সমপ্রতি মেক্সিকোতে একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে, যা ইতিপূর্বে কখনই কোন দেশে ঘটেনি। এ অভিনব ঘটনার কুশীলব হলেন মেক্সিকোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর সালপার অধিবাসীরা। ভেরাক্রুজের রাজধানী সালপা। সমপ্রতি সেখানে দুর্নীতি ও অপরাধের মাত্রা সর্বত্র এতটাই বেড়ে গেছে যে, সেখানকার সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ। তারা দেখেছে তাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিজয়ী প্রার্থীরা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত, দেশ ও দশের জন্য তাদের কোন মমত্ববোধই জাগ্রত হয় না। তাদের সীমাহীন লোভের উদর পূর্তিতেই মহাব্যস্ত থাকে তারা। তাদের এই লুটে-পুটে খাওয়ার চরিত্রকে সালপার অধিবাসীরা ঘৃণার চোখে দেখছে, তারা এই স্বার্থসর্বস্ব লোভী রাজনীতিবিদদের ইঁদুর নামে আখ্যায়িত করেছে। ইঁদুর অত্যন্ত অনিষ্টকারী প্রাণী, ক্ষেতের শস্য, ঘরের শস্য সব খেয়ে সাফ করে ফেলে। তাই তারা এবার মেয়র পদে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতীকী নির্বাচনের মহড়া দিচ্ছে। ইঁদুর যতই ক্ষতিকর ও মারাত্মক হোক না কেন, বিড়ালের কাছে নস্যি, বিড়াল নামক প্রাণীটি ওদের কাছে জলজ্যান্ত আতংকের নাম। তাই সালপাবাসী বিড়ালকে মেয়র পদে দাঁড় করিয়েছে।
এ ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিড়ালটির নাম মরিস, এর বয়স ১০ মাস, এর মালিকের নাম সার্গেও চামরো। চামরো ভোটারদের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা যেন ব্যালট পেপারে বিড়ালটির নাম ও ছবি আঁকে। ইতিমধ্যে মরিসের পক্ষে জোর প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে মজার মজার শ্লোগান, যেমন-“ইঁদুরদের ভোট দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, এবার বিড়ালকে ভোট দেই।” অর্থাত্ ইঁদুরকে শায়েস্তা করার জন্য তারা বিড়ালকেই উপযুক্ত মনে করেছে। আর তাদের ধারণাও অমূলক নয়, একমাত্র বিড়ালই পারে ইঁদুরদের দফারফা করতে। বিড়াল ছাড়া আর যা দিয়ে ইঁদুরদের বারোটা বাজানো যায় তা হল মরণ-ফাঁদ। যেখানে বিষ-মাখানো খাবার দেয়া থাকে। খাবারের লোভে ফাঁদে ঢুকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে মরে ইঁদুরের বংশ। বিড়াল আর মরণ-ফাঁদের উদ্দেশ্য এক হলেও ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইঁদুর মারার কল বসালে শুধু ইঁদুরেরাই মারা পড়বে, তাদের চুরি করা খাদ্য সম্ভারের মজুদ হাতের মুঠোয় চলে আসবে। যারা ফাঁদে পড়েনি তারাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে পথ পাবে না। তাদের জমানো শস্যও বেহাত হয়ে যাবে। অর্থাত্ ক্ষয়ক্ষতির পরেও জনগণ অবশিষ্ট যা থাকে তা নিয়ে পরবর্তী সময়কালে শান্তিতে থাকতে পারে। কিন্তু ইঁদুর তাড়িয়ে কিংবা মেরে বিড়াল যদি গদিতে বসে, তাহলে জনভাগ্যের কোন হেরফের হবে কি? ইঁদুর চাল-ডাল-গম-রুটি ইত্যাদি নানা কিছু খায়, এমনকি গৃহস্তের কাপড়-চোপর কেটে কুটি কুটি করে ইজ্জতহানি করে। অপরদিকে বিড়াল চাল-ডাল-লবণ-সোডা খায় না ঠিকই, কিন্তু মাছ-মাংস-ডিম-দুধ-এর প্রতি ওদের ভয়ানক লোভ। যেখানেই উক্ত মূল্যবান খাদ্যসামগ্রী থাকুক না কেন, ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে ঠিক জায়গা মত পৌঁছে যায় কাছে-দূরের কেউ টের পাবার আগেই সাবাড় করে দেয় খাদ্যসামগ্রী। অনেক সময় খেতে বসা কারও থালা থেকেও ছোঁ মেরে নিয়ে যায় মাছ কিংবা মাংসের টুকরো। এদের যতই বকা-ঝকা ও লাঠি মারা হোক না কেন, কোন কিছুতেই এরা চৌর্যবৃত্তি থেকে সরে যায় না। ঘুরে ফিরে বার বার আসে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তাই মেক্সিকোবাসী রাজনীতিবিদদের উপর যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে যে প্রতীকী নির্বাচনে বিড়ালকে দাঁড় করিয়েছে, তাতে ইঁদুর হয়তো শায়েস্তা হবে, কিন্তু সালপাবাসীর ভাগ্যের কোন শুভ পরিবর্তন হবে না। বরং দুর্ভোগ আরও বাড়বে বই কমবে না। তাই বিশ্ব জুড়ে জনগণকে এবার এ দুটোরই বিকল্প পথের কথা ভাবতে হবে, যেখানে জনগণের অধিকার থাকবে সমুন্নত, অধিকার থাকবে সুরক্ষিত, তাদের মাথায় যেন কেউ কাঁঠাল ভেঙে খেতে না পারে, সেভাবেই সজাগ হয়ে উঠতে হবে জনগণকেই। খুঁজে বের করতে হবে যোগ্য নেতৃত্ব, তৈরি করতে হবে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সেভাবেই, যারা দেশকে ভালোবাসবে, মাকে যেমন ভালোবাসে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। চোর-বাটপারদের সমুচিত শাস্তি দিয়ে দেশকে করবে কলংক মুক্ত।
লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা
বাউফল কলেজ,
বাউফল,পটুয়াখালী।
[email protected]
