যাণে প্রায় সময় চ্যানেলটিতে যাবার কারণে দেখা হতো চ্যানেলটির অন্যতম উপদেষ্টা নাট্যব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরীর সাথে। এভাবেই একদিন আলাপ আড্ডায় যখন তিনি শুনলেন ‘আমি বরিশালের ছেলে’। একটা স্মিত হাসি হেসে আমার মাথায় হাত দিলেন। আরে তুমি বরিশালের ছেলে আগে বলবা তো..
কী নির্মল আদর! দেশি মানুষের দেখা পেলে কেউ এত উচ্ছ্বসিত হন। জানা ছিল না।
এরপর কারণে অকারণে অনেকবার ফোনে, সাক্ষাতে কথা। মাঝে তারই আরেক সৃষ্টি বরেণ্য অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদি মারা গেলে তার একটি স্মৃতি ইত্তেফাকের বিনোদন প্রতিদিন ছাপবো বলে তাকে ফোন দিতেই, তিনি ধমকিয়ে বললেন, তানভীর ফরিদি আমার হাতে গড়া শিল্পী...ও আমার ছেলে। আমি মারা গেলে ও আমায় নিয়ে বলবে, লিখবে, তোমরা ছাপবা। এটাই তো শোভন আর স্বাভাবিক। উল্টো আমাকে আজ বলতে হচ্ছে? আমি কিছু বলতে পারবো না। মনটা খুবই খারাপ তানভীর...দেখি একটা লেখা পরে আমি তোমায় রেডি করে পাঠাবো।
সেই লেখা আজো আমি পাইনি। তবে আতিক স্যার ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয় পাতায় নিয়মিত লিখেছেন দীর্ঘদিন। নানান বিষয়ে লেখা কলামগুলো ছাপা হবার সময়... বেশ কয়েকদিন আমাকে ফোন করেছেন তিনি। কেন জানি না, লেখা ছাপা হলেই সকালে ফোন করে বলতেন, ‘তানভীর আজকের লেখাটি পড়েছ। কেমন লাগলো?’
একুশে টিভিতে মিডিয়া গসিপ অনুষ্ঠানটির ১০০ পর্ব পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আমি একটি বই প্রকাশ করি। আমার প্রথম প্রকাশিত কোন গ্রন্থ ছিল সেটি। ‘অপ্রচারিত মিডিয়া গসিপ’ নামের এই বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন তিনি। সেই শতপর্ব পূর্তি অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন আতিক সার। অন্যান্য অতিথিদের ভেতরে ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, হানিফ সংকেত, সাদী মহম্মদসহ অনেকে। কাকতালীয়ভাবে অতিথিরা সকলেই ছিলেন বৃহত্তর বরিশালের। কিন্তু এটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না। দুর্ভাগ্যক্রমে অনুষ্ঠানের দিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। তিনি ফোন করলেন, তানভীর শরীরটা খুব খারাপরে বাবা। তোমার অনুষ্ঠানে আসার খুব ইচ্ছা ছিল। পারলাম না।
সেই শেষ কথা। এরপর দুই একবার কিছু খবরের খোঁজে তাকে ফোন।
আমি জানি, তাঁকে নিয়ে স্মৃতি আর শোকগাথার বন্যা শুরু হবে। বিশেষ করে আজকে যারা প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পী তাদের অনেকেই আতিক স্যারের নির্দেশনায় নিজের জায়গা করেছেন। কিন্তু আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের কাছে তার সাথে এই অল্প কতটুকু স্মৃতি অনন্য হয়ে থাকবে চিরটাকাল। তাই প্রকাশের লোভ সামলাতে পারলাম না। তার মৃত্যুর খবরটি জানার পরই প্রথমেই কেন জানি না, আমি আমার ‘অপ্রচারিত মিডিয়া গসিপ’ বইটি আবার খুলে দেখি। আমায় নিয়ে তার লেখা ‘ভূমিকা’টা পড়লাম। বার বার। কত পরিমিতভাবে তিনি লিখে গ্যাছেন আমায় নিয়ে! প্রিয় স্যার, আজ আমি আপনাকে নিয়ে স্মৃতি লিখছি।
অথচ, আমায় নিয়ে আপনি লিখে গেলেন তারও আগে! এদেশের টিভি মিডিয়ার সবচেয়ে অগ্রজ মানুষটি আমার মতো ক্ষুদ্র এক মিডিয়াকর্মীর অনুভূতি লেখার জায়গাটিতেও যেন যথারীতি এগিয়ে রইলেন।
সালাম, শ্রদ্ধা। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা আপনাকে অবশ্যই ভাল রাখবেন। সেই প্রার্থনা।
লেখক:সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী
