বাংলাদেশের জনসংখ্যা ধরে নিচ্ছি প্রায় ১৬ কোটি। প্রশ্ন হচ্ছে এর মধ্যে “ক্ষেতমজুরসহ গ্রামীণ মজুরের” সংখ্যা কত? অনেক রকম হিসাব সম্ভব, আমি একটি Common Sense হিসাবে উপনীত হয়েছি যা বৈজ্ঞানিক হিসাবের থেকে খুব বেশি এদিক-ওদিক হবে না।
ধরা যাক মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ গ্রামে বাস করে। তাহলে গ্রামীণ জনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১১ কোটি ২০ লাখ। আমরা জানি ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ মজুররা প্রধানত আসেন দু’টি শ্রেণী থেকে- ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষী। সাধারণভাবে ধরা যেতে পারে গ্রামের অর্ধেক মানুষ ভূমিহীন পরিবার থেকে আসছেন। তাহলে মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ অর্থাত্ ১১ কোটি ২০ লাখ গ্রামবাসীর অর্ধেক অর্থাত্ ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার লোক হচ্ছে ভূমিহীন। তবে গ্রামীণ ভূমিহীনদের সবাই দরিদ্র নয়। ধরে নেই অন্তত ৬৭ লাখ বাদ দিয়ে ৫ কোটি লোক হচ্ছে দরিদ্র ও মজুরিভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত। এছাড়া বাকি যে গ্রামীণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ লোক রয়ে গেল যারা জমির মালিক তাদের মধ্যেও যারা খুব কম জমির মালিক রয়েছেন তাদেরকে বলা যায় “আগামীকালের মজুর” অর্থাত্ কৃষি জমি থেকে তাদের যে আয় হয় তা দিয়ে তাদের সারাবছরের ভোগ ব্যয় মেটে না। সারাবছর নিজের জমিতে কর্মসংস্থানও হয় না। এদের কেউ কেউ বর্গা বা সনজমার মাধ্যমে জমি সংগ্রহ করে কৃষিতেই টিকে থাকেন। তবে নিচের দিকের একটি বিরাট অংশ “আধা মজুরের” দিন যাপন করেন। অর্থাত্ বছরের একটি বৃহত্ সময় শ্রম বিক্রী করেই দিন যাপন করেন। তবে এই শ্রম বিক্রয় কৃষি ও অকৃষি উভয় খাতেই তারা করে থাকেন। সাধারণ সমীক্ষায় এই দরিদ্র চাষীদের সংখ্যানুপাত ধরা হয় মোট ভূমি মালিকদের অর্ধেক, তাহলে ৫ কোটি ৬৭ লাখ গ্রামীণ ভূমি-মালিকদের অর্ধেক অর্থাত্ আরো প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তারা হচ্ছেন শ্রম বিক্রেতা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত যদিও জমি থেকে তাদের পূর্ণ বিচ্ছেদ এখনো সম্ভব হয়নি। এদেরকে আগের সংখ্যাটির সংগে যোগ করলে ক্ষেতমজুরসহ মোট গ্রামীণ মজুরের পরিবারের সদস্য-সদস্যাসহ হিসাবটি দাঁড়াবে ৭ কোটি ৮৩ লাখ। ধরা যাক সবমিলিয়ে ৮ কোটি। এই হিসাবানুসারে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই হচ্ছে ক্ষেতমজুরসহ গ্রামীণ মজুর। এদের সংগে শহরের মজুরদের (যারা এদেরই উত্তর পুরুষ) যোগ করলে সংখ্যাটি অবশ্যই জাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে পরিণত হবে। ২০০৫-০৬ শ্রম জরিপে দেখানো হচ্ছে কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বনিয়োজিত ও নিয়োগকারীর অনুপাত হচ্ছে মোট কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যার ৪২.০৩ শতাংশ। অর্থাত্ বাকি ৫৮ শতাংশের কাজের ধরন হচ্ছে অবৈতনিক পারিবারিক কর্মী, বেতনভোগী কর্মী, মজুরিভোগী নিয়মিত-অনিয়মিত শ্রমিক। তাহলে এই হিসাবেও ৫৮ শতাংশই হচ্ছে কায়িক ও মানসিক শ্রমজীবী। এদের মধ্যে অবশ্যই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠরা হবেন গ্রামীণ মজুর।
বামপন্থীদের জন্য এই সংখ্যাতত্ত্বটি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশে শ্রমজীবীরাই (যারা বেতন বা মজুরি নিয়ে জীবিকার্জন করেন) সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীতে পরিণত হয়েছেন। (সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাবেও!)। আর একটু আগে আমরা দেখিয়েছি বাংলাদেশের কৃষিতে এবং গ্রামেও গ্রামীণ মজুররাই সংখ্যার বিচারে প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছেন। এদের মধ্যে অবশ্য সম্পূর্ণ ভূমিহীন সর্বহারা চরম দরিদ্ররাও রয়েছেন, রয়েছেন কার্যত ভূমিহীন .৫০ একর পর্যন্ত জমির মালিকরা এবং রয়েছেন ২.৫ একর পর্যন্ত জমির মালিক প্রান্তিক চাষীদের বিরাট একটি অংশ। সুতরাং প্রান্তিক চাষী, পূর্ণ বর্গাচাষী, ক্ষেতমজুর এবং অকৃষিখাতের মজুর ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোগফল হচ্ছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ তথা ৮ কোটি মানুষ। আজকের প্রতিপাদ্য এদের দৃষ্টিতে ২০১৩ অর্থবছরের বাজেট।
বাজেট-২০১৩ কতিপয় প্রাসঙ্গিক পরিসংখ্যান :প্রথম দৃষ্টি দেয়া যাক অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন বাজেটের সামগ্রিকতায় কোথায় কতটুকু প্রাসঙ্গিক বরাদ্দ হয়েছে তার দিকে এবং আমরা দেখতে চেষ্টা করবো গতবছরের তুলনায় সেই বরাদ্দের ক্ষেত্রে মোট পরিমাণ ও আপেক্ষিক পরিমাণ বেড়েছে না কমেছে? প্রথমেই দৃষ্টি দেয়া যাক স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের চিত্রটির দিকে। ২০১২-১৩ সালে এখানে সংশোধিত বরাদ্দের হিসাবটি দেয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৮ কোটি টাকা। এবার ২০১৩-১৪’র জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব হচ্ছে ১৫ হাজার ৮শ’ তিন কোটি টাকা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের মোট পরিমাণ একই রয়ে গেছে অর্থাত্ অবশ্যই তার আপেক্ষিক পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। (কারণ মোট বাজেটের আয়তন গতবছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে)। কেউ বলতে পারেন যে কৃষিখাতের কি অবস্থা সেটিও দেখতে হবে। এটি নিয়ে ইতোমধ্যে নানা বিতর্ক জমে উঠেছে। কেউ বলছেন কৃষিখাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমে গেছে- অতএব এই সরকার কৃষকবান্ধব নয়। আমিও প্রথমে তাই ভাবতাম কারণ সাদা চোখের পরিসংখ্যান তাই বলছে। কিন্তু সমপ্রতি বজলুর রহমান ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক বাজেট সেমিনারে আমার উত্থাপিত একটি প্রবন্ধের আলোচনায় উপস্থিত থেকে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এ প্রসংগে একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরে দেখিয়েছেন আসলে ভর্তুকির হারও কমেনি, মোট ভর্তুকিও কমেনি। যাই হোক, পরিসংখ্যানগুলো একটু ভাল করে দেখা যাক। উল্লেখ করে রাখি এসব পরিসংখ্যানেরই উত্স সরকারি দলিল “বাজেটের সংক্ষিপ্তসার” ডকুমেন্টটি যা বাজেট বক্তৃতার সেটের মধ্যেই সরবরাহ করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রথমে আমরা দেখতে পাই ২০১২-১৩ সালে সরকার কৃষিতে ব্যয়ের প্রস্তাব করেছিলেন ১৪,৪৬৭ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে সংশোধিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৮৫০ কোটি টাকা। এবারো প্রস্তাবিত বরাদ্দ সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে কম এবং তা হচ্ছে ১৭৪৭৭ কোটি টাকা। তবে এই প্রস্তাব সংশোধন শেষে আরো কমবে না বাড়বে তা অনেকখানি নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। তবে একথা অতীত রেকর্ড থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বিএনপি পন্থী সরকার ক্ষমতায় আসলে এই বাজেটের কৃষি অভিমুখিনতা আরো কমার সম্ভাবনাই বেশি। যাই হোক আমরা যদি আওয়ামী আমলের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি এবং গতবছরের প্রস্তাবিত ব্যয়ের সংগে এ বছরের প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনা করি তাহলে দেখবো এটা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০১০ কোটি টাকা। হিসাবানুসারে এই বৃদ্ধির হার ২০.৮০ শতাংশ। এটা প্রশংসাযোগ্য এই জন্য যে এত টানাটানির মধ্যেই কৃষিখাতে বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে বাজেট সাইজ বৃদ্ধির ১৬ শতাংশ হারের চেয়েও বেশি হারে। অর্থাত্ সামগ্রিকভাবে প্র্স্তাবিত ব্যয়ের আপেক্ষিক গুরুত্ব গত বছরের তুলনায় এবার বেড়েছে। এটা ঈপ্সিত পরিবর্তন অভিমুখী একটি পদক্ষেপ। অন্য ভিতরের এক অংকের হিসাবে দেখা যায় যে কৃষিখাতে প্রস্তাবিত ভর্তুকি বরাদ্দ আগে ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা, এখনো প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছর ভর্তুকির সংশোধিত বরাদ্দের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এ থেকে সবার ধারণা হয়েছিল যে এবছর কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ প্রস্তাবানুসারে, সংশোধিত পরিমাণের তুলনায় ৩ হাজার কোটি টাকা কম। অবশ্য এখন কৃষিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা অনুসারে আমরা জানি যে ঐ ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা আসলে ব্যয় হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বকেয়া ভর্তুকি বাবদ। অতত্রব প্রকৃত মোট ভর্তুকি বরাদ্দ অপরিবর্তিত রয়েছে এবং যেহেতু ভর্তুকির হার অপরিবর্তিত রাখা হবে সুতরাং মোট ভর্তুকি ব্যবহারের মাত্রা অনুযায়ী বর্ধিত হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। মূল কথা দাঁড়াচ্ছে এই যে বর্তমান সরকারের কৃষি বরাদ্দের গতি প্রবণতায় কোন নেতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। তবে সমপ্রতি কৃষকরা যে মূল্য সংকটে পতিত হয়েছেন এবং চালকল ব্যবসায়ীরা মধ্যস্বত্বভোগী হিসাবে কৃষকদের জন্য প্রদত্ত সরকারি সংগ্রহ অভিযানের Price Supportটুকুর সুফল নিজেদের পাত্রে টেনে নিচ্ছেন, তা নিরোধের কোন পরিকল্পনা বা চিত্র বাজেটে নেই। এটা গুদামের অভাবের সমস্যা না, এটা সুশাসনের সমস্যা। সংজ্ঞানুসারে গ্রামীণ মজুর ও ক্ষেতমজুরদের একটি বিরাট অংশ দরিদ্র। প্রশ্ন হচ্ছে এই দরিদ্রদের জন্য বাজেটে কি বরাদ্দ রাখা হয়েছে?
“ট্রাডিশানাল ট্রিক্ল ডাউন” থিওরীর প্রবক্তারা দাবি করেন যে, প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেলে, বেকারত্ব কমে এবং তার ফলে দরিদ্রদের কর্মসংস্থান হবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। তারা আরো দাবি করেন যে প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিতহারে বৃদ্ধি পেলে, দারিদ্র্যের হার বর্ধিতহারে হ্রাস পাবে। এই দাবির পূর্বানুমানটি হচ্ছে “আয়ের বন্টন বৈষম্য স্থির থাকবে” তথা দরিদ্র ও ধনীদের আয় বৃদ্ধির হার গড় প্রবৃদ্ধির হারের সমান থাকবে। আমরা এই বক্তব্যটি প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ গড়ের মধ্যে বিকট বৈষম্য লুকিয়ে থাকে। ঠাট্টা করে সেন স্কুলের অর্থনীতিবিদরা বলেন, “আমার অর্ধেক দেহ চুল্লিতে আছে, আর অর্ধেক দেহ ফ্রিজে আছে, গড়ে আমি নাতিশীতোষ্ণ আছি।” (U.N.D.P র বিশেষজ্ঞ ড. সেলিম জাহানের উক্তি)।
সুতরাং আওয়ামী আমলে গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের নিচে নামেনি। এটা বলা যথেষ্ট নয়, আমাদের দেখতে হবে বর্ধিত এই আয় কিভাবে বন্টিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর পর আমাদের আয় বন্টনে বৈষম্যের সূচক ছিল .২৩। বর্তমানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে .৪৭ এ পরিণত হয়েছে। অবশ্য বলা হয় ২০০৫-এ গিনি সহগ ছিল .৪৬ এবং তারপর থেকে তা ৮ বছরে খুবই কম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু .৪৬ সূচকটি মোটেও তুলনামূলকভাবে কম নয়। এমনকি চীনেও এই সূচকটি আমাদের চেয়ে কম ছিল (১৯৯৫-২০০২ সালে চীনে গিনি সূচকমাত্রা .৪২)। ভারতেও তা মাত্র .৩১ (২০০৪-০৫)। অবশ্য অনেকগুলো দেশ রয়েছে যা আমাদের কাছাকাছি বা বেশি যেমন: শ্রীলংকা - .৪৯ (২০০২), থাইল্যান্ড-.৫৩ (২০০২), মালয়েশিয়া-.৪৪ (১৯৯৯) ইত্যাদি। সুতরাং বৈষম্য না কমাতে পারলে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে চুঁইয়ে পরে দরিদ্রদের কাছে তা পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র্য নিরসনের নিওলিবারাল মডেলের অকার্যকারিতা আজ সর্বত্রই প্রমাণিত হয়েছে। আপেক্ষিক দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমাতে হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সংগে বৈষম্যও দ্রুত হ্রাস করতে হবে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ও দারিদ্র্য হ্রাসের হারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত নিচের তালিকাটি (ড. রুশিদান ইসলামের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ, “বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন: স্বাধীনতার পর ৪০ বছর”- এর পৃ:- ১৭৯ থেকে উদ্ধৃত) প্রবৃদ্ধির হারের সংগে দারিদ্র্যের হার হ্রাসের দুর্বল সম্পর্কটি বুঝতে সহায়ক হবেঃ
উপরোক্ত তালিকার তাত্পর্য ও ব্যাখ্যা নিয়ে আমি দুটো কথা বলবো। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছ যে জেনারেল এরশাদের আমলে (১৯৮৬-১৯৯১) দারিদ্র্যও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জি.ডি.পি. প্রবৃদ্ধির হারও ৩.৭৩-এর মত নিম্নহারে স্থবির হয়ে রয়েছিল। আবার ১৯৯১-৯৬ সালে প্রবৃদ্ধির হার .৬৬ পয়েন্ট বাড়ে এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পায় ১.৫৬ পয়েন্ট। এটা বেশ চমকপ্রদ ইতিবাচক সম্পর্ক দেখাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্যের হ্রাসের হার সেই অনুপাতে হ্রাস হচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে বন্টনের বিষয়টিকে এখন অগ্রাধিকার দেয়া ছাড়া দ্রুতহারে দারিদ্র্য হ্রাস আর সম্ভব হবে না। তবে ড. আবুল বারাকাতের মতে প্রচলিত দারিদ্র্য হার যথেষ্ট অব-পরিমিত (underestimated), সুতরাং একে ধরে সিদ্ধান্ত টানা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না)। ২০১৩-র প্রস্তাবিত বাজেটে বণ্টনমূলক অন্যতম খাত হচ্ছে “সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণের খাত”। এই খাতে সরকারি প্রস্তাবিত ব্যয় ২০১২-১৩’র জন্য ছিল ১১৩৪২ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত হয়ে তা দাঁড়ায় ১১৪৫৬ কোটি টাকা। আর ২০১৩’র বাজেটে এই খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১২৬৩৫ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে প্রস্তাবিত ব্যয় আগের প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনায় ১১.৪০ শতাংশ বেশি। কিন্তু আমাদের সামগ্রিক বাজেট প্রস্তাব যেহেতু ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেহেতু স্বভাবতই বোঝা যায় যে এ খাতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের আপেক্ষিক গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে। এটি মোটেও কাম্য ছিল না।
একই ধারা লক্ষ্য করা যায় বিশেষভাবে ক্ষেতমজুরদের ও গ্রামীণ মজুরদের জন্য যেসব কাবিখা ও স্থানান্তর ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে তাদের প্রবণতার ক্ষেত্রে। ২০১২-১৩-তে প্রস্তাব ছিল ১৪৩৮ কোটি টাকা। বর্তমানে বাজেটে উক্ত ব্যয় প্রস্তাব মাত্র ১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৪৫৭ কোটি টাকা। আমাদের উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলোর যথার্থতা বিচারের সময় অবশ্যই “সিষ্টেম লসের কথা” মনে রাখতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যয় সংশোধিত ব্যয় এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে তফাত্ তো রয়েছেই, উপরন্তু আমলাতন্ত্র, স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, লীকেজ ও মিস-টার্গেটিং-এর ফলে সরকারের ব্যয় প্রকৃত গ্রহীতাদের কাছে সবসময় তথাকথিত সিষ্টেম-লস বিযোগ করে অবশিষ্ট আকারে পৌঁছায়। প্রায় ৮২ ধরনের সরকারি নিরাপত্তা জাল কর্মসূচির উপর এক জরিপ চালিয়ে বিশ্বব্যাংকের তথ্য থেকে বের হয়েছে এ ধরনের “সিষ্টেম লসের” পরিমাণ প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায় যে নিছক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দরিদ্রদের প্রশ্ন করার সংগঠিত ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আমরা হয়তো ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ফল বেশি পেতে পারি, এই একই ব্যয় প্রস্তাব থেকে।
কতিপয় দৃষ্টি আকর্ষণকারী বিষয় :এবার আমি বাংলাদেশের অর্থনীতির কতিপয় ইতিবাচক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবোঃ-
১। বাংলাদেশে ১৯৯৫-এর পর যে বর্ধিত প্রবৃদ্ধির হার দেখা যায় তার মূল চালিকাশক্তি চারটি: (ক) কৃষি (খ) গ্রামীণ ও শহুরে খাতে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান (বস্তুগত দ্রব্য ও সেবাখাত উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত), (গ) পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং (ঘ) রেমিট্যান্সের দ্রুত প্রবৃদ্ধি।
২। বাংলাদেশের জনসংখ্যায় একটি “জনমিতিক লভ্যাংশের” (Demographic Dividend) সূচনা হয়েছে। অর্থাত্ একজন কর্মক্ষম লোকের উপর নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করেছে।
৩। বাংলাদেশ আগামীদিনের এশিয়ার প্রবৃদ্ধির অগ্রনায়ক ভারত ও চীনের সংগে সঠিক পরিপূরক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে তার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরো বাড়বে।
৪। বাংলাদেশের শ্রমবাহিনীতে বিপুল পরিমাণে নারীদের আগমন ঘটছে।
৫। বাংলাদেশের কতিপয় সামাজিক ইন্ডিকেটরগুলোর (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) অগ্রগতির হার দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকার পরে অবস্থিত এবং ভারতের গড় হারের চেয়ে বেশি।
কিন্তু এসব সম্ভাবনার বিপরীতে প্রধান নেতিবাচক প্রবণতাটি হচ্ছে :৬। বাংলাদেশে আয় বৈষম্য অনেক উঁচুতে। সম্পদ বৈষম্য অনেক উঁচুতে। আয় পুনর্বন্টনের পদক্ষেপগুলোতে “সিষ্টেম লস” অবিশ্বাস্য মাত্রায় বেশি। রাজনীতি বয়ে গেছে অনুত্পাদনশীল ধনিক শ্রেণীর হাতে এখনো কুক্ষিগত।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো মনে রেখে গ্রামাঞ্চলে ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ শ্রমিকদের সুসংগঠিত করে একদিকে দাবি করতে হবে “আমূল ভূমিসংস্কারের” এবং অন্যদিকে সংগ্রাম করতে হবে “শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে” নিজেদের হিস্যা প্রতিষ্ঠা করে নিজেদেরকে মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য। আরো সংগ্রাম করতে হবে সরকারের সকল দরিদ্র অভিমুখী ব্যয়কে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অধীনে আনার জন্য। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেখানে নিজেদের সত্ প্রতিনিধিদের ক্ষমতাসীন করতে হবে। NGOদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণের পরিবর্তে সমবায় ক্রেডিট ইউনিয়ন গঠন করে দরিদ্ররা নিজেরাই যাতে স্ব-সাহায্যকারী সংস্থায় পরিণত হতে পারে সেজন্য চেষ্টা করতে হবে। এন.জি.ওদেরও বুঝতে হবে তলা থেকে প্রগতির যে কথা তারা মুখে বলেন ও দাবি করে থাকেন তা সত্য সত্য কার্যকরী করতে হলে তাদেরকে আস্তে আস্তে কর্পোরেট পুঁজিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দৈত্যে পরিণত হওয়ার বদলে দরিদ্রদের স্বক্ষমতায়নের মাধ্যমে নিজেদের ধীরে ধীরে সংকুচিত করে গুটিয়ে ফেলাটাই প্রকৃত সাফল্যের লক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হবে। তাদের ভূমিকা animator-এর, substitution-এর নয়। সেই কাম্য পথে যাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোয় ৮ কোটি লোকের বর্ধিত ক্ষমতায়ন। তাদের ক্ষমতায়ন ও আর্থিক উন্নতি ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজার বৃদ্ধিও সম্ভব হবে না, সম্ভব হবে না রপ্তানিমুখী শিল্পের বা উন্নত কৃষির জন্য দক্ষ শ্রমের চাহিদা পূরণ, সম্ভব হবে না তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ইত্যাদি পূর্ব-এশীয় দেশগুলোর মত উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে একই সংগে প্রবৃদ্ধি ও সমতার মেলবন্ধন ঘটানো। এমনকি ভারতের কেরালা বা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে জনগণের যেটুকু ক্ষমতায়ন ও অবস্থার উন্নতি পুঁজিবাদের ভেতরেই সম্ভব হয়েছিল সেটুকুও আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এসব জরুরি কাজ সম্পাদন ছাড়া আমাদের “ডিজিটাল বাংলাদেশ” বা “মধ্য আয়ের” বাংলাদেশের স্বপ্ন সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। আমরা আশা করবো নতুন গণমুখী এই উন্নয়ন ধারা সূচনার সংগ্রামে জাতিকে সমৃদ্ধ জাতিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে জাতির সর্বাপেক্ষা উত্পাদনশীল অংশ ৮ কোটি গ্রামীণ মজুর তার আত্মশক্তি উপলব্ধি করে আগামীতে সংগঠিতভাবে এগিয়ে আসবেন। নিজেকে অধিষ্ঠিত করবেন জাতীয় অগ্রগতির সংগ্রামে একজন অন্যতম অংশীদার হিসাবে।
লেখক :অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
