মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে কিছু নিবেদন করাই আজকের লেখাটির উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধু কন্যা এই নিয়ে দুই দফায় প্রায় দশ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও হয়ত অনেক কিছুই জানা অজানা রয়ে গেছে। আর সেই জানা অজানা নিয়েই কিছু কথা।
প্রথম কথা: গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যাদের হাতে মনোনয়নপত্র তুলে দিয়েছিলেন তা সঠিক ছিল কিনা? উল্লেখ্য, সে সময় প্রতিটি প্রার্থীকে তৃণমূলে ভোট করে নির্বাচনে আসতে হয়েছিল। প্রতিটি সংসদীয় আসনের তৃণমূল নেতারা ভোট দিয়ে কেন্দ্রে ৫টি নাম পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্য হতে একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, এ পদ্ধতিতে সঠিক প্রার্থী বাছাই হয়েছিল কিনা? কারণ আমরা জানি যে, গ্রামগঞ্জের তৃণমূল নেতাদের উপর অনেক গুণ্ডা- বদমায়েশ টাইপের নেতা ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন বা টাকা খরচ করে ভোট আদায় করেছিলেন। সুতরাং সে সময় তৃণমূল ভোটে যে সব ভালো ভালো প্রার্থী জিতে এসেছিলেন সে কথাটি ঠিক নয়। আর সেই সুযোগে অনেকে ভোটের জোয়ারে জাতীয় নির্বাচনে জিতে এসে ক্ষমতাকে জাদুর কাঠি হিসাবে ব্যবহার করে এই সাড়ে চার বছরে দলের প্রভূত ক্ষতিসাধন করেছেন। এসব রাজনীতি করে খাওয়া লোকেরা জোর-জবরদস্তি করে সে সময় তৃণমূল ভোটে জিতে না এলে দলের অপেক্ষাকৃত ভালো নেতারা মনোনয়ন পেতেন এবং তাতে করে এই মুহূর্তে দল এতোটা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।
দ্বিতীয় কথা: নির্বাচনের পর যাদের হাতে ক্ষমতা বিলিবণ্টন করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান, প্রশাসক, পরিচালক ইত্যাদি পদে পদায়ন করা হলো সেসব সঠিক ছিল কিনা সে কথাও বোধ হয় ভেবে দেখার সময় হয়েছে। এক্ষেত্রে যদি বলা হয়, আবুল হোসেন যেহেতু একজন ঠিকাদার ছিলেন এবং ঠিকাদারী ব্যবসা করেই তিনি ভাগ্য গড়েছেন, তাই তাকে যোগাযোগমন্ত্রী করা ঠিক হয় নাই, তাহলে নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না। কারণ সকলেরই জানা যে, ঠিকাদারী ব্যবসা কোন সরল পথে চলে না। এর সবটাই গরল পথে চলে বিধায় এ ব্যবসা নিয়ে এতো মারামারি, কাটাকাটি, টেন্ডারবাজি! তাই অনুরূপ একজন ব্যবসায়ীকে যোগাযোগমন্ত্রী বানিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণে হাত দেয়া সঠিক ছিল কিনা এ প্রশ্নটিও ভেবে দেখতে হবে।
তৃতীয় কথা: যেসব মন্ত্রী, এমপি’র হাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা সঠিকভাবে সে দায়িত্ব পালন করেছেন কিনা এবং কেউ কেউ এসবকে জাদুর কাঠি হিসাবে ব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হয়েছেন কিনা? প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেয়ায় দেশে প্রচুর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হলেও পাশাপাশি দুর্নীতিও কম হয়েছে কিনা সে কথাটিও ভেবে দেখা দরকার।
চতুর্থ কথা: জামায়াত-বিএনপিসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তি দেশে- বিদেশে সুপরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয় বহুগুণ বৃদ্ধি করে সার্থকভাবে তা প্রচার করেছে। গত বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ও শহর ভ্রমণকালে সেখানকার বাংলাদেশিদের কাছে এসব জেনে ও শুনে অবাক হয়ে গেলাম। বিশেষ করে ফ্রান্স আওয়ামী লীগের একাংশের সভাপতি নাজিমউদ্দিনের মুখে এসব শুনে আরো বিস্মিত হলাম। দেখলাম প্রচুর বিশ্বাসযোগ্য কুত্সা রটানো হয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ আছে। আবার দেশেও অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠছে। অথচ আওয়ামী হাইকমান্ড এ বিষয়ে তেমন গা না করে এসবের প্রতিকারে কার্যকর কিছু করেন নাই।
পঞ্চম কথা: মন্ত্রী, এমপিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধান হিসাবে যাদের পদায়ন করা হয়েছে জনগণের স্বার্থে তারা দেশের জনপ্রশাসন চালাতে সমর্থ হয়েছেন কিনা? আমাদের জানা মতে, দেশের অফিস- আদালতসহ জনসেবার সকল ক্ষেত্রে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির ব্যাপকতা আরো বেড়েছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একশ্রেণির আমলা-কর্মচারী সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করে ঘুষ আদায়সহ বিভিন্নভাবে জনগণের উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। আর এসব নিয়ন্ত্রণে সরকার যাদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছেন তারা শুধু চেয়ে চেয়ে এসব অনাচার দেখে চলেছেন। ধারণা করা যায় যে, এসব নিয়ন্ত্রণে যাদের হাতে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তাদের এসব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিছু নেই। এই স্বল্প পরিসরে সবকিছু বিস্তারিত বলা সম্ভব না হওয়ায় পরিশেষে বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব জানতেন কিনা বা জানেন কিনা?
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট
