পানি ব্যতীত মাছ যেইরূপ নিষ্প্রাণ, ফুটবল ছাড়া ব্রাজিলও তেমনি ম্রিয়মাণ এক দেশ। সেই ব্রাজিলের মানুষই কিনা ফুঁসিয়া উঠিল ফুটবল কনফেডারেশন কাপ চলিবার সময়েই। এবং তাহার কারণও আরেকটি ফুটবল কাপ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের অবকাঠামো নির্মাণে স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল ব্যয় করিতেছে প্রায় পনেরোশো কোটি ডলার। তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে চলমান কনফেডারেশন কাপের বিপুল খরচ। ইহাছাড়াও ২০১৬ সালের অলিম্পিকের প্রস্তুতি-খরচ রহিয়াছে। অথচ দেশবাসীর উন্নয়ন হইয়া উঠিয়াছে প্রহসন-তুল্য। মূল্যবৃদ্ধি লাগামছাড়া, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের হাল করুণ, দুর্নীতিও প্রশাসনের সব স্তরেই জাঁকিয়া বসিয়াছে। এই সকল বিষয়ে নাকি একবিন্দুও মনোযোগ নাই নূতন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দিলমা রাউসেফের। তাহাতে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে, অর্থনীতি ও যাপিত জীবনের দুর্যোগ-দুর্ভোগ হইতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় অবশেষে পথে নামিয়াছে ব্রাজিলের জনগণ।
বিক্ষোভের শুরুটা ছিল আকস্মিক। এই দাবানলের স্ফুলিঙ্গের সূত্রপাত হইয়াছিল পক্ষকাল পূর্বে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধি এইখানে নিত্যঘটনা। ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান শহর রিও ডি জেনেইরোতে সেই ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদেই কিছু লোক জড়ো হইয়াছিলেন প্রতিবাদ জানাইতে। সেই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ অত:পর ক্রমশ দাবানলের রূপ পরিগ্রহ করে। কনফেডারেশন কাপের জন্য বিশ্বের চোখ এই ক্ষণে ব্রাজিলের দিকেই। অতএব ইহাই তো সেরা সময় জনগণের সংক্ষোভ প্রকাশের।
আশ্চর্য এই যে, এই বত্সর মার্চেই দেশের ৭৯ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত হইয়াছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট দিলমা রাউসেফ। তাহার এই বিপুল ম্যান্ডেটের নেপথ্য কারণ ছিল দেশের অর্থনীতি। প্রেসিডেন্ট ডিলমার জন্য ইহা পরিহাসের বটে, সেই অর্থনীতির কারণেই আজ লাখ লাখ জনগণ দিনের পর দিন পথে নামিয়াছে। ব্রাজিলে বাণিজ্য খাতে উদ্বৃত্ত নাই, প্রাথমিক রাজকোষেও উদ্বৃত্তের পরিমাণ নিম্নমুখী। মন্দায় মূল্যস্ফীতিও বাড়িয়াছে পাগলা ঘোড়ার মতো। এই দুর্বিপাকের ভিতরে কিনা পনেরোশো কোটি ডলার বরাদ্দ হইয়াছে আগামী বত্সরের বিশ্বকাপ ফুটবল আবকাঠামো নির্মাণে? পূর্বের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে খরচে পরিকাঠামো তৈরি হইয়াছিল, ব্রাজিলে তাহার নাকি তিন গুণ টাকা বরাদ্দ করা হইয়াছে! জনগণ মনে করিতেছে, ইহার উদ্দেশ্য অর্থলুটপাট। অথচ এই পরিকাঠামো নির্মাণের অর্থ জোগান দিতেছে জনগণই। তাহাদের উপর করের বোঝা বাড়িয়াছে তিন-চার গুণ। অতএব কনফেডারেশন কাপে ব্রাজিলের মুকুটে একের পর এক জয়ের পালক যুক্ত হইলেও তাহাতে জনতার বিক্ষোভের আগুন স্তিমিত হয় নাই।
এই অবস্থায় আমরা দেখিতেছি ব্রাজিলের সাবেক ও বর্তমান তারকা ফুটবলাররা দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে। পেলে ও রোনালদো রহিয়াছেন সরকারের পার্শ্বেই। কিন্তু সাবেক বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবল তারকা রোমারিও রহিয়াছেন বিক্ষোভকারীদের দলে। সম্ভবত রাজনীতিতে নাম লেখাইয়াছেন বলিয়াই তিনি জনগণের দর্পণে নিজেকে দেখিতে সমর্থ হইতেছেন। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফিফা ব্রাজিলকে কোনো আয়কর প্রদান করিবে না, অথচ তাহাদের আয় হইবে ন্যূনতম ৪ কোটি ডলার। ফুটবলের নামে জনগণের অর্থ লইয়া এমন ছিনিমিনি খেলার প্রতিবাদ করিয়াছেন ব্রাজিলের উঠতি ফুটবল তারকা নেইমারও।
দুই দশক পূর্বে আমরা ব্রাজিলের আরো ভয়াবহ রূপ দেখিয়াছিলাম। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ফের্নান্দো কোলোর সময় দুর্নীতির শিখরে চলিয়া গিয়াছিল ব্রাজিল। তীব্র আর্থিক অনটন, সামাজিক দুরবস্থার চোরা স্রোতের ভিতর দিয়া ঘূর্ণিপাক খাইতে খাইতে সেইবারও ফুঁসিয়া উঠিয়াছিল ব্রাজিলের জনগণ। প্রবল ক্ষোভে আন্দোলনকারীরা ক্ষমতার অলিন্দ হইতে ফুটপাতে টানিয়া নামাইয়াছিল ফের্নান্দোকে। বিশ বত্সর পরে ব্রাজিল কি সেই পথেই হাঁটিতেছে?
ফুটবল-অন্তপ্রাণ জাতিকেও যে ফুটবলের মায়াজালে আটকাইয়া নির্ভাবনায় দুর্নীতি করা যায় না, ব্রাজিলের জনগণ সেই কঠিন সত্যের অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়াছে তাহাদের শাসকের দিকে।
