স্নোডেনকে লইয়া চঞ্চল বিশ্বরাজনীতি

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৩, ২১:৪৪
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরপত্তা সংস্থার সাবেক কারিগরী ঠিকাদার এবং সিআইএর প্রাক্তন কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন নিজ দেশের সরকারি নজরদারির তথ্য ফাঁস করিয়া এখন বিশ্বময় পলাইয়া বেড়াইতেছেন। ৬ জুন তিনি দি গার্ডিয়ান এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় জানাইয়া দেন যে, ২০০৭ সাল হইতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রিজম নামের একটি প্রকল্প মারফত গোপনে ইন্টারনেটের নানান বার্তার নজরদারি করিতেছে এবং সংগ্রহ করিতেছে প্রযুক্তিসংক্রান্ত কোম্পানিগুলির সহায়তা লইয়া। এই নজরদারির মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নহে, অন্যান্য দেশের নাগরিকেরাও রহিয়াছে। এই তথ্যবোমা ফাটাইয়া স্নোডেন দেশান্তরী হইয়াছেন, কারণ তিনি জানিতেন এই তথ্য জানাইবার মাধ্যমে তিনি তাহার সরকারের রোষানলে পড়িবেন। তিনি হাওয়াই হইতে প্রথমে হংকংয়ে যান, ইহার পর মস্কো। মস্কো যাইবার পূর্বে আইসল্যান্ড এবং কিউবায় যাইবার কথাও শোনা যাইতেছিল। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি মস্কোতেই রহিয়াছেন, তবে লোকচক্ষুর অন্তরালে। সম্ভবত তিনি মস্কোর শেরেমোতিয়েভো বিমানবন্দরের ট্রানজিট এলাকায় রহিয়াছেন, মস্কোর সাংবাদিকরা তাহাকে খুঁজিয়া পান নাই। তবে স্নোডেনের শেষ গন্তব্য সম্ভবত ইকুয়েডর, যে দেশটি, কয়েক মাস হইলো, তাহার মতোই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গোপন তথ্য ফাঁস করিয়া দেওয়া সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে লন্ডন দূতাবাসে আশ্রয় দিয়াছে। ভেনেজুয়েলাও ঘোষণা দিয়াছে ফেরারি স্নোডেনকে তাহারা আশ্রয় দিতে প্রস্তুত। আমাদের মনে পড়িতেছে মার্কিন সৈন্য ব্র্যাডলি ম্যানিংয়ের কথা, যিনি উইকিলিকসের কাছে ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার ভিডিও ও আড়াই লাখ গোপন কূটনৈতিক তারবার্তা পাচার করিয়াছিলেন। ম্যানিং ২০১০ সালে গ্রেফতার হন এবং এখনও তাহার বিচার চলিতেছে। তবে ম্যানিংয়ের চাইতে স্নোডেনের বেশি মিল পাওয়া যাইবে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের সহিত, যিনি গ্রেফতার এড়াইতে দেশে দেশে ফেরার হইয়াছেন। জুলিয়ানের মতোই স্নোডেন ইকুয়েডরমুখী। তবে ইকুয়েডর জানাইতেছে তাহারা স্নোডেনের আবেদনপত্র পাইয়াছেন, কিন্তু পুরা প্রক্রিয়া শুরু করিতে কিছু সময় লাগিবে। জুলিয়ানের জন্য সময় লাগিয়াছিল দুই মাস। ততদিন কি স্নোডেন মস্কোর বিমানবন্দরেই থাকিবেন? তাহা হইলে আমাদের মনে পড়িবে স্টিভেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্র টার্মিনাল-এর কথা যেইখানে ভিক্টর নেভরস্কি নামক এক ব্যক্তি জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে আটকা পড়েন এই কারণে যে, তাহার দেশে একটা ক্যু হইয়া গিয়াছে; ফলে তাহার পক্ষে আমেরিকায় প্রবেশ করা এবং নিজ দেশে ফেরা সম্ভব নহে। ব্যক্তি স্নোডেনকে লইয়া বৈশ্বিক রাজনীতিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হইয়াছে। হাওয়াই হইতে হংকংয়ে যাইবার অনুমতি দিবার কারণে চীনের উপর এবং মস্কোর বিমানবন্দরে ঠাঁই দিবার জন্য রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্র গোস্বা হইয়াছে। এইদিকে ইকুয়েডরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বলিয়াছে, তাহারা যদি স্নোডেনকে আশ্রয় দেয়, তাহা হইলে জুলাইতে বাণিজ্য চুক্তি নবায়নের যেই আলাপ হইবার কথা ছিল, তাহা বরবাদ হইয়া যাইবে। তবে স্নোডেন কেবল এক ব্যক্তিমাত্র নহেন, যেমন নহেন জুলিয়ান, উইকিলিকস যেমন নহে একটি সাইটমাত্র। এইরকম কয়েকজন ব্যক্তি এবং এরূপ একটি সাইট বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যপ্রতিষ্ঠার সকল কায়দা, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার হরণ করিয়া নজরদারির মতো হীন কৌশলের গোপন খবর বিশ্ববাসীকে জানাইয়া দিয়াছে এবং এইভাবে দেশটির আধিপত্য ও সমরশ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিমূল নাড়াইয়া দিয়াছে। সরকার প্রিজম প্রকল্পের মাধ্যমে, তথাকথিত নিরাপত্তাজনিত কারণে, ইন্টারনেটে নজরদারি করিতেছে ২০০৭ সাল হইতে, নাগরিকেরা তাহা জানেইনা। সকল অর্থেই ইহা মানবাধিকার ও সংবিধান পরিপন্থী এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের সামিল। ইহার বিপরীতে স্নোডেনের মতো গেরিলাযোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি সঙ্গে করিয়া, অনলাইন প্রযুক্তির আশ্রয় লইয়া, নূতন সময় ও সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করিয়া যাইতেছেন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন