ব্যবসা এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা কাঠামোর চুক্তি বা ট্রেড এন্ড ইনভেস্টমেন্ট কোপারেশান ফোরাম এগ্রিমেন্ট (টিকফা) চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পাদন হলে কোনদিকের পাল্লা ভারি হবে সে বিষয়টি নিয়ে এখন দেশে রীতিমত বাহাস হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিয়ে আসছিল। টিকফার পূর্বে অবশ্য তারা টিফার জন্য বারংবার অনুরোধ করেছে। টিকফা চুক্তি কেবল নয়, যে কোন আঞ্চলিক কিংবা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পক্ষে বিপক্ষে নানা ধরনের বক্তব্য থাকে, আবার সুবিধা-অসুবিধাও থাকে। তবে পক্ষে-বিপক্ষের মধ্যে পাল্লা যেদিকে ভারি হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়নের অংশীদার এবং রপ্তানির জন্যে একটি বড় বাজার ছিল। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর হলে বছরে অন্তত একবার ফোরামের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাবে। আসলে টিকফা চুক্তি এক ধরনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ করে দেবে কিন্তু এটি যে অবশ্যই পালন করতে হবে সে ব্যাপারে কোন ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই।
এদিকে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যে মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সুযোগ পাচ্ছে তা অবশ্য রহিত হবে। এটি অবশ্য স্বল্পকালীন সমস্যা। বরং এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে এবং বাংলাদেশ নিজেরাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উত্পাদন করার পাশাপাশি বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার আরেকটু বৃদ্ধির মাধ্যমে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। এ জন্য কেবল সরকার একা নয় বরং বেসরকারি খাতকে আরো সক্রিয় এবং বেগবান হতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে যারা কথা বলছেন, আসলে বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যাতে স্লিক রোড স্থাপন করা হলে বাংলাদেশ এশিয়া অঞ্চলে কানেকটিং হাব হিসাবে কাজ করতে পারে।
ইউএস চেম্বার অব কমার্সের আন্তর্জাতিক বিভাগ যে সুপারিশমালা দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্র করেছে, তার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের ফোরাম গঠনের মাধ্যমে দু’পক্ষের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের সতর্কতার সাথে কাজ করা; টিকফা চুক্তির নেগোসিয়েশানের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনার সুযোগ পাবে; অঞ্চলগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন পদক্ষেপ এবং টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে একটি বেঞ্চ মার্ক স্থাপিত হবে যা বাংলাদেশকে উন্নততর সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। আসলে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর হলে প্রাথমিকভাবে কিছুটা সমস্যার উদ্রেক করতে পারে। তবে এ চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা তখনই উজ্জ্বল হবে যখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা করতে সমর্থ হবে। এবং চুক্তিগুলোর ধারা যেগুলো বাংলাদেশের পক্ষে আছে সেগুলোকে কাজে লাগাতে সমর্থ হবে।
আইএলও ঘোষণা ১৯৯৮ অনুসারে রাতারাতি শ্রমিকদের অধিকার প্রদানের যে বিধান রয়েছে তা আসলে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সমস্যা। বাংলাদেশে যারা উদ্যোক্তা শ্রেণী রয়েছেন তারা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় জেনারেশানের। অন্যদিকে যে সমস্ত শ্রমিক নেতৃবৃন্দ রয়েছেন তারা প্রথম বা দ্বিতীয় জেনারেশানের। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে যথেষ্ট মাত্রায় ভুলত্রুটি রয়েছে। এদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের যত না মাথা ব্যথা রয়েছে তার চেয়ে ব্যক্তিগত পকেট ভারির তাগিদ তাদের কাছ অনেক বেশি। সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখানে যে ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, তার সীমা-পরিসীমা নেই। তবে এদেশে যে হারে আইন না মেনে, বিল্ডিং কোড পরিবর্তন করা হচ্ছে; কিংবা ইচ্ছেমত নকশার পরিবর্তন করা হচ্ছে তাতে কোন ধরনের Men made disaster বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যে কোন সময়ে আবার ঘটতে পারে। এ জন্য কেবল সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে বরং আমাদের জাতীয় বিবেক জাগ্রত হওয়া উচিত এবং অতিরিক্ত মাত্রার লোভ সম্বরণ করা দরকার। এদিকে শ্রমিকদের জন্য আবাসস্থল ও কর্মস্থলের মান উন্নয়নের একক দায়িত্ব সরকারের নয় বরং উদ্যোক্তা ও মালিকদের উভয় পক্ষ থেকে নিতে হবে। আমাদের দেশে ইদানীং কিছু বৃহত্ পোশাক কারখানার মালিক এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও অধিকাংশই কিন্তু এ ব্যাপারে নির্বাক। বিদেশি কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও কোরিয়ান ইয়াং ওয়ান গ্রুপ সুন্দরভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। এটি কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির আওতায় পড়ে। আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো বিশ্ব বাজারে পোশাক শিল্প খাতকে দ্বিতীয় স্থানে রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে, যা ২০২১ পর্যন্ত বলবত্ থাকার কথা। তবে টিকফা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এটি খর্ব হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি আমরা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করতে পারি তবে অবশ্যই লাভবান হবো এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকব। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভের সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশ একটি অসম্প্রদায়িক দেশ। কিন্তু একটি শ্রেণী এদেশে জঙ্গীবাদের সিল মেরে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশসমূহ এ সমস্ত ব্যাপারে ফলাও করে প্রচার করে থাকে এবং একদল পরগাছা আছে যারা বিভিন্ন ব্যাপারে দেশের বদনাম বিদেশে করে সুনাম হানি করে থাকে। সর্বগ্রাসী দুর্নীতি দীর্ঘদিনের ফসল। এক কথায় বলা চলে তৃণমূল থেকে উপরের দিকে যে দুর্নীতির ধারা বহমান এটি কোন সরকার পক্ষে একা সামলানো সম্ভব নয়। বিচিত্র এ দেশ সেলুকাস। দুর্নীতিবাজরা অন্যদের দুর্নীতির কথা বলে। তবে এ চুক্তিতে দুর্নীতি হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। বর্তমানে দুর্নীতি না করেও কেউ কেউ অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন যেমন ড. মসিউর রহমানকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগের মত সক্রিয় থাকতে দেখা যাচ্ছে না। বরং বর্তমানে অর্থমন্ত্রী এমনসব বক্তব্য মাঝে মধ্যে দেন যা সরকারের জন্যে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে, জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি ছড়ায়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে সরকারিভাবে পঞ্চাশ হাজারের বেশি জুনিয়র ম্যানেজমেন্ট লেভেলে ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলংকান, কোরিয়ান ও ফিলিপিনোরা কাজ করছে এবং বছরে ৪.৬৩ বিলিয়ন টাকা পারিশ্রমিক হিসাবে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ বিদেশিদের পরিমাণ বেসরকারিভাবে অনেক বেশি এবং তারাও টাকা আরো তিনগুণের বেশি নিচ্ছে। অথচ এদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি বেশি হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকগুলোতেও এখন ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। তাহলে Human capital বা মানবিক মূলধন কিভাবে তৈরি হবে। বর্তমান সরকার অনেকগুলো ভাল কাজের মধ্যে বছরের শুরুতেই প্রাইমারি, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বই দেয়ার বন্দোবস্ত করেছে। কিন্তু যারা শিক্ষক, বিশেষত প্রাইমারি স্কুলে, তারা ঠিকমত পড়ান না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দেখার কেউ নেই। গোড়ায় গলদ থাকলে উপরের পর্যায়ে যতই পালিশ করা হয়, লাভ হয় না। জিডিপির ২.২% শিক্ষা খাতে দেয়া হলেও ত্রুটির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হয় না। আক্ষেপ করার কিছু নেই। প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় ভিসামুক্ত পৃথিবীতে যোগ্যরাই বেঁচে থাকবেন। আসলে মানব সম্পদ উন্নয়ন করতে হলে গোড়া থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু করতে হবে। বর্তমান সরকার একটি প্রশংসনীয় শিক্ষা নীতি দিলেও তার বাস্তবায়ন কিন্তু খুব ধীরে হচ্ছে। দক্ষ শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষা দেয়ার প্রতি সদিচ্ছা থাকা দরকার। চার্লস ডারউইন যথাযথই বলেছিলেন যে, যোগ্যরাই কেবল টিকে থাকবে। বিশ্বায়নের এ যুগে এটি আরো বেশি করে প্রতিভাত হয়।
জিএসপি ফ্যাসিলিটিজের পূর্ণ সদ্ব্যবহার কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ী মহল কখনো করতে পারেননি। আসলে শুল্কমুক্ত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকারের জন্য তাদের সাথে আরো আলোচনায় অংশ নেয়া এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। রপ্তানি ইচ্ছে করলেই যে বাড়বে তা কিন্তু ঠিক নয়। তারপরও আশা করবো যে, বাংলাদেশের সাথে জিএসপি ফ্যাসিলিটিজের যে সমস্যা রয়েছে তা দূর হবে। নচেত্ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রপ্তানিমুখী পণ্যের বহুধাবিভক্তকরণ করা দরকার। আইটি খাতকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খুঁটিনাটি এবং আইন-কানুন সম্পর্কে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও নীতি-নির্ধারকদের ওয়াকিবহাল হতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে একটি অবস্থানগত বিরোধ রয়েছে সেটি বাংলাদেশের প্রচলিত বিধান মোতাবেক সমাধান হওয়া বাঞ্ছনীয়। গ্রামীণের নাম ব্যবহার করে যে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে তা রাষ্ট্রের নিয়ম অনুসারে প্রচলিত হওয়া দরকার। গ্রামীণ ব্যাংক পৃথক সত্তা হিসাবে গ্রামের নারীদের উন্নয়নে কাজ করা উচিত। ড. মুহম্মদ ইউনূস সামাজিক ব্যবসার ক্ষেত্র হিসাবে নতুন করে ভিন্ন ধরনের ব্যবসা কাঠামো নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারেন- সরকারি উদ্যোগের কোন সাহায্য-সহযোগিতা না নিয়ে। যত বড় মাপের মানুষই হোন, প্রথমত দেশের স্বার্থ বিবেচনায় আনা দরকার। একই সাথে দেশের প্রচলিত আইন সংস্কার করে যাতে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা যায়, সেটির জন্য কর্তৃপক্ষ কাজ করে চলেছে।
টিকফা চুক্তি হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা আছে বলা হচ্ছে, তা ‘সেন্টার ফর ব্র্যাক থ্রো থিংকিং ইন বাংলাদেশ’ থেকে পরিচালিত সমীক্ষার মাধ্যমে তেমন সুফল বয়ে আনবে বলে উপাত্ত পর্যালোচনা করে পাওয়া যায়নি। এজন্য অবশ্য দেশের অবকাঠামো, বিনিয়োগ সহজীকরণ পদ্ধতির জটিলতা ও ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার দায়ী। তবে সার্ভিস খাতে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আসতে পারে- এক্ষেত্রে দুর্বল ব্যবসায়ীরা হয়তো প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকারের বিষয়টিও স্বার্থসংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ আহরণ এবং তা দেশের স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়টি চলে আসে। তবে এ চুক্তির ফলে কারিগরি সহযোগিতা বাড়তে পারে এবং কারিগরি উপায় ও ফসল সহজে করায়ত্তের বিষয়টি সম্মুখে এসে পড়ে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে তা কিন্তু নয়। বরং আমাদের দেশি শিল্পপতি, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা কতটা দক্ষতার সাথে Industrial management বা শিল্প ব্যবস্থাপনায় পারঙ্গম তার উপর নির্ভর করে থাকে কর্ম সংস্থানের বিষয়টি। দেশে সত্ ও দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণী গঠিত হওয়া দরকার। অতিরিক্ত মুনাফা মুখী উদ্যোক্তা শ্রেণীর বদলে নর্মাল প্রফিট গ্রহণে ইচ্ছুক উদ্যোক্তা শ্রেণী দরকার। আসলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যথাসময়ে শ্রমিকের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ ও কর্ম উপযোগী পরিবেশের দরকার। একই সাথে দরকার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য, লোকবল এবং যথাযথ Supply chain management.
