আশা জাগানিয়া অর্জন

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৩, ২১:৩৩
বাংলাদেশের বয়স মাত্র ৪২ বত্সর। দেশকালের বিচারে ইহা মোটেও দীর্ঘ সময় নহে। অথচ এই সময়ে আমরা যাহা অর্জন করিয়াছি তাহা লইয়া যে কোনো জাতি গর্ব করিতে পারে। কিন্তু আমাদের অনেক মহত্ অর্জনও যে তুচ্ছ ব্যর্থতার উচ্চ নিনাদের নিচে চাপা পড়িয়া যায় তাহা কোনো নূতন কথা নহে। ইহার জন্য ব্যর্থতার আধিক্য নাকি আমাদের নেতিবাচক মানসিকতাই দায়ী তাহা লইয়া গবেষণা চলিতে পারে। তবে ইহা অনস্বীকার্য যে, সামগ্রিকভাবে আমাদের তাক লাগানো সাফল্য বা অর্জনের তালিকাও কম দীর্ঘ নহে। সাফল্যের এই মুকুটে সম্প্রতি যুক্ত হইয়াছে আরও দুইটি নূতন পালক। তন্মধ্যে প্রথমটি হইল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিশেষ সম্মান অর্জন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের স্বীকৃতি হিসাবে সম্প্রতি এই পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় অর্জনটি আরও তাত্পর্যপূর্ণ। বিশ্বের প্রভাবশালী চিকিত্সা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট বলিয়াছে যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে রীতিমতো চমক লাগানো পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। ইহার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বলা হইয়াছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশে গড় আয়ু সবচাইতে বেশি, মোট প্রজনন হার সবচাইতে কম এবং শিশু ও পাঁচ বত্সরের কম বয়সীদের মৃত্যুহারও সবচাইতে কম। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে কম ব্যয় করা হয়। সাময়িকীটির গত ১৫ জুন সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণামূলক প্রবন্ধে তাত্পর্যপূর্ণ এই মন্তব্যটি করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা ২২ জন গবেষক এই প্রবন্ধটি তৈরি করেন। আসলে অর্জন আরও বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা কর্মসূচির (ইউএনএফপিএ) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরকালে সম্প্রতি খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জটিল ধাপটি সফলভাবেই অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে। এখন তাহাকে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হইবে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র, জনবহুল ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাত্পদ একটি দেশের জন্য ইহা যে কতো বড়ো একটি অর্জন তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে, মাত্র কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় সাফল্যের জন্যও জাতিসংঘ বাংলাদেশকে বিশেষভাবে সম্মানিত করিয়াছিল। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তার সিংহভাগই পায় নাই বাংলাদেশ। তাহা সত্ত্বেও বিশ্ব পরিসরে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি মডেল রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পাইয়াছে। দারিদ্র্য বিমোচন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপুল সাফল্য কোনো আকস্মিক বিষয় নহে। নোবেলবিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন দীর্ঘদিন যাবত্ বলিয়া আসিতেছেন যে, এইসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন প্রতিবেশী ভারতকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। কিভাবে এই অসাধ্য সাধিত হইল তাহার জুতসই উত্তরও তিনি দিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে ল্যানসেট সাময়িকীর পর্যবেক্ষণটি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। তাহাদের মতে, এই সাফল্যের মূলে রহিয়াছে সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বড়ো ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও এই অঙ্গীকারে কোনো ব্যত্যয় ঘটে নাই। সামরিক-বেসামরিক সকল সরকারই এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখিয়াছে। পাশাপাশি, মাঠকর্মীদের বাড়ি বাড়ি সেবা দান এবং সরকার-এনজিও সমন্বিত উদ্যোগের সুফল তো আছেই। সর্বোপরি শিক্ষা, অবকাঠামো ও যোগাযোগ ক্ষেত্রের অগ্রগতি সরাসরি স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব ফেলিয়াছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পিছাইয়া নাই বাংলাদেশ। বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতিকে ‘বিস্ময়কর’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছে একাধিক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিস্ময়কর এই কারণে যে, কী বিপুল প্রতিকূলতার পাহাড় ঠেলিয়া বাংলাদেশ আগাইয়া চলিয়াছে তাহা কাহারো অজানা নহে। গ্যাস, বিদ্যুত্ ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার মতো দীর্ঘকালীন সমস্যাকেও ছাপাইয়া উঠিয়াছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। তবে আশার কথা হইল, যাবতীয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আরও সামনে আগাইয়া যাওয়ার জন্যও জনগণ প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন শুধু একটি অনুকূল রাজনৈতিক আবহ। বিষয়টি যে বহুলাংশে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার উপর নির্ভরশীল তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা শুধু এইটুকু বলিতে পারি যে, এই অর্জন শুধু ধরিয়া রাখাই যথেষ্ট নহে, তাহাকে আরও আগাইয়া নিতে হইবে। অবারিত করিতে হইবে জনগণের অগ্রযাত্রার অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন