প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৩, ২২:২১
দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ লইয়া সর্বশ্রেণীর মানুষ যখন নানান দুর্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কালাতিপাত করিতেছে ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও উক্তি জনমনের শঙ্কা-আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করিয়া তুলিতেছে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর না তুলিতে বলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসিলে এইবার তাহাকে এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হইতে পারে। তিনি আরও বলিয়াছেন যে, ঐ সরকার আসিলে তাহারা কেয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকিতে সচেষ্ট থাকিবে। অবিশ্যি প্রধানমন্ত্রী এই ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান সংবিধানের বিধানকেই সমুন্নত রাখিবার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন এবং এই ব্যাপারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এই কথা ঠিক যে, দেশের সবচাইতে ক্ষমতাধর বা শক্তিধর ব্যক্তি যখন আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তখন উহাকে খাটো করিয়া দেখার কোন অবকাশ নাই নিশ্চয়ই! প্রধানমন্ত্রীর নিকট এমন কোন তথ্য হয়তো আছে, যাহার ভিত্তিতে তিনি বার বার এই সতর্কবার্তা জাতির নিকট বক্তব্য আকারে পৌঁছাইয়া দিতেছেন। দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই তথ্যের নাগাল পাওয়া অত্যন্ত দুরূহই শুধু নহে, অসম্ভবও বটে। তবুও, প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত এই জাতীয় শঙ্কা বা আশঙ্কার কথায় দেশবাসী বিচলিত বোধ করে বৈকী! কিন্তু ইহাও সত্য যে, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার, যাহার অধীনেই নির্বাচন হউক না কেন, এই সংবিধান সংশোধন করিতেই হইবে। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবির কারণে দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যুক্তি খানিকটা গ্রাহ্যতার মধ্যে আসিলেও বিরোধী দলের পক্ষ হইতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি এখনও প্রবল হইয়া রহিয়াছে। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে যে দূরত্ব উহা সহসা কাটিয়া যাইবে এমনটা মনে করার সঙ্গত কোন কারণ আছে বলিয়া মনে হইতেছে না। উহাতে সংকট গভীরতর হইবার পাশাপাশি দেশে সংঘাত, সংক্ষুব্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও তীব্রতর হইতেছে। এমতাবস্থায়, দেশের মানুষ কোন দিকে যাইবে, কী করিবে উহা ঠাওর করাই মুশকিল। সত্য বটে, সম্ভাব্য ঘটনা সম্পর্কে এইরূপ আগাম সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া বা জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এই বিষয়ে অবহিত রাখিয়া তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে স্বীয় দায়িত্ব পালন করিয়া যাইতেছেন। ক্ষমতারোহণের কিছুকাল পর হইতেই প্রধানমন্ত্রী এবং তাহার দলের বেশকিছু শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রীর জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ করিয়াছেন। এক্ষণে আবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি পরিত্যাগ না করিলে তিনি এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর কারাবরণের যে আশঙ্কা ব্যক্ত করিয়াছেন উহার অন্তর্নিহিত অর্থ কি? ইহার মাধ্যমে তিনি কি বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু প্রকারান্তরে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি ডাকিয়া আনিবে এবং কেবল তাহাদের দুই নেত্রীকেই উহার মাশুল দিতে হইবে? এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট নহে; কেননা, শুধু দুই নেত্রীর জন্যই দুর্দিন আসিবে নাকি গোটা দেশের জন্যও উহা দুর্যোগময় হইয়া উঠিবে সে বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পরিষ্কার নহে। সন্দেহ নাই যে, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে আগামী দিনগুলির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন বা জাতিকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। তবে বিষয়টি যে কেবল তাহাদের দুই নেত্রীর সমস্যা নহে বরং গোটা দেশের জন্যই সমস্যা এবং এমন ক্ষেত্রে দেশবাসীর করণীয়ই বা কি। আর তেমন ক্ষেত্রে একটি সঠিক অবস্থান গ্রহণের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাইবার দাবি রাখে বৈকী! আদালতের মাধ্যমে সংবিধানে যে পরিবর্তন আসিয়াছে তাহা সম্পর্কেও কাহারও যে দ্বিমত নাই উহাও সঠিক নহে। আবার ইহাও সত্য যে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাহাদের উপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়-দায়িত্বের সীমা লঙ্ঘন করিয়া এমন অনেক কাজ করিয়া গিয়াছেন যাহার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল সম্পর্কেও রাজনীতিবিদ ও দেশের মানুষের মধ্যে আশঙ্কা রহিয়াছে। আগামী নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিত করিতে ছোট-খাটো কিছু নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং যে করা হইতেছে না এমন কথা জোর দিয়া বলা যাইবে না। স্মর্তব্য যে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে বঞ্চিত করিয়া বিগত তত্ত্বাবধায়ক আমলে তেলা মাথায় তৈল দেওয়ার নীতি অবলম্বন-পূর্বক ঢাকা শহরের আসন বৃদ্ধি করা হইয়াছিল। বর্তমান সরকার কিন্তু অদ্যাবধি উহার কোন পরিবর্তন করেন নাই। যাহারা রাজনীতি করেন না বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন না তাহাদের মতে এই ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন না করিলে দেশের অনুন্নত এলাকাগুলি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হইবার আশঙ্কা থাকিয়া যাইবে। প্রধানমন্ত্রী যে সতর্কবাণী বা সাবধানবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন সেই আলোকে জাতির এই মুহূর্তে করণীয় কর্তব্য কি সেই বিষয়ে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যও সকলে প্রত্যাশা করে নিশ্চয়ই। সংকট উত্তরণে সততা ও নিষ্ঠার সহিত সংশ্লিষ্ট সকলের ভূমিকা পালন করাটাই কর্তব্য। আর সেইজন্য প্রয়োজন সঠিক দিক-নির্দেশনা। জাতি উহার অপেক্ষাতেই আছে। নির্বাচন কমিশন দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান লইয়া রাজনৈতিক দলসমূহের আস্থা অর্জন করিতে পারিলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন