ভারতের বন্যা ও ভূমিধস

আপডেট : ২১ জুন ২০১৩, ২১:৪৮
ভারতের উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২০৭ জন নিহত হইয়াছে বলিয়া জানা গিয়াছে। ইহাছাড়া টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির খবর অনুযায়ী এখনও পানিবন্দী রহিয়াছে অর্ধলক্ষ মানুষ। তন্মধ্যে আটকা পড়িয়াছেন বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। বিশেষত নিখোঁজ রহিয়াছে এক হাজারেরও বেশি মানুষ। তাই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়িবার আশঙ্কা করা হইতেছে। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ঘরবাড়ির পাশাপাশি অসংখ্য মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। অনেক স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়িয়াছে যাহার মেরামত এক বত্সরেও সম্ভব হইবে না। আগাম মৌসুমি বর্ষণের ফলে আকস্মিক এই বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হইয়াছে। তবে এইসব দুর্গত এলাকায় সামরিক-বেসামরিক সর্বাত্মক উদ্ধার ও ত্রাণ তত্পরতা অব্যাহত আছে। আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হইয়াছে যে, একটানা বাহাত্তর ঘন্টা বর্ষণের পর বৃষ্টি কিছুটা কমিয়া আসে। আর তখনই ভয়াবহ ও প্রকৃত ধ্বংসচিত্রটি পরিলক্ষিত হয়। চামোলি, শ্রীনগর, গৌরীকুন্ড ও উত্তরকাশী এলাকায় আট ফুট গভীর কাদা-মাটি-পাথরের নিচে চাপা পড়ে অগণিত সড়ক ও বাড়িঘর। যমুনা নদীর উত্স যমুনোত্রীর জনপদও হড়পা বানে কার্যত মুছিয়া গিয়াছে। তাহার জের ধরিয়া কুল ছাপাইয়া রাজধানী দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকা ভাসাইয়াছে সারা বত্সরের ক্ষীণতণু যমুনা। পরিস্থিতি এতটাই বিধ্বংসী রূপ লাভ করিয়াছে যে, এক বত্সরের জন্য ঐতিহাসিক কেদারনাথের মন্দির বন্ধ ঘোষণা করিতে হইয়াছে উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বহুগুণাকে। এমনকি নেপাল সীমান্তে ধারচুলার নিকট রাস্তা বিধ্বস্ত হওয়ায় এই বত্সরের ন্যায় মানস যাত্রাও স্থগিত করিয়া দিয়াছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করিয়া মন্তব্য করিয়াছেন, ‘অবিশ্বাস্য বিপর্যয়। যেন পাহাড়ে সুনামি।’ আর কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের এমপি ও এমএলএ-দের এক মাসের বেতন রাষ্ট্রীয় ত্রাণতহবিলে দেওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন। উত্তরাখন্ড ও হিমাচল জুড়ে এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন যে, ক্রমাগত অরণ্য নিধন এবং পর্যটক টানিতে নিয়ম ভাঙিয়া একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ ডাকিয়া আনিতেছে বিপদ। উত্তরাখন্ডের ১৪টি নদী উপত্যকায় ২২০টিরও বেশি জলবিদ্যুত্ প্রকল্প এবং খনন কাজ চলিতেছে। খননের সময় বা সুড়ঙ্গ তৈরির জন্য যে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহাতেই বাড়িয়া যাইতেছে ধসের আশঙ্কা। ২০১১-১২ সালে উত্তরকাশীতে যে বিপর্যয় দেখা দিয়াছিল তাহার জন্য দায়ী ছিল অসিগঙ্গা জলবিদ্যুত্ প্রকল্প। প্রকল্প এলাকায় বাঁধ তৈরির জন্য নিয়মিত বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তাহাতে পাড়াড়ের টুকরা নদীতে আসিয়া জমা হয় এবং নদীর জলস্তর বাড়িতে থাকে। সেই সঙ্গে ভারি বর্ষণে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তাহাছাড়া নদীর গতিরোধ ও পার্বত্য এলাকার স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটানোর কারণে প্রকৃতির প্রতিশোধ গ্রহণ অস্বাভাবিক নহে। বাংলাদেশে পাহাড় কাটার কারণে প্রতি বত্সর বর্ষাকালে পাহাড় ধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটিতেছে। তাই ভারতের আলোচিত এই দুর্যোগ হইতে আমাদেরও শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে। প্রকৃতি বিরুদ্ধ আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের ব্যাপারে সচেতন হইতে হইবে। পরিশেষে ভারতের বন্যা ও ভূমিধসে নিহতদের প্রতি আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। ক্ষতিগ্রস্ত সকলের প্রতি জানাই সহানুভূতি। আমরা আশা করি, বন্ধুপ্রতীম ও নিকট প্রতিবেশী ভারত শীঘ্রই এই শোক ও দুর্বিষহ পরিস্থিতি কাটাইয়া উঠিতে সক্ষম হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন