ইরানে মধ্যপন্থার জয়

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ২২:১৯
ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব খুশি। বিশ্বমিডিয়া এক্ষণে প্রশংসা করিয়া চলিয়াছে দেশটির জনগণের ‘সংস্কার’ মানসিকতার। কিন্তু তাহা মুদ্রার একটি পৃষ্ঠার চিত্র, এবং সেই চিত্রও যে অনেকাংশেই কুয়াশাচ্ছন্ন, তাহা ভাবিবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে। গত ১৪ জুনের এই নির্বাচনে এককভাবে ৫০ শতাংশের অধিক ভোটে ইরানের ১১তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হইলেন অপেক্ষাকৃত উদার ও সংস্কারপন্থি হাসান রুহানি। চার বত্সর পূর্বে ২০০৯ সালে এমনই এক নির্বাচনের ফলাফল লইয়া জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। নির্বাচনের রায় লইয়া তেহরানের রাজপথ ফুঁসিয়া উঠিয়াছিল জনবিক্ষোভে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এইবারের চিত্র গতবারের বিপরীত বলা যায়। নরমপন্থি নূতন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে তাহার দেশের পত্রপত্রিকাও ভূষিত করিতেছে নানা অভিধায়। ইতিমাদ পত্রিকার শিরোনাম ছিল—ইরানে আশার প্রতীককে স্বাগত। আরেকটি পত্রিকা ‘আরমান’-এর শিরোনাম ছিল ‘মধ্যপন্থার সূর্য উদিত হইয়াছে’। কিন্তু কিসের আশার প্রতীক? সদ্যবিদায়ী মাহমুদ আহমেদিনেজাদের শাসন ব্যবস্থায় রুহানি কি এইবার ইরানে উদারপন্থার মলয় বাতাস আনিতে পারিবেন? তাহা সম্ভবত সম্ভব নহে বাস্তবতার নিরিখেই। যদিও হাসান রুহানিকে মনে করা হইয়া থাকে একজন লিবারেল ও সংশোধনবাদী হিসাবে, কিন্তু তাহা দৃশ্যত মাত্র। ইরানের শাসনপদ্ধতির মূল নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেইনি এবং ধর্মীয় বিচারক সংস্থার হাতে। সকল প্রার্থীকেই নির্বাচনের পূর্বে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে কড়া ফিল্টার পার হইয়া আসিতে হয়। রুহানি তাহা সফলভাবে পার হইয়াছেন। বলা যায়, যেই আট জন ভোটে দাঁড়াইবার অনুমতি পাইয়াছেন, তাহাদের ভিতরে সংস্কারপন্থি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী একজনও ছিলেন না। সুতরাং রুহানিকে বলা যায় মধ্যপন্থি, যিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হয়তো এক নম্বর আশীর্বাদপুষ্ট প্রার্থী ছিলেন না। তাহা সত্ত্বেও তাহার প্রার্থিতা বাতিল হয় নাই অন্য আটজন সংস্কারপন্থির মতো। অতঃপর প্রশ্ন হইল, তুলনামূলক উদারপন্থি রুহানি কেন নির্বাচিত হইলেন নিরঙ্কুশভাবে? কোন সেই যাদু, যাহার বলে জনগণকে আশা ও আশ্বাসের দোলনায় চড়াইয়া রুহানি বৈতরণী পার হইলেন সহজেই? এই আশা ও আশ্বাসের নাম বোধকরি অর্থনীতি ও স্বস্তি। দীর্ঘদিন ধরিয়া ইরানে বহাল রহিয়াছে মার্কিন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলির দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের সময় রুহানি জোর দিয়া বলিয়াছিলেন, তিনি আলোচনার ক্ষেত্রে পরম্পরা মানিয়া চলিবার পক্ষে। পরমাণু কর্মসূচির কারণে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের জনগণ ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ৩০ শতাংশ। জাতীয় মুদ্রা রিয়াল শুধু গত বত্সরেই প্রায় ৭০ শতাংশ ক্রয়ক্ষমতা হারাইয়াছে। তৈলসম্পদের প্রাচুর্য্যে ইরানের স্থান বিশ্বে চতুর্থ হওয়া সত্ত্বেও তেল রপ্তানির অবস্থা হতাশাজনক। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের ব্যবধানে জাতীয় আয় ৪ শতাংশ থেকে কমিয়া দাঁড়াইয়াছে দশমিক চার শতাংশ। বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। ইরানের জনসাধারণের এই ত্রাহি অবস্থার সহিত যুক্ত হইয়াছে আরও অসংখ্য বিষয়, যাহার ভিতরে রহিয়াছে সীমান্তের অতি নিকটে সিরিয়ার চলমান যুদ্ধের প্রভাবও। সুতরাং ইরানের জনগণ যে পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তনের জোয়ার যে রক্ষণশীলতার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া এক্ষণে মধ্যপন্থার প্রতি উদ্ভাসিত হইয়াছে—তাহা প্রকৃত বাস্তব। ইরানে ‘পরিবর্তনের’ যে কথিত সুবাতাস জনগণ পাইতে চাহে, তাহা হইল তাহাদের প্রবহমান যাপিত জীবনে সচ্ছলতা ফিরাইবার স্বপ্ন। তাহা সফল হউক, এই প্রত্যাশা আমাদেরও।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন