তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট অনেকদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে| কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরু থেকেই বলে আসছেন, সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই| প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি এই অবস্থানের মধ্যেই রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল— এ চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন| এরপর থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন অনেকটাই থমকে যায়| আওয়ামী লীগ, বিএনপি— উভয় দলই এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়| ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ১৮ দলীয় জোট প্রার্থীরা চারটি সিটিতেই জয়লাভ করে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় আবারও প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বেপরোয়া কার্যক্রম না থাকলে জনগণ শান্তি বজায় রাখতে পারে।
এ চারটি সিটি করপোরেশনের আগের নির্বাচনটি হয়েছিল নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে। সেখানেও আমরা রাজনীতিরই জয়-পরাজয় লক্ষ্য করেছিলাম। সিটি নির্বাচনের ফলাফলেরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তখন চারটি সিটি করপোরেশনেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেছিলেন। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের জয়জয়কার দেখা গিয়েছিল। কাজেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যে রাজনীতির প্রভাব পড়ে, সেটি স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়। সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে, মাত্র সাড়ে চার বছরে কেন আওয়ামী লীগের এত বড় বিপর্যয় ঘটল? এর জবাব আওয়ামী লীগকেই খুঁজে বের করতে হবে। তবে এটুকু বলা যায়, এ সময়ের সরকার পরিচালনায় মানুষ যেমন সন্তুষ্ট হতে পারেনি, তেমনি বিরোধী দলের প্রতি দমন-পীড়ন নীতিও মানুষ মেনে নিতে পারেনি। বস্তুত, জনগণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ত পর্যবেক্ষণে রাখে। রাজনৈতিক দলের ভুল-ত্রুটি তাদের চোখ এড়ায় না এবং তারা যখন ভোট দেয়, তখন বিচক্ষণতার সঙ্গেই তা দেয়। চার সিটি করপোরেশনে বিদায়ী চার মেয়রের সবাই যে মেয়র হিসেবে ব্যর্থ ছিলেন, এ কথা কেউ বলবেন না। দু-একটা সিটিতে বিদায়ী মেয়র ভালো কাজ করেছেন— সকলেই এক বাক্যে তা স্বীকার করবেন। অন্তত স্থানীয় কাজের বিবেচনায় প্রত্যেকেই এত বেশি ভোটের ব্যবধানে হারার মতো প্রার্থী ছিলেন না। চার সিটি করপোরেশনের ভোটাররা যদি স্থানীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিতেন, তাহলে চার মেয়রের অন্তত একজন হলেও জয়লাভ করতেন— এ কথা অমূলক হবে না নিশ্চয়ই। সুতরাং সন্দেহের অবকাশ নেই, চার সিটি ভোটাররা ভোট দিয়েছেন জাতীয় রাজনীতিকে সামনে রেখে। তারা সরকারি দলের সদ্য বিদায়ী চার মেয়রের বিপক্ষে যতটা না রায় দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি অনাস্থা জানিয়েছেন ওই চার মেয়রের সরকারি দলের গত সাড়ে চার বছরের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি একথাও বলা যায়, ভোটাররা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি এক ধরনের সমর্থন জানিয়েছে।
উপরন্তু, চার সিটি করপোরেশনের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনীতির হিসাব-নিকাশও অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। কারণ সিটি নির্বাচনে ফলাফলে হেফাজতের ওপর ক্রাকডাউনের পর ব্যাকফুটে থাকা বিরোধী ১৮ দলীয় জোটে এখন স্বস্তি ফিরে এসেছে। বলা হচ্ছে, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি যোগাবে এ ফলাফল। দলের কয়েকজন নীতি-নির্ধারকের মতামত তুলে ধরে একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হয়েছে: আওয়ামী লীগের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের একচেটিয়া বিজয় হলেও নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে কোনো ছাড় দেবে না বিএনপি। এই দাবিতে ‘উজ্জীবিত বিএনপি’ রোজার ঈদের পর বড় ধরনের আন্দোলনে যেতে চায়। আবার একদলীয় একতরফা নির্বাচন সরকার করবে কিনা সে ব্যাপারেও সরকারকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। কারণ এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সরকারও এখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছে। সরকারের মন্ত্রীরাই একে সরকারের জন্য সতর্ক বার্তা বলে মন্তব্য করেছেন। মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের পরাজয় দলের জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে মন্তব্য করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। রাজনৈতিক অংকগুলোর অনেকটাই সরকার হয়তো নতুন করে কষবে ।
তবে এই নির্বাচনে কে হারল আর কে জিতল তার চেয়ে সুষ্ঠুভাবে এই নির্বাচন সম্পন্ন করাকে বড় জয় হিসেবে দেখার চেষ্টা করে সান্তনার পথ খুঁজছে সরকার| চার সিটির নির্বাচন যেহেতু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেহেতু সরকার এখন এটা বলার সুযোগ পাচ্ছে যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু হবে। অর্থাত্ সরকার বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে অযৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসবে না। বিএনপি এই নির্বাচন হতেও দেবে না|
এটা ঠিক যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক বিষয় নয়। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে সরকার বদল হয় না। সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গুরুত্বের বিবেচনায় জাতীয় সংসদের সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হলো নির্বাচনের মাধ্যমে বা বৈধ উপায়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ যোসেফ স্যুমপিটার (Joseph Schumpeter)-এর মতে, ‘‘The first and foremost aim of each political party is to prevail over the others in order to get into power or stay in it.’’ তাই নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য একটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের কাছে এটা আবার দিবালোকের মতো পরিষ্কার হলো যে, সরকারের জনপ্রিয়তার পারদ নেমে এসেছে অনেক নিচে; সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জন্য ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করা কঠিন বটে। আবার, ১৯৯১ সালের পর দেশের কোনো ক্ষমতাসীন দলই দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার নজীর নেই। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একদলীয় নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করার পর টানা দ্বিতীয় মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করলেও তার আয়ুষ্কাল ছিল অল্প কয়েকদিন। আবার ২০০৬ সালে ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে আসার জন্য বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অনুগত ব্যক্তিকে বসাতে চেয়েছিল বিএনপি। তার পরিণতি কী হয়েছে তা দেখেছেন সবাই। এখন আওয়ামী লীগও সেই পথে হাঁটছে। জনমতের বিপরীতে গিয়ে আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। নির্দলীয় সরকার ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে তা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত থাকবে— এ কথা শুনলে পাগলও হাসবে। যেখানে দেশের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসকদের মধ্যে সততার প্রকট অভাব বিদ্যমান। যেখানে ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে যেকোনো সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিতে প্রয়োজনে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে তারা কার্পণ্য করেন না; সেখানে নিজেদের হাতে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত রেখে রাজনৈতিক চূড়ান্ত লক্ষ্য হাসিল— অর্থাত্ ‘ক্ষমতা স্থায়ী’ করতে তারা ‘নিরপেক্ষ’ থাকবেন(!)— এটা আকাশ কুসুম কল্পনা বৈ কিছু নয়।
গত ১৫ জুন একটি শীর্ষ স্থানীয় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘জনপ্রশাসনে নির্বাচনমুখী তত্পরতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনমুখী তত্পরতার অংশ হিসেবে প্রশাসন সাজানোর কাজও চলছে। জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া শুরু হয়েছে। সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সরকারের নিজস্ব ছকে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া অনুগত ডিসি ও ইউএনওদের অধীনে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। বিরোধী জোটও মনে করছে, জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারের ব্যর্থতার পরিচয় দেয়ায় এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্যের কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের সরকার গঠন করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে; তাই নির্দলীয় সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই বিএনপিও শেষ পর্যন্ত নিজেদের দাবিতে অটল থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।
তাহলে সার্বিক প্রেক্ষাপটে এখন বড় প্রশ্ন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের ভবিষ্যত্ কী? সম্ভবত এর উত্তর খুঁজে পেতে আমাদেরকে বেশি দূরে যেতে হবে না। চার সিটিতে নির্বাচনের পরদিন ১৬জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যটি এক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আবারও নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ‘আর কোন অসাংবিধানিক কাউকে (সরকার) আনার চেষ্টা করবেন না। তাতে কারো লাভ হবে না, নির্বাচনই হবে না।’ একদিনে বিরোধী দল বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারা ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হতে দেবে না, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী অসাংবিধানিক সরকার চাইলে নির্বাচন হবে না। তাহলে জিজ্ঞাসা হচ্ছে: সময়মত নির্বাচন না হলে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ কী হবে? সম্ভাব্য জবাব হচ্ছে: ব্যাপক নৈরাজ্য, হানাহানি, রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিয়ে তৃতীয় বা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পথ সুগম হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
