একশ্রেণির উদ্ধত-উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীর সীমাহীন অনাচারে ছাত্র-যুব রাজনীতির ঐতিহ্যের জমিন আজ ক্ষত-বিক্ষত। ইহারা ক্রমাগত বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া চলিয়াছে গণতন্ত্র ও মানবতার। যৌবনের অপরিমেয় শক্তি ও সাহসকে ইহারা বিষময় করিয়া তুলিয়াছে। গত সোমবার চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বন্দুকযুদ্ধের বলি হইয়াছে আরমান নামের এক শিশু এবং যুবক সুমন পালিত। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৯৬ লাখ টাকার দরপত্র জমা দিতে গিয়া দুই পক্ষ জড়াইয়া পড়ে সশস্ত্র সংঘাতে। সেই সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হইয়া মারা যায় দুইজন। ঘটনার পর মামলা হইয়াছে। পুলিশ গ্রেফতার করিয়াছে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিকে। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক অথবা বলা যায় এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে। উল্লেখ্য, এই মামলায় পুলিশ ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করিয়াছে।
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে গত সাড়ে চার বত্সর ধরিয়া দেশ জুড়িয়া চলিয়া আসিতেছে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি এবং রক্তপাত। এই সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ নামধারীদের হামলায়, সংঘাতে-সংঘর্ষে নিহত হইয়াছেন কমপক্ষে ১৫ জন। আহত হইয়াছেন দেড় সহস্রাধিক। যেখানেই টেন্ডার, সেখানেই যেন ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ। অর্থ-সম্পদের লোভে তাহাদের কাহারও কাহারও জিহ্বা নরকের লকলকে আগুনের মত যেনবা সর্বগ্রাসী হইয়া উঠিয়াছে। শিক্ষাঙ্গনে, সরকারি দফতরের আঙ্গিনায়, নদীবক্ষে, রাজপথে সবখানে ইহারা সহিংস ও সক্রিয়। পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হয়, এই বেপথুরা বাধা-বন্ধনহীন। ইহাদের নিরস্ত্র করিবার যেন কেহ নাই। দলের নেতৃত্ব কিংবা দেশের শাসন-প্রশাসন যেনবা ইহাদের সম্মুখে অসহায়। ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যের দাবি, দলীয় আদর্শের বাণী ইহাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়া শোনাইছে ব্যর্থ পরিহাস।
আজ যাহা করা হইতেছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে, অতীতে একই রকম করিয়াছে ছাত্রদল ও যুবদলের একশ্রেণির নেতা-কর্মী। বিএনপি কিংবা চারদলীয় জোট যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তাহাদের অঙ্গ সংগঠনের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর অনাচার সামাল দিতে পারে নাই দলের নেতৃত্ব। ইহার সাদামাটা অর্থ এই যে, যখন যে দল বা জোট ক্ষমতায় যায় তখন সেই দলের নেতা-কর্মীরা বেপরোয়া হইয়া উঠে। দেশের বিদ্যমান আইন-কানুন, বিধি-বিধান কোনো কিছুই তাহাদের মানিবার প্রয়োজন হয় না। ক্ষমতাজাত ঔদ্ধত্যের নিকট প্রশাসনও যেন হইয়া যায় মৌন নির্বিকার। সে দেখে, শোনে; কিন্তু বড় বেশি কুণ্ঠিত আইনের হাত প্রসারিত করিতে। কখনও কখনও খুনি-মাস্তান, সন্ত্রাসী নেতা-কর্মীদের সহায়তাও দেওয়া হইয়া থাকে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
কিন্তু এমন তো হইবার কথা নহে। আইন প্রয়োগ করিবার দায়িত্ব যাহাদের তাহারা কেন, কেমন করিয়া নির্বিকার থাকেন—এই প্রশ্নের জবাবও দেশবাসীর অজানা নহে। সবখানে, সবকিছুতেই দলীয়করণের প্রবণতা সমাজে আজ এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়াছে। সর্বত্র তাহারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়া চলিয়াছে। ছাত্র কিংবা যুব সংগঠনের পথভ্রান্ত নেতা-কর্মীরা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উপজাত বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। আমাদের ছাত্র রাজনীতির সোনালী অতীত আজ অপ্রাসঙ্গিক হইয়া গিয়াছে। স্বাধিকার হইতে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে, জাতির প্রতিটি সংকট-সন্ধিকালে ছাত্র-যুব-জনতা পালন করিয়াছেন সাহসী সুন্দর ভূমিকা। গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের অধিকারের সংগ্রামে তাহারা ছিলেন অগ্রসেনানী। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেই সোনালী অতীতে সবচাইতে গৌরবময় ভূমিকা পালন করিয়াছে যে ছাত্র সংগঠনটি, সেইটি ছাত্রলীগ। ষাটের দশকের ছাত্রনেতা ও কর্মীরা এখনও যখন স্মৃতি রোমন্থন করেন তখন গর্বে তাহাদের বুক ফুলিয়া উঠে। সেই উত্তরাধিকার আজ কোথায়! আক্ষেপ, ষাটের সেই অহংকার আজ পরিত্যক্ত, ধূলি-ধূসরিত।
এই জীর্ণ-বিদীর্ণ উত্তরাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো পথ কী আজ আর খোলা নাই! হয়তো আছে, হয়তো নাই। কিন্তু সীমা লঙ্ঘনকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। সবকিছুর সীমা আছে। সীমা ছাড়াইয়া গেলে সময় কাহাকেও ছাড়িয়া দেয় না। ইহাও এক অলঙ্ঘনীয় সত্য।