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্বের এক-পঞ্চামাংশ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি গত এক দশকে গড়ে ৬.৫% হচ্ছে। দারিদ্র্য বর্তমান ১.৭% হারে প্রতি বছর কমায় দারিদ্র্য বিমোচনে খুব ভাল সুফল পেয়েছে। তবে গ্রামীণ অবকাঠামো বিনির্মাণের সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যতখানি তত্পর ততখানি তত্পরতা প্রয়োজন শহরাঞ্চলে গড়ে উঠা বস্তি এলাকা। এগুলো এখন মাদক-সন্ত্রাসী ব্যবসার আখড়াতে পরিণত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারত একটি সুষম বণ্টন ব্যবস্থার আলোকে সম আয় পরিশোধযোগ্য ব্যবস্থাপনা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ মধ্যে বেসরকারি যোগাযোগ এ চুক্তির ফলে বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অবশ্য Negotiation skill বা সমঝোতামূলক দক্ষতা বাংলাদেশি বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে বেশি থাকতে হবে। একই সাথে WTO এর বিভিন্ন ধারা-উপধারা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা সংক্রান্ত আইন-কানুন, অর্থায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ব্যবসায়ী মহলের জন্য দরকার। দেশের প্রচলিত আইন-কানুন সহজ করার পাশাপাশি অবশ্যই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার হ্রাস করা দরকার। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে উভয় পক্ষের জন্যেই যাতে win-win situation হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। এ জন্য চুক্তি সম্পাদনের পরও বিভিন্ন সময়ে আলাপ-আলোচনায় আমাদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের যোগ্য ও দক্ষ লোক প্রতিনিধি দলে প্রেরণের পাশাপাশি হোমওয়ার্ক করে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। চুক্তির ধারায় অবশ্য এটি যে কোন সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যদিয়ে বাতিলের কথা উল্লেখ আছে। এই নিয়মগুলো সুস্পষ্টভাবে বলা থাকায় অযথা দেশের স্বার্থ হানির জুজুর ভয় দেখানো উচিত নয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ২৩% মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। এক দশক আগে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪০% আসত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এখন সেটি ২২%-এ দাঁড়িয়েছে। আশা করা যায় চুক্তি হওয়ার পর বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আরো বেশি করে পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন- যার জন্য অবশ্য আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশি নতুন উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। উদ্যোক্তা শ্রেণীর মধ্যে যারা বিশ্বমানের তারা কিন্তু নিজস্ব উদ্যোগেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফলতা অর্জন করতে পারছে। সামরিক ক্ষেত্রের শর্তাবলী তেমন সমস্যা নয়। এজন্য অযথা ভয় না পাওয়াই ভাল।
এদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু এবং উন্নয়নের অংশীদার হিসাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের দেশে টেকনোলজি ট্রান্সফার আরো বেগবান হবে বলে বিশ্বাস করি। এদেশের জনসংখ্যার মান উন্নয়নে এবং দক্ষ শ্রমশক্তিতে পরিণত করার মাধ্যমে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব। যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখনো ২.৩% প্রতি বছর এবং সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদন ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে প্রায় ৬.৪% সেখানে এ ধরনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সফল বাস্তবায়নই পারে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে। যারা এ চুক্তির বিরোধিতা করছেন, তারা আসলে না বুঝেই করেছেন। সর্বশেষ বলব, মহামতি আলেকজান্ডার-এর কাছে পরাস্ত হয়ে রাজা পুরু যে কথা বলেছিলেন, “রাজার কাছ থেকে রাজার মতই ব্যবহার চাই,” আমরাও আশা করব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার উন্মুক্ত হবে বাংলাদেশিদের জন্য। তাদের কাছ থেকে আরো উন্নত কারিগরি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুযোগ-সুবিধা পাব বলে আশা করছি এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তায় নতুন দিকনির্দেশনার সৃষ্টি হবে।
লেখক : উপাচার্য, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান,
সেন্টার ফর ব্র্যাক থ্রো থিংকিং ইন বাংলাদেশ
