ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি একটু একটু করে ধূসর হয়ে যাচ্ছে নাকি? ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধান আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি? চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী কর্তৃক ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধান ছুঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়ে আশঙ্কাটি নতুন করে প্রবল হয়ে উঠেছে। অবশ্য গত মার্চ মাসে নতুন করে রক্ষণশীল জায়নবাদী ও মৌলবাদী জায়নবাদীদের কোয়ালিশন দ্বিতীয়বারের মত ক্ষমতায় আসার পর থেকে আশঙ্কাটি ঘনীভূত হচ্ছিল। শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে আছে সেই ২০১০ সালের অক্টোবর মাস থেকে। কারণ পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধ না করেই আলোচনা চালিয়ে যেতে চায় ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুরুব্বীদের মধ্যে কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব। এদিকে আবার কয়েকদিন আগে প্রধান মুরুব্বী যুক্তরাষ্ট্র বিবদমান দুইপক্ষকে বেশ খানিকটা বকে দিল শান্তি স্থাপনে তাদের অমনযোগিতার জন্য। জানিয়ে দেয়া হল যে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল সমস্যার সমাধানের জন্য যুগের পর যুগ ধরে সময় দেয়া সম্ভব নয়; কেননা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো অনেক কাজ আছে।
বকে দেয়ার ব্যাপারটা লক্ষ্য করার মত। আক্রমণকারী এবং আক্রান্ত উভয়কেই বকে দেয়া হল। শান্তি প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে থাকার জন্য ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে সমানভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হল। কিন্তু ব্যাপারখানা কি আসলে তেমন? পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ইসরায়েল তা মানছে না। ফিলিস্তিনিদের মতে ইসরায়েলকে আলোচনাতে আসতে হবে অবৈধ স্থাপনা বন্ধ করে। কিন্তু ইসরায়েল কোন ‘শর্তযুক্ত’ আলোচনাতে রাজি নয়। অতএব বন্ধ আছে শান্তি আলোচনা। এতে ইসরায়েলেরতো কোন ক্ষতি নেই; ক্ষতি যা কিছু ফিলিস্তিনের। শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে থাকাতেও ফিলিস্তিনের সে অর্থে ভূমিকা নেই। ফিলিস্তিন চাইছে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মান্য করে আলোচনাতে বসুক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চোখে দেখাই যাচ্ছে দুইপক্ষ সমানভাবে অপরাধী। এমনধারা চলতে থাকলে স্বাধীন ফিলিস্তিন কবে আসবে?
উপরের প্রশ্নটি জরুরি। কারণ ১৯৯৩ সালের ঐতিহাসিক ওসলো চুক্তির প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের আইনানুগ মর্যাদা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ফয়সালা হয়ে যাবার কথা। অথচ এখন চুক্তির দুই দশক হয়ে গেছে! গত নভেম্বরে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘অ-সদস্য রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ফিলিস্তিন ঠিক কবে নাগাদ সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হবে তা কেউ বলতে পারবে না। ইদানীং এটাও স্পষ্ট যে, শান্তি আলোচনা নিয়ে ইসরায়েল খুব একটা আগ্রহী নয়। ইসরায়েলি লিবারেলরা মনে করে যে কেবল ফিলিস্তিনের দিক থেকে নয় ইসরায়েলের স্বার্থের দিক থেকে দেখলেও শান্তি আলোচনা জরুরি আর ‘দুই-রাষ্ট্র’ ফর্মুলার মধ্যেই নিহিত আছে ইসরায়েলের জনগণের নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তির বীজ। কিন্তু ২০০৯ সালে রক্ষণশীল জায়নবাদী ও মৌলবাদী জায়নবাদীদের কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যেতে থাকে। এরা ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনমনীয় অবস্থান নেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যাবতীয় চাপ উপেক্ষা করার নীতি অবলম্বন করে। এমনকি বারাক ওবামা প্রশাসনের সাথে দৃশ্যমান মতানৈক্য চালিয়ে যেতেও এরা দ্বিধা করেনি।
হামাসের মত সংগঠনকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো, জেরুজালেমের ওপরে ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখার মত উগ্র ডানপন্থি এজেন্ডাগুলোর সফল ব্যবহার করে নির্বাচনী সাফল্য পাওয়া একাধিক দল এ বছরের মার্চে নতুন করে কোয়ালিশন সরকারের শরীক হয়েছে। কট্টর ডানপন্থি লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মত গঠিত কোয়ালিশনে হাতনু কিংবা ইয়াস আতিদের মত অফিশিয়ালি লিবারেল দলগুলোর সাথে সাথে উগ্র জায়নবাদী দল হাবাইত হায়েহুদি আছে। কোয়ালিশনের প্রধান শরীক দল লিকুদ পার্টির নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী হবার কারণে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিছুটা বাক সংযমে বাধ্য থাকলেও কোয়ালিশনের ছোট শরীক হাবাইত হায়েহুদি নেতা ও ইকোনমি মিনিস্টার নাফতালি বেনেট্টে কোন রকমের রাখঢাক ছাড়াই ‘দুই-রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠাভিত্তিক সমাধানের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এই সোমবার দেয়া এক ভাষণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গটিকে তিনি অতীতের বিষয় হিসেবেও বর্ণনা করেন। বেনেট্টের দাবি মতে ইসরায়েলবাসী ‘দুই-রাষ্ট্র’ ভিত্তিক সমাধানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। এখানেই শেষ নয়। ইসরায়েল এই নেতার মতে ইসরায়েল কখনোই কোন ধরনের দখলদারিত্ব চালায়নি। তিনি পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ নামক অংশটিকে অবিলম্বে ইসরায়েলের অংশ করে নেয়ার দাবি জানান। উল্লেখ্য, অসলো চুক্তি পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি এই তিনটি এরিয়াতে ভাগ করা হয়। চুক্তি অনুসারে পশ্চিম তীরের মোট আয়তনের ৬১ ভাগ সম্পন্ন ‘এরিয়া সি’ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার ব্যাপারে উভয়পক্ষ একমত হয়েছিল। তবে একথাও বলা হয়েছিল যে এই ব্যবস্থা সমগ্র ভূখণ্ডের ব্যাপারে দ্বিপাক্ষিক একটি সমাধান হওয়া পর্যন্ত বলবত্ থাকবে। উগ্র জায়নবাদীরা এখন বলতে চাইছে যে যেহেতু ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানের বাস্তবতাই এখন আর নেই তাহলে ‘এরিয়া সি’কে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের অংশ করে নেয়া হোক। চুক্তি থেকে দূরে সরে যাবার ক্ষেত্রে এরা ‘এরিয়া সি’তে ইসরায়েলি সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তি দেখাচ্ছে। এখানে সাড়ে তিন লাখের মত ইসরায়েলি এবং অর্ধ লক্ষের মত ফিলিস্তিনি বাস করে। তদুপরি পশ্চিম তীরে উর্বরতম জমিগুলো ‘এরিয়া সি’তেই অবস্থিত। সাধারণ ইসরায়েলিদের এই লোভটাই দেখাচ্ছে উগ্রপন্থিরা। নাফতালি বেনেট্টে আসলে হঠাত্ করে এমন কথা বলেননি। গতমাসে আইনসভা নেসেট-এর এক সভাতে অরিত স্ত্রক নামের একজন নিজ দলীয় নেসেট সদস্যকে দিয়ে একই রকমের কথা বলিয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিলেন তিনি।
দলীয় কাগজপত্রে নিজেদের লিবারেল দাবি করলেও উগ্র জায়নবাদ চর্চাতে পিছিয়ে থাকছে না কোয়ালিশনের আরেক শরীক ইয়েশ আটিদ। পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলের সরে আসার যৌক্তিকতার কথা মুখে বললেও নেসেটের প্রো-সেটেলমেন্ট ককাসে যোগ দিয়েছেন এই দলের একাধিক নেতা। এই ককাসটি ‘পুরো ইসরায়েল ভূমিতে ইহুদী জনগণের আইনি অবস্থান শক্তিশালীকরণ’ এবং ইসরায়েল গাজা থেকে ‘সরে এসে যে নিদারুণ ভুল করেছে তা সংশোধন এবং এহেন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে’ অঙ্গীকারাবদ্ধ। দখলকৃত এলাকাগুলোকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এবং গাজা এলাকা থেকে সরে আসাকে নিদারুণ ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা ককাসে যোগ দেয়া লিবারেল দল আসলে কতখানি লিবারেল তা স্পষ্ট। শুধু দলের কথা কেন, নেসেটের স্পিকার ইউলি এদেলস্টেইনও আলোচ্য ককাসে যোগ দিয়েছিলেন। স্বয়ং স্পিকার যদি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে যোগ দিতে পারেন তাহলে ঘটনা কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়।
সোমবার নাফতালি বেনেট্টের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শোরগোল পড়ে গেলে মুখ খোলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানের পক্ষে থাকেন এবং এমন একটি ফিলিস্তিন চাওয়ার কথা বলেন যেটি হবে ‘বেসামরিক’ এবং যেটি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ‘স্বীকৃতি’ দেবে। নেতানিয়াহু এখন অবধি ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানের কথা বলছেন বটে। কিন্তু ইসরায়েলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বর্তমান সমীকরণ ও কোয়ালিশনে উগ্র জায়নবাদীদের অবস্থান অব্যাহত থাকলে তিনি ভবিষ্যতে এই বক্তব্য অব্যাহত রাখেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। কিংবা এমনতো হতে পারে যে কোয়ালিশনের মৌলবাদী শরীকদের মন্ত্রণা বা চাপে প্রধান শরীক দল লিকুদ ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরো কট্টর অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে লিবারেলদের ক্ষমতার বাইরে থাকা দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়ে নেবে। গত কয়েক বছরে ইসরায়েলে ইহুদী মৌলবাদের প্রকোপ যে মাত্রাতে বেড়েছে তাতে করে কোয়ালিশনের কট্টরপন্থিদের দিক থেকে লিকুদের ওপরে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা আছে। আর নেতানিয়াহুর নিজের দলের মধ্যেই ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধান নিয়ে ভয়ানক সমালোচনাকারী লোকজন রয়েছে। এরাতো একটা চাপ জারি রাখবেই। প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ অবশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানের ব্যাপারে সোচ্চার। চলতি সপ্তাহে কয়েকবার তিনি একথা বলেছেন একাধিক জায়গায়। কিন্তু ইসরায়েল হচ্ছে একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে প্রেসিডেন্টের কার্যকর ক্ষমতা সীমিত। সেজন্য যাবতীয় শুভেচ্ছা থাকলে অদূর ভবিষ্যতে অবসরে চলে যাবার সম্ভাবনার মধ্যে থাকা ৯০ বছর বয়সী পেরেজের ইসরায়েলি নীতিতে এককভাবে তেমন কোন পরিবর্তন এনে দিতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। আর এখন যেমন চলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সেরকমভাবে আরো কিছু দিন হাল ছেড়ে দিয়ে রাখে তাহলেতো কথাই নেই।
লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
