আলোকপাত

স্বাস্থ্য সেবায় চাই আন্তরিকতা

আপডেট : ২০ জুন ২০১৩, ২২:২০
সেবাই চিকিত্সকদের প্রধান ব্রত হওয়ার কথা থাকলেও আজকের অধিকাংশ চিকিত্সকের মধ্যে এই গুণটির বড়ই অভাব। শহর কিংবা গ্রাম সবক্ষেত্রেই চিকিত্সা সেবা গ্রহণকারীরা বঞ্চিত হচ্ছে আন্তরিক সেবা থেকে। হাত যশ আর যোগ্যতার শ্রেণিভেদে বিভিন্ন চিকিত্সকের ফি বিভিন্ন রকম। চেম্বারে রোগী প্রতি সর্বনিম্ন ফি মফস্বলে ২শ’ টাকা। শহরাঞ্চলে ৫শ’ থেকে ১২শ’ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকবৃন্দ হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় দায়সারা এবং গুরুত্বহীনভাবে রোগী দেখায় অতি দরিদ্র এবং ভূমিহীনরা ব্যতীত কেউই হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে চিকিত্সা সেবা নিতে আগ্রহী নয়। আর চেম্বার কিংবা কোয়ার্টারে দেখাতে চাইলে ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে চিকিত্সা সেবা গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় যেখানে দৈনিক ১৮১ টাকা (প্রায়), সেখানে চিকিত্সকের উচ্চ ফি, ওষুধের মূল্য পরিশোধ করে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সত্যই দুরূহ। এরপর নব্বুইর দশকের প্রথম থেকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন ‘টেস্ট’ সংস্কৃতি। ছোটখাট রোগের উপসর্গেও কোন কোন চিকিত্সক অযথা দেন বিভিন্ন ধরনের টেস্ট। রোগ সঠিকভাবে নির্ণয়ের অজুহাতে রক্ত, কফ, মূত্র টেস্ট কিংবা এক্সরে করার পরামর্শ দেয়ার পেছনে একটা বড় কারণ অবশ্য আছে। অভিযোগ রয়েছে প্রতিটি টেস্ট বাবদ সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক পেয়ে থাকেন শতকরা হিসাবে মাসোহারা। আর এই কারণেই সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরও গর্ভবতী মহিলাদের স্বাভাবিক গর্ভপাতের স্থলে অপারেশন করানোয় চিকিত্সকদের অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রোগীরা চিকিত্সকদের কাছ থেকে যে ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) পাচ্ছে, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব বিদ্যমান। বছর তিনেক আগের একটা ঘটনা। দীর্ঘপথ হেঁটে এক অশীতিপর দরিদ্র বৃদ্ধ মফস্বলের এক সরকারি হাসপাতালের জনৈক চিকিত্সককে দেখাতে গিয়েছিলেন তার কোয়ার্টারে। রোগীদের দীর্ঘলাইন শেষ হলে চিকিত্সক ওই বৃদ্ধটির রোগের সমস্যার কথা শুনে তাকে একটা ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেন। এতে সর্বোচ্চ তিন মিনিট ব্যয় হলো। চিকিত্সক হাত বাড়িয়ে ফি চাইলে দরিদ্র রোগীটি জানালেন, তিনি অনেক কষ্টে মাত্র ১শ’টি টাকা যোগাড় করেছেন। এটা দিয়েই চিকিত্সকের ভিজিট এবং ওষুধ ক্রয় করতে হবে। ওই চিকিত্সক একথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে রোগীটির হাত থেকে একশ’ টাকার নোটটি কেড়ে নিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, আমার ভিজিট ৩শ’ টাকা। একশ’ টাকা এখনকার মতো রাখছি। আপনি আর আমার কাছে আসবেন না। অসহায় বৃদ্ধা হাঁ করে কয়েক মুহূর্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে চিকিত্সকের চেম্বার থেকে বের হয়ে গেলেন। এছাড়া নানা কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান সারাদেশেই নিম্নতম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ আমাদের মতোই আরেক উন্নয়নশীল দেশ ভারতে স্বাস্থ্যসেবার মান বিশ্বমানের। সেখানে চিকিত্সকদের প্রাইভেট প্রাকটিস নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের মধ্যে অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা নেই বললেই চলে। কয়েক বছর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জনৈক প্রকৌশলীর সহধর্মিণীর লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই কারণে তিনি ঢাকার একাধিক নামকরা ক্লিনিক এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দীর্ঘদিন ট্রিটমেন্ট নিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে ভারতের মাদ্রাজের একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মাস দেড়েক পর তিনি পুরো সুস্থ হয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন। ওখানে তার সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। দু’দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানের ব্যবধান প্রসঙ্গে মিসেস প্রকৌশলী বলেন, ওখানকার চিকিত্সক এবং সেবিকারা রোগীর প্রতি অতি আন্তরিক এবং রোগীর আরোগ্য লাভের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আর হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং শৃঙ্খলাময়, যা এদেশে অনেক হাসপাতালে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই। এদেশে নার্সদের নিকট থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে গেলে বখশিশ দিতে হয় আর চিকিত্সকদের সঙ্গে অনেক সময় কথাই বলা যায় না। এদেশে চিকিত্সা পেশায় অঢেল সম্পদ অর্জনের হাতছানি থাকায় প্রতিটি মা-বাবাই চান তার সন্তান বড় হয়ে যেন চিকিত্সক হয়। নৈতিক-অনৈতিক, উচিত-অনুচিত এসব বিষয় মুখ্য নয়, অর্থ উপার্জনই যেন একমাত্র লক্ষ্য। তাই পিতা-মাতার একটাই চাওয়া তার সন্তানটি শিক্ষা জীবন শেষে ডাক্তার হয়ে যেন থাকে ‘দুধে-ভাতে’। ডাক্তাররা দুধে ভাতে অবশ্যই থাকবেন। তবে তাদের মানবিকতাবোধ ও এই পেশায় প্রবেশের আগে গ্রহণ করা শপথের প্রতিও আন্তরিক থাকা প্রয়োজন। লেখক :সদস্য, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (BELTA)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন