ঃ তুমি কি জানো আমাদের সঙ্গে তোমাদের তফাত কী?
ঃ জানার আগেতো আমাকে জানতে হবে- তোমরা কারা, আর আমরা কারা?
ঃ আমরা হচ্ছি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, আমরা হচ্ছি সাম্প্রদায়িক ও ছদ্মসাম্প্রদায়িক।
ঃ আর বলতে হবে না। তোমাদের সঙ্গে আমাদের তফাত কোনদিন ঘুচবার নয়। তবে, তফাত খোঁজার আগে তোমাদের ছবি মাথায় নিয়ে আমি অন্য বিষয় খুঁজি।
ঃ কী খোঁজ?
ঃ খুঁজি, কোথায় তোমাদের কাছে দেশের ‘ঋণ’, কেন দেশের মানুষ এত “অকৃতজ্ঞ’ হয়ে গেছে যে তোমাদের সে ঋণ স্বীকারই করতে চাচ্ছে না!
ঃ খুঁজে পেয়েছো?
ঃ পেয়েছি তো অবশ্যই! আরও অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় আমি খুঁজে পেয়েছি।
ঃ ইন্টারেস্টিং একটি দু’টি বিষয় আগে বল। ঋণ স্বীকারের বিষয়টি পরে বলো। আমারও কিছু কথা আছে। আমিও বলবো।
ঃ ইন্টারেস্টিং একটা বিষয় হচ্ছে— তুমি যে বল নিয়ন্ত্রণ, মুক্তি, জল, প্রয়াত, প্রয়াণ, স্নান, প্রভু, ঈশ্বর ইত্যাদি; তখন আমার খুব খারাপ লাগে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন বল, মহাপ্রভু, বিধাতা, পরমেশ্বর ইত্যাদি। এসব যে আমাদের আসোয়াস্তিতে রাখে তুমি বোঝ না! এত বছর বয়স গিলছো, কৃষ্টি সংস্কৃতি কালচার-রিলিজিয়ন আর ‘ভোকেবুলারি’র ফারাক পার্থক্য বোঝ না তুমি?!
ঃ বুঝবো না কেন! শতবার বুঝি, সহস্রবার বুঝি। বুঝেশুনেই আমি এসব বলি, ও অন্যকে এমন বলায় উদ্বুদ্ধ করি। ভাষা কারও ব্যক্তিগত সম্পদও নয়, পৈত্রিকসম্পদও নয়। এমনকি দ্বিতীয় পিতার সম্পদও নয়। আমাদের মুখের ভাষায় কোন আইনি বাড়ির মালিকানা নেই। আমার ভাষার সব শব্দই আমার। আর প্রভু, মহাপ্রভু, বিধাতা, সৃষ্টিকর্তা, মালিক, স্রষ্টা— এসব ধর্মনিরপেক্ষ ও বিশ্বাসনিরপেক্ষ শব্দ। এসব আপনার-আমার-তাহার, সব মানুষের শব্দ। এই শব্দগুলোর প্রয়োগে বিধাতা ও সৃষ্টিকর্তা কোন বিশেষ বিশ্বাসে বন্দী হয়ে পড়েন না। তিনি ক্ষুদ্র ও খন্ডিত হয়ে যান না। আরও পরিষ্কার, আরও কঠিন ও আরও নিরেট করে বললে, তিনি সাম্প্রদায়িক ও প্রকোষ্ঠবন্দী হয়ে থাকেন না। যিনি মহত্ ও বিশাল, যিনি অপরিমেয় ও সর্বনিরপেক্ষ, যিনি সর্বব্যাপ্ত ও সর্বভূতে বিরাজমান- তাঁকে সেভাবেই দেখা উচিত, তাঁর মূল্যায়নও সেভাবেই হওয়া উচিত। তাঁর কাছ থেকে কিছুই আমরা কেড়ে নিতে পারি না। সে দুঃসাহসও আমাদের কারও থাকা উচিত নয়। যদি কেউ তা দেখায়, তা সইবেও না।
আপনার মত বা আমার মত ক্ষুদ্র, খর্ব, সীমাবদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক হীনবুদ্ধি বা ভেদবুদ্ধিচালিত লোকেরা হয় ভুলে যাই, নয় ভুলে থাকার চেষ্টা করি যে বিধাতা শুধু রাম বা রহিমকেই সৃষ্টি করেন নি; তিনি ডেভিড, সর্দারজি, মুত্সুদ্দি, মার্চেন্ট সবাইকেই সংসারে এনেছেন। অফিসার-প্রফেসার-কোবলার-কার্পেন্টার-প্লামার-সিঙ্গার-প্লেয়ার-কীলার-পেইন্টার-ড্রাইভার-অ্যাকটার-ডকটার এনজিনিয়ার সবাই তাঁর সৃষ্টি।
ঃ কথা বড় বেশি বল তোমরা! সব কথার পিঠে একটা যুক্তি তোমরা কেমন করে কেমন করে যেন তুলেও ধরতে পারো।
ঃ সেদিকে আপনি পরে যাবেন। আগে বলুন আমার কথা আপনি বুঝতে পেরেছেন কিনা।
ঃ যদি বলি, পারি নি, আপনিতো আমাকে ছাড়বেন না। বোঝাতে বোঝাতে আমার মাথার সব পোকা খুলে ফেলবেন। ফেলবেন কি ফেলবেন না?!
ঃ হয়তো ফেলবো। কারণ, আপনাদের মত লোকদের বোঝানো খুব দরকার। নিজেরাও আপনারা ভুল বোঝেন, অন্যদেরও ভুল বোঝান, বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের। আপনারা আমাদের এই কোমলমতি শিশুগুলোর মাথার মগজ খুলে নিয়ে তাদের ব্রেইনবক্স ধুয়ে ও লেপাপোছা সেরে তাতে নতুন নতুন বাজেবাজে ও পচাপচা জিনিস ঢুকিয়ে দেন। আপনারা তো আসলে খুব অদ্ভুত প্রাণী।
লেখক :শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক
