ডেমু ট্রেন না সাদা হাতি

আপডেট : ২২ জুন ২০১৩, ২১:৩৭
ডেমু ট্রেন দেখিলে প্রাণ ভরিয়া যায়, আর তাহাতে ভ্রমণ করিলে দম বন্ধ হইয়া প্রাণ নাকি দেহত্যাগ করিতে চাহে। বড় বিপদের কথা। সরকার পৌনে সাত শত কোটি টাকার অধিক খরচ করিয়া আমাদের উন্নতবিশ্বের রেলভ্রমণের আনন্দ দিতে চাহিলেন, রেল ব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়ায় রাঙাইতে চাহিলেন, কিন্তু বিধিবাম! তাহা কিনা বুমেরাং হইয়া গেল! ২০ সেট ডেমু ট্রেন হইয়া গেল কিংবদন্তির শ্বেত হস্তী? কিন্তু বিধির উপর দায় চাপাইলে কিংবদন্তির শ্যামদেশের রাজার বংশধরদের অপরাধ অদৃশ্য করা হয়। এই বংশধরেরা হইলেন আমাদের প্রশাসন যন্ত্রের কিছু মতলববাজ স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তা। চীন হইতে আমদানি করা ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেনের যাবতীয় যাত্রীবৈরী অবস্থার তদন্ত করা হইয়াছে। এই দেশে যাবতীয় অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করিলে বেশিরভাগ সময় যাহা হয়, এইবারও তাহাই হইয়াছে। অর্থাত্ কেঁচো খুঁড়িতে বাহির হইয়াছে সর্প। তদন্তে জানা গিয়াছে, ডেমু ট্রেন বাংলাদেশের আবহাওয়ার সহিত মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। শীতপ্রধান দেশে ইহারা চলিতে পারে। শুধু ইহাই নহে, ডেমু ট্রেনের নির্মাণে বিভিন্ন নকশাগত ত্রুটি চিহ্নিত করিয়াছে তদন্ত কমিটি। অভিযোগ উঠিয়াছে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও তথ্য গোপনের। আমাদের দুশ্চিন্তা এইখানেই। তদন্ত প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, ডেমু প্রকল্পের অধীনে ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তা একাধিকবার চীন সফর করিয়াছেন। তাহাদের ভিতরে ৮ জনের একদল কর্মকর্তা চার মাস অবস্থানও করিয়াছিলেন চীনে। নকশা অনুযায়ী ট্রেন তৈরি হইতেছে কিনা—তাহা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণই ছিল তাহাদের মূল কাজ। দলটি এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করিয়াছে। নকশা অনুযায়ী যে ট্রেন তৈরি হইতেছে না—বিষয়টি তাহারা চাপিয়া গিয়াছেন। ইহার বিপরীতে প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলিয়া তাহারা প্রতিবেদন জমা দিয়াছেন। ট্রেনগুলি যে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও উষ্ণ আবহাওয়ায় চলিবে, তাহা বিবেচনা করা হয় নাই। বরং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের তাংশান ভেহিক্যাল কোম্পানি যে ধরনের ডেমু তৈরি করিয়া থাকে, সেই অনুযায়ীই দরপত্র আহ্বান করা হয়। নন-এসি হইলেও ডেমু ট্রেনগুলি তৈরি করা হয় এসির মডেলে। এমনকি যাত্রী চাহিদার বিষয়টিও এই ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় নাই। বড় আকারের ট্রেন ক্রয় করিবার সুযোগ থাকিলেও তুলনামূলক অধিক ব্যয়ে সর্বাপেক্ষা ছোট ট্রেনগুলি ক্রয় করা হয়। কিংবদন্তি আছে, শ্যামদেশের (অধুনা থাইল্যান্ড) রাজা যদি কাহারো উপর রাগিয়া যাইতেন তবে তাহাকে পথে বসাইতে শ্বেত হস্তী উপহার দিতেন। কারণ রাজার দেওয়া উপহার প্রত্যাখ্যান করিবার সাধ্য কাহারো ছিল না, অথচ ওই ব্যয়সাধ্য হাতি পোষার সামর্থ্যও ছিল না তাহার। সাদা হাতি পুষিতে গিয়া উক্ত ব্যক্তির সর্বস্ব ব্যয় হইয়া যাইতো, ফলে অতি অল্প দিনেই পথে বসিতেন তিনি। আমাদের বেহাল রেল বিভাগকেও কি পথে বসাইতে চাহিয়াছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা? না হইলে সব জানিয়াও ডেমু নামের শ্বেতহস্তী কেন তাহারা গছাইয়া দিবেন আমাদের রেল বিভাগকে? নাকি আমাদের প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়া-শুনিয়া সবই করিতে পারেন, যদি তাহাদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তি হয় আশাপূর্ণ? ডেমু ট্রেনের ত্রুটি-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে যাহা উঠিয়া আসিয়াছে তাহাতে আরো অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। জন্ম দেয় গভীর বেদনারও। দেশ জাতি জনগণ গোল্লায় গেলেও ব্যক্তিগত সামান্য ও অসামান্য প্রাপ্তির দিকে যদি আমাদের কিছু কিছু কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আবদ্ধ থাকে, তবে এমন ঘটনা বারংবার ঘটিবে। তদন্ত কমিটি আসিবে, তাহারা তুলনামূলক যথাযথ বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিবে—কিন্তু আমরা যেই তিমিরে রহিয়াছি সেই তিমিরেই থাকিয়া যাইব। সুতরাং দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা কামনা ছাড়া আমাদের আর কিইবা বলিবার থাকিতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন