নির্বাচনের আগের দিন একটি দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা ঘোষণা করেছিলেন যে, নির্বাচনের ফলাফল পাল্টিয়ে দিবার মতলবে সরকার নির্বাচনী এলাকায় সেনা মোতায়েন করে নাই। ঐ নেতার এ উক্তি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ভোটের যে শান্তিপূর্ণ অবস্থা দেখা গেছে তাতে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় যে, বাংলাদেশে কোন নির্বাচনেই আর সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। এ কথা সবাই জানেন যে, বিএনপি বারবার প্রতিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি করে আসছে। কিন্তু এ কথা আজ বাস্তব যে, কোন নির্বাচনেই আর সেনা মোতায়েনের যে প্রয়োজন হবে না, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের অধীনে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যতগুলো নির্বাচন, উপ-নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলোই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। কোন নির্বাচনেই সেনা মোতায়েন করার প্রয়োজন হয় নাই। আজকের নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কোন প্রয়োজন হবে না।
নির্বাচন একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। দেশের রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিলে তা পুলিশ, র্যাব ইত্যাদি দিয়েই গোলযোগপূর্ণ অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। সেনাবাহিনীকে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা নির্বাচন পরিচালনার জন্য, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হলে, বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সময়ে পরিস্থিতির অবনতি হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পুলিশ, র্যাবকেই দায়িত্ব দেয়া উচিত। পুলিশ, র্যাব যদি সরকারের পক্ষ অবলম্বন করে সরকারকে বিজয় ছিনিয়ে নিতে সহায়তা করে, সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে বলা যায়, প্রতিবাদ করা যায় এবং ঐ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা যায়। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ প্রশাসনের নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটি যদি সেনাবাহিনী মোতায়েন সত্ত্বেও ঘটে যায় তাহলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বলার সুযোগ আছে কি? কেননা, সেনাবাহিনী হলো দেশের সার্বভৌত্বের প্রতীক। তাই সেনাবাহিনীকে যে কোন ব্যাপারে নিয়োগ করা উচিত না। সেনাবাহিনী দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জনগণের সেবায় নিয়োজিত হয়। বহিঃশত্রু দেশ আক্রমণ করলে সেনাবাহিনী যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করে। সেনাবাহিনী যাতে কোনভাবে বিতর্কিত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার দায়িত্ব প্রত্যেককে নিতে হবে। অতএব, সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে কারো নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার চেষ্টা করা উচিত নয়।
আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত যে, সেনাবাহিনী রোবট নয়, সেনাবাহিনী বিদেশ থেকে আমদানি করা নয়। সেনাবাহিনী আমাদের সন্তান, আমাদের ভাই, আমাদের পরিবারের সদস্য। সেনাবাহিনীর প্রত্যেকটি সদ্যসের ভোটাধিকার আছে। নির্বাচনে তারাও ভোট দেন। তাদেরও ভিন্ন ভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন দলের প্রতি সমর্থন আছে। তবে সেনাবাহিনীকে তাদের প্রতিষ্ঠানের শৃংখলা ও চেইন অব কমান্ড মেনে চলতে হয়। সেনাবাহিনীর শৃংখলা নষ্ট হলে দেশ বিপদে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নাই। অতীতে আমরা সে ভয়াবহ অবস্থা দেখেছি। এই বাহিনী যাতে শৃংখলাবিহীন হয়ে পড়তে পারে সে পথে এদেরকে ঠেলে দেয়া কোন দেশপ্রেমিকের কাজ নয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব যখন ১৯৯১ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করেন তিনি নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করেন নাই। বিচারপতি হাবিবুর রহমান যখন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করেন তখনও তিনি নির্বাচনে সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত করেন নাই। বিগত ২৩ বছর দেশে সেনাবাহিনী সুশৃংখল অবস্থায় তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীকে আর কোন দলের লাঠিয়াল বাহিনী বানাবার চেষ্টা করা উচিত নয়। আজকে যে নির্বাচন চলছে তা দেখে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে, গণতান্ত্রিক দেশে বর্তমান সরকারের অধীনেই নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন সম্ভব। জনগণ এটাও প্রত্যক্ষ করলেন যে, নির্বাচনকালীন আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ, র্যাব, বিজিবিই যথেষ্ট। সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই।
চার সিটি কর্পোরেশন মেয়র নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। পরাজিত প্রার্থীরা বিজয়ী প্রার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়াছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ বিজয় গণতন্ত্রের বিজয়। বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীরা সবাই সবার সাথে আলিঙ্গন করেছেন। এমন সুন্দর সমপ্রীতি পূর্বে কখনো দেখা যায় নাই। সরকার প্রমাণ করে দিয়েছে যে, দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যথেষ্ট সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য এবং প্রশংসার যোগ্য ছিল। কোন নির্বাচনে যে আর কোনদিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না তা প্রমাণিত হয়ে গেল।
লেখক :সাবেক ব্যাংকার ও ছাত্রনেতা
