প্রখ্যাত রস-রচয়িতা পরশুরাম

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:০১
সাহিত্য হলো মানব জীবনের চালচিত্র । সেই চিত্র সাহিত্যিক বিভিন্নভাবে এঁকে থাকেন। কখনও সরাসরি ,কখনও আকারে-ইঙ্গিতে। রসিকতার ছলে বর্ণিত জীবনের ছবি যখন হয়ে ওঠে ব্যঙ্গাত্মক , একইসাথে রসঘন , তখন সেই সাহিত্যকে রস-রচনা বলা যেতে পারে। এ জাতীয় রচনায় থাকে বুদ্ধির চমক আর হাসির ঝিলিক। ‘পরশুরাম’ রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৬ মার্চ,১৮৮০ সালে । পিতা চন্দ্রশেখর বসু ছিলেন দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার। পাটনা কলেজ থেকে এফ. এ. , কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্সসহ বি.এ. এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে রসায়নে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯০৩-এ বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস কোম্পানিতে রাসায়নিকের পদে যোগদান করেন। পরের বছর তিনি পরিচালক পদে উন্নীত হন। ১৯৩২-এ তিনি স্বাস্থ্যহানির কারণে এ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বিজ্ঞানী রাজশেখর বসু ‘পরশুরাম’ নামে রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের গল্প রচনায় ব্রতী হন। তাঁর রচিত গল্প-গ্রন্থ : কজ্জলী, হনুমানের স্বপ্ন, গল্প-স্বল্প, কৃষ্ণকলি, গড্ডলিকা, আনন্দীবাঈ প্রভৃতি। এছাড়া তাঁর কিছু প্রবন্ধ এবং অনুবাদ রচনাও রয়েছে। গড্ডলিকা , শকুনী, কজ্জলী —এর গল্পগুলোর সমালোচনায় অনেকেরই অভিমত : সমৃদ্ধ ব্যঙ্গরসের সাহিত্য হিসেবে কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব-সাহিত্যেও সমাদৃত। তাঁর গল্পের বিষয় হাস্যরসের বটে, তাতে রয়েছে শ্লেষ মেশানো। চরিত্রানুযায়ী সংলাপ গল্পকে করেছে সজীব। যেমন: গ্রাম্য কবিরাজের মুখের ভাষার নমুনা—“ বাবুর কনথে আসা হচ্চে ? ” কিম্বা মুন্সী সাহেবের সংলাপ: “ তব্ ভি কিছু তো বোলেন। না-তাকতি, বুখার, পিল্লী,চেচক...” । গড্ডলিকার ‘চিকিত্সা-সঙ্কট’ গল্পে গল্পকার চমত্কারভাবে আমাদের কিছু তকমাধারী চিকিত্সকের চিকিত্সার নমুনা এবং আমাদের অজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। শ্লেষাত্মক উপস্থাপন গল্পগুলোকে সার্থক করেছে। চিকিত্সা-সঙ্কটের নন্দবাবু ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে‘কোঁচায় পা বাধিয়া নিচে পড়িয়া গেলেন।’ আঘাত না পেলেও হিতাকাঙ্ক্ষীদের উত্কণ্ঠার উচ্ছ্বাসে নন্দবাবুকে এ্যলোপ্যাথিক চিকিত্সক, হোমিও চিকিত্সক, কবিরাজ, হাকিম সাহেব শেষাবধি একজন ‘লেডি ডাক্তার ’ -এর স্মরণাপন্ন হতে হলো। একেকজন চিকিত্সকের উদ্ভট চিকিত্সা পদ্ধতির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে নন্দকে ‘লেডি ডাক্তার’ -এর পাণিগ্রহণ করতে হলো। আরেকটি মজার গল্প হলো — ‘ভুশ্লীর মাঠে’। কলহপটু স্ত্রীর রসনা-নিপীড়নে শিবু ভট্টাচার্য মা কালীর নিকট স্ত্রী নৃত্যকালীর মৃত্যু কামনা করে‘জোড়া পাঁঠার নৈবিদ্যি’ মানত করলো। মা-কালী উল্টো বুঝে শিবুকেই পরপারে পাঠিয়ে দিলেন। শিবু ভুত হয়ে এ-গাছ ও-গাছ করে শেষে ভুশ্লীর মাঠে বেল গাছে ব্রহ্মদৈত্য হয়ে বাস করতে থাকলো। দেহহীন আত্মা হলে কী হবে! ওদেরও মনটা সঙ্গী খোঁজে। গল্পে শিবুর স্ত্রীও ক’দিনের মাথায় ইহধাম ছেড়ে ভুত-পাড়ায় চলে আসে। এখানেই দেখা হয়ে যায় শিবুর তিন জন্মের তিন স্ত্রী এবং নৃত্যকালীর তিন জন্মের তিন স্বামীর সাথে। ব্যস, শুরু হলো অধিকার আদায়ের যুদ্ধ। তাদের কলহে যোগ দিয়েছে —ভুত, প্রেত, পিশাচ প্রভৃতি উপদেবতা; স্পুক,পিক্সি,নোম প্রভৃতি বিলাতি ভুত;জিন, জান, আফ্রিদ,মারীদ প্রভৃতি কাবুলি ভুত ; চিং, চ্যাং,ফ্যাচাং — চীনে ভুত। ভুতের চরিত্রের মাধ্যমে মানবচারিত্র্যই উপস্থাপিত হয়েছে। ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মননশীল তীক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি তাঁর humour সৃষ্টির প্রধান সম্পদ।’ বাংলা সাহিত্যে রস রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মের জন্য তিনি ‘রবীন্দ্র-পুরস্কার’; ‘সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার’ এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি. লিট.ডিগ্রি পেয়েছেন। ২৭ এপ্রিল ১৯৬০ - এ প্রখ্যাত এই রস-রচয়িতার জীবনাবসান ঘটে।