একটি ঘটনাকে গিলে খায় আরেকটি ঘটনা

আপডেট : ২২ জুন ২০১৩, ২১:৩৩
একের পর এক অঘটন ঘটছে। ঘটনাগুলো তাত্ক্ষণিক দেশবাসীর মনে বেশ রেখাপাত করছে। প্রতিটি ঘটনায়ই আমরা জনগণ বেশ আবেগী হই, কিন্তু আবার সহজে তা ভুলেও যাই। এভাবেই একটি ঘটনাকে গিলে খায় আরেকটি ঘটনা। বিডিআর হত্যাকাণ্ড, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, রেলের কালো বিড়াল সমাচার থেকে শুরু করে সাভারের রানা প্লাজা। এর সবই এখন দেশের মানুষ ভুলতে বসেছে। আমাদের সরকারও এসব ঘটনা অতিদ্রুত চাপা দিতে বেশ সফলতা দেখিয়েছে। এ বিষয়ে যে তারা পারঙ্গম তা কয়েকটি ঘটনার বর্ণনাতেই টের পাওয়া যাবে। ঘটে যাওয়া বড় বড় সব ঘটনাই জনগণের মন থেকে কিভাবে যেন হঠাত্ই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়! পরবর্তী সময় এসব ঘটনার বর্ণনা দিলে হয়তো একটু-আধটু মনে পড়ে। পুরনো কথা ভেবে স্মৃতিগুলো ফের কষ্ট দেয়; তবে আগের মতো করে নয়। অনেকে হয়তো বলবেন-“হ্যাঁ ঘটনাটি মনে আছে; এমন একটা ঘটনাতো ঘটেছিলো? তখন খুব কষ্ট দিয়েছিলো মনে।” এভাবেই ঘটনা প্রবাহে একটি ঘটনা শেষ না হতেই সামনে আসে আরেকটি ঘটনা। একে একে পেছনেরগুলো ভুলতেও থাকে জনগণ। সামনে যা পায় তা নিয়েই দেশবাসী নিত্য আহ্ উহ্ করে। আরেকটি ঘটনা সামনে চলে এলে তা আবার বেমালুম ভুলে যায়। এদেশের মানুষগুলো কোন বিষয়ে যেমন বেশ সিরিয়াস, আবার ঐ বিষয়টি তাদের ভুলতেও বেশি সময় নেয় না। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। আজকের এ লেখায় গত চার বছরেরও বেশি সময়ের নানা ঘটনাবলী পাঠকদের স্মৃৃতিপটে ভাসাতে চাই। দেখি পাঠক স্মৃতি হাতড়ে সেসব ঘটনায় এখনও কষ্ট পান কিনা। বোধকরি ২/১টি ছাড়া কোনটিই এখন হয়তো দেশবাসীর হূদয়ে আগের মতো করে রেখাপাত করবে না। কষ্টে অস্থিরও হবে না পাঠক হূদয়। বিগত সময়ে কি ঘটেছে তা হয়তো তারা বেমালুম ভুলে গেছেন। মনের কোণে চাপা পড়ে আছে সেসব স্মৃতি। আসলে পুরনো কাসুন্দে আর এখন ঘাটে না কেউ; সামনে নতুন কি ঘটলো তাই এখন তাদের দেখার বিষয়। এ সরকারের শুরুর সময়টাতে চলে যাই। বিডিআর হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে বড় ধরনের হোঁচট খায় সরকার। সরকারের শুরুতে এই দুর্ঘটনা ছিল অগ্নিকুণ্ডের মতো। সেদিনের ঘটনায় চুয়াত্তর জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে সাতান্ন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, দুইজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, নয়জন বিডিআর সদস্য, একজন পুলিশ ও তিনজন পথচারী। এ ঘটনায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বে টান পড়ে। সরকারের টিকে থাকা না থাকার প্রশ্ন ওঠে। দেশের ইতিহাসে এটা ছিল অন্যতম বিয়োগান্ত ঘটনা। কিন্তু এ ঘটনাটিও এক সময় চাপা পড়ে যায়। এরপর ছাত্রলীগের তাণ্ডবে দেশ তটস্থ হয়ে ওঠে। সে সময় ছাত্রলীগ আলোচনা-সমালোচনার অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় সঙ্গে পাল্ল¬া দিয়ে ছাত্রশিবির বেপরোয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে গিয়ে তারা ছাত্র হত্যা করে ম্যানহোলে ফেলে রাখে। শিবিরের নৃশংসতায় পুরো জাতি থমকে ওঠে। আলোচিত শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি সামনে এসে দাঁড়ালে ছাত্রলীগ আর শিবিরের দানবীয় রূপ যেন ভুলতে বসে জনতা। ২০১১ সালের শুরুর দিকে দেশের শেয়ারবাজারের পতন ঘটে। পাঁচ মিনিটে অবিশ্বাস্য সূচক নেমে যায় ছয়শ’ পয়েন্টে। এর পর শুরু হয় ধারবাহিক দরপতনের কাহিনী। শেয়ারবাজার ইস্যুতে দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুজন পুঁজি হারিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, শেয়ারবাজার থেকে রেকর্ডসংখ্যক চল্লিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। শেয়ার বাজার ধসের সুরাহা আজও না হলেও পুরনো হিসাবে এ ইস্যুকেও মানুষ মনে রাখেনি। কারণ যে হারে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে যে পুরনো ঘটনাগুলো মনে রাখাই দুরূহ ব্যাপার। একটিকে পেছনে ফেলে সামনে এসে যাচ্ছে নতুন আরেকটি দুর্ঘটনা। কিন্তু কোনো ঘটনারই পরিসমাপ্তি আসছে না। বিডিআর, ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির আর শেয়ার কেলেংকারি উপচে সামনে আসে পদ্মা সেতু কেলেংকারি। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল সেতু নির্মাণে সরকার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিবদ্ধ হয়। সেইসঙ্গে একই বছর জাইকা এং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সাথেও সরকার এ সংক্রান্ত চুক্তি করে। শুরু হয় পদ্মা সেতুর প্রাথমিক কার্যক্রম। ঐ বছরই বিশ্বব্যাংক গোঁ ধরে। সেতুর ইস্যুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তারা। এ অপরাধে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিল করে। বেকায়দায় পড়ে সরকার। তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনাটিই তখন সারাদেশে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। এর পর-পরই রেলের কালো বিড়াল ইস্যু নিয়ে দেশে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ বিড়ালের বাস্তবে অস্তিত্ব না মিললেও দেশ জুড়ে তখন কালো বিড়াল ছিলো বার্নিং ইস্যু। তত্কালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রীর চেয়ারে বসেই রেলের কালো বিড়াল ধরতে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেন। একসময় তিনি নিজেই কালো বিড়াল বনে যান। ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন সুরঞ্জিত সেন। সামান্য এক ড্রাইভার থলের কালো বিড়াল বের করে জনসমক্ষে নিয়ে আসে। মন্ত্রী সুরঞ্জিতের এপিএস ওমর ফারুক ৭০ লাখ টাকাসহ বিজিবি হেড কোয়ার্টারে ধরা পড়েন। শুরু হয় দেশ জুড়ে হৈ-চৈ। সুরঞ্জিত বাবুকে নিয়ে সরকার মস্ত বেকায়দায় পড়ে। এ কেলেংকারি সরকারের মাথা হেঁট করে দেয়। বোধকরি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি ভালো চোখে দেখেননি তাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করেন। পরে অবশ্য তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী বানানো হয়। ঘুষ কেলেঙ্কারি নিয়ে যখন দেশ জুড়ে হৈ-চৈ পড়ে যায় তখনই কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী বনানী থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে অপহূত হন। ইলিয়াস গুম ইস্যু সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারি ইস্যুকে চাপা দিতে থাকে। বিএনপি ইলিয়াস ইস্যুতে হরতাল পালন করে। তখন পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের বেপক সংঘর্ষ শুরু হয়। আর এসব ঘটনায় সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারি চাপা পড়ে যায়। এর পর আলোচিত হয় সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি দম্পতি হত্যাকাণ্ড ইস্যুটি। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের কথা বললেও তা আর সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় পার হলেও আজো সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রকৃত খুনিদের খুঁজে বের করা হয়নি। এর পর আসে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারি। হলমার্ক ও ডেসটিনির কেলেঙ্কারি ঘটনা বাজারে চলমান অবস্থায় রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এ হামলা ও ভাংচুর করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে ৫ ও ৬ নভেম্বর সারা দেশে একযোগে বেপরোয়া তাণ্ডব চালায় জামাত -শিবির কর্মীরা। শিবিরের তাণ্ডবের মাঝেই আবার আলোচনার ইস্যু হয়ে যায় ছাত্রলীগ। সারা দেশ জুড়ে শিবির যে তাণ্ডব চালিয়েছে তা ম্লান করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর্তৃক বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড। ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে বিশ্বজিেক চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড ইস্যু সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এর পর ঘটে আরও অনেক ঘটনা। সর্বশেষ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ছিলো সবচাইতে হূদয়বিদারক ঘটনা। মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটলেও অতিসম্প্রতিকালের ৪ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের ভরাডুবির ঘটনাটি এখন সামনে রয়েছে। পাঠক, আমাদের এখন আর একটি নতুন ঘটনার জন্যই অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে সে ঘটনাটি যেন দুর্ঘটনা না হয়, এ প্রত্যাশায়ই রইলাম আমরা। লেখক:সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন