জনগণের এক দিন

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৩, ২১:৩৪
১৫ই জুন ২০১৩। সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল এই চার সিটি করর্পোরেশন নির্বাচনকালীন ভোটারদের রায় দেয়ার দিনে বহুল প্রচারিত একটি পত্রিকার প্রথম পাতার হেডিং ছিল আজ ভোটারদের দিন। পত্রিকার এই বিশেষ খবরটি দেখে একটি গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। গল্পটি হচ্ছে -এক লবণ ব্যবসায়ীর একটি মাত্র পুত্র ছিল। তার সবচেয়ে বড় বদ অভ্যাস ছিল তাকে বাবা যা বলতেন সে তার ঠিক উল্টো কাজটি করতো। লবণ ব্যবসায়ীর যেহেতু আর কোন সন্তান ছিল না উপায়ন্তর না দেখে তার ব্যবসায়ের উত্তরাধিকার তৈরির জন্যে কোন এক মাস থেকে তার ব্যবসায়িক কাজে তার পুত্র সন্তানটিকে নিয়োজিত করেন। ব্যবসায়ীকে লবণ বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রতিদিন লবণের বস্তা গাধার পিঠে চাপিয়ে বাজারে নিয়ে যেতে হতো। গ্রামের বাজারে যেতে পার হতে হতো বিরাট একটি খাল। প্রতিদিন গাধার পিঠে লবণের বস্তা চাপিয়ে সেই খাল অতিক্রম করে বাজারে পৌঁছাতে হতো। সামনে থাকতেন ব্যবসায়ী বাবা, পেছনে পুত্র। বাবা যেহেতু তার পুত্রকে তিনি যা বলেন তার সু-পুত্র বিপরীত কাজটি করে থাকেন, তাই খাল অতিক্রম করার সময় লবণের বস্তা যেন খালের পানিতে ডুবে না যায় সেজন্য বাবা পুত্রকে জোর গলায় বলতেন, ‘এমন ভাবে বস্তা ধরে রাখিস যাতে করে লবণের বস্তা পানিতে ডুবে থাকে’। পুত্র করতেন ঠিক বিপরীত কাজটি। এমন ভাবে লবণের বস্তা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উঁচু করে ধরে রাখতেন যাতে লবণের বস্তায় একটুও খালের পানি স্পর্শ না করে। ব্যবসায়ী বাবা পুত্রের সাথে এ কৌশল খাটিয়ে মাসের পুরো দিনগুলোতে ভালোই ব্যবসা করে যাচ্ছিলেন। মাসের শেষ দিনে তিনি একই ভাবে ছেলেকে বলছিলেন বস্তা এমন ভাবে ধরে রাখিস যাতে লবণের বস্তা পানিতে ডুবে থাকে। সেদিন সত্যি সত্যি পুত্র লবণের বস্তা পানিতে ডুবিয়ে দিলো। বাবার তো মাথায় হাত। চিত্কার করে বলে উঠলেন হারামজাদা প্রতিদিন আমি যা বলি তুই তার উল্টো করিস, আজ কেন কথামতো কাজ করলি? পুত্র অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, ‘বাবা আমি ঠিক করেছি মাসে অন্তত একবার তোমার কথামতো কাজ করবো। আজ ছিল সেই দিন’। পুত্র এক দিন কথামতো কাজ করায় বাবার ঘটলো সর্বনাশ। আমরা ভোটাররা বা সাধারণ জনগণ সারা বছরই রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক অব্যবস্থার করুণ শিকারে পরিণত হয়ে বেঁচে থাকি না বাঁচার মত। নিরাপত্তা, চিকিত্সা, ন্যূনতম নাগরিক অধিকারের বালাই নেই এদেশে। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে ঠিক ভাবে বাড়িতে ফিরবো কিনা জানা নেই আমাদের সাধারণ নাগরিকদের। সময়ের প্রতি সেকেন্ডের কাঁটা ধরে জনজীবনে বাড়ছে দিন দিন শুধু অমোঘ নিষ্ঠুরতা। লুট, হরিলুট, বঞ্চনা, অপমৃত্যু, গুম, অপহরণ, হত্যা, দালান ধস, অগ্নিসংযোগ, হরতালে ধ্বংসযজ্ঞ ইত্যাদিতে অতিষ্ঠ হয়ে উপায়হীন জনসাধারণ খিস্তি খেউড় আওড়াতে থাকেন সারা বছর, মনে মনে পণ করেন আর ভোট দেবেন না, রাজনীতিবিদদের দিকে ঘুরে তাকাবেন না, অযোগ্যদের হাতে আর দেশ তুলে দেবেন না, সেই জনগণ ঐ এক দিন, ভোটের দিন, আবারো ছাপ মারেন ঐ একই বৃত্তে। ঐ একদিন আমরা ভুলে যাই সব গ্লানিকর ইতিহাস। রক্তাক্ত সব বেদনা মুছে আবারো বুক বাঁধি নতুন আশায়। এক দিন সব ভুলে রাজনীতিবিদদের কথামতো কাজ করতে যেয়ে ডুবিয়ে দেই পানিতে লবণের বস্তার মতো আমাদের ভাগ্যের আলো। ভালো মানুষদের কোন সুযোগ দেই না, অন্তত ভারসাম্য একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টাও চালাই না। হয় এই দল না হয় ঐ দল। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমে সরকার গঠনের প্রথমদিন থেকেই শুরু করে জয়ী দল তাদের দম্ভ দিয়ে চলতেই থাকে যতক্ষণ আসীন থাকে ক্ষমতায়। পরাজিতরাও পরের দিন থেকে শুরু করে আগামী জয়ের আন্দোলন। মধুর প্রতিশ্রুতির নতুন গানে মুগ্ধ হয়ে, আমরা ঐ একদিন ভোট দিয়ে চক্রাকারে তুলে দেই এই দেশের দায়ভার অতীতের রাজনীতিবিদদের হাতেই। ছোট ছোট আশা প্রত্যাশায় আবারো স্বপ্ন বুনি নতুন দিনের। খিড়কি খুলে, ভরসার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাই। ভোর হবার আগেই সব স্বপ্ন লোপাট হয়ে যায়। আহা! এই একদিনের ভোটের জন্য রাজনীতিবিদদের যে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আমরা দেখি তার অন্তত ৪০/৫০ ভাগ যদি এ রাজনীতিবিদদের দ্বারা পূরণ হতো তা হলেও অনেক দূর এগিয়ে যেতাম আমরা। হে আমাদের ভাগ্য পরিচালক রাজনীতিবিদগণ আমরা আপনাদের সেবা দাস, আমৃত্যু আমরা এদেশের জনগণ তাই করে যাবো। শুধু একবার আমাদের সাধারণের দিকে তাকান। আমরা সাধারণ জনগণ চাই না ফ্ল্যাগ তোলা গাড়ি, চাই না ক্ষমতা, চাই না বিঘা বিঘা জমি-ভূমি। শুধু চাই একটু নিরাপত্তা, চাই চিকিত্সা, বাসস্থান, শিক্ষার পরিবেশ, জীবনধারণের উপযুক্ত মান। রাজনীতির কর্ণধারদের প্রতি আমাদের বেশিরভাগ সরল মানুষে ভরা এদেশের একটাই আকুতি। ঐ এক দিন আপনাদের কথামতো আপনাদের দেশ চালানোর রায় দিয়ে আমরা আর চাই না লবণের বস্তা পানিতে ডুবাতে। লেখক :ব্যাংকার ই-মেইল :[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন