রাজনৈতিক সম্প্রীতি নয় কেন?

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৩, ২১:৪৫
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অবস্থান গৌরব করার মতো। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের মানুষ শান্তিতে নির্বিঘ্নে বসবাস করছে। কিন্তু এদেশের রাজনৈতিক সম্প্রীতি সম্পর্কে কোন ভালো কথা নেই, কোন আশার বাণী নেই। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে। ওইসব দেশে বাংলাদেশের মানুষ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন এবং ভদ্র আচার-আচরণের কারণে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। বাঙালিরা যে ভদ্র এবং সংস্কৃতিমনা জাতি সেকথাও প্রমাণিত হয়েছে। অপরধর্ম সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও বাঙালি বিশ্বের এক নম্বর জাতি। বাংলাদেশের হাটেবাজারে কিংবা বড় শপিংমলে একই ছাদের নিচে হিন্দু-মুসলমানের দোকান আছে। পাশাপাশি তারা ব্যবসা করছে। কেউ মহাজন কেউ খুচরো বিক্রেতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ঐতিহ্য-প্রথা এবং হিন্দু দেবদেবীর স্মরণে প্রতিবছর মেলা হয়। এ সকল মেলার বেশিরভাগ দর্শনার্থীই মুসলমান। হিন্দুদের এসব মেলা ও পূজা-পার্বণে মুসলমানরা না উপস্থিত হলে এতদিন অনেক স্থানের মেলা ও পূজা বন্ধ হয়ে যেতো। হিন্দুর বাড়িতে বিবাহের অনুষ্ঠানের জন্য, নামকীর্তন গানের জন্য প্যান্ডেল বানাতে কিংবা দুর্গাপূজার সময় অস্থায়ী পূজামণ্ডপ তৈরি করার জন্য অনৈক জায়গায় মুসলমানের বাড়ি থেকে ঢেউটিনসহ অন্যান্য সামগ্রী আসে। দুর্গাপূজা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য ও পূজা উত্সব শান্তিপূর্ণভাবে পালন করার ক্ষেত্রেবিশেষে টাকা পয়সাও খরচ করে থাকে মুসলমানরা। তাই বলা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একমাত্র উদার-সাম্প্রদায়িক একটা দেশ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন চরম উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক সম্প্রীতির চিত্র খুবই করুণ ও হতাশাব্যঞ্জক। ক্ষমতাসীন দল তাদের প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে, দেশের সম্পদ ব্যবহার করে জনগণের কাছে তাদের কারিশমা যত সহজে তুলে ধরতে পারে বিরোধীদল তা পারে না। ক্ষমতাসীন দলের এই পারার ক্ষমতা তাদের অহংকারী করে তোলে। তারা ভুলে যায় যে, তারাও একদিন বিরোধীদলে ছিল। বিরোধীদলে থাকার যে যন্ত্রণা সেকথা মনে করেই বোধহয় সরকারি দল পরবর্তীতেও ক্ষমতায় থাকার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা করে থাকে। ক্ষমতাসীন শাসকদল চিরকাল বিরোধীদলকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। বিরোধী-বিপরীত মনোভাবের প্রতি বিন্দুমাত্র সমীহ দেখানোর প্রবণতা কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দেখা যায় না। বিশেষ করে সরকারি দল সবসময়ই এদেশের মানুষকে বোকা ও নাবালক মনে করে থাকে। যে দেশের মানুষের অস্থি-মজ্জায় মিশে আছে চর্যাপদ, লালন-হাসন, রবীন্দ্র-নজরুলের দর্শন, যে দেশের মানুষ তিতুমীর-সূর্যসেন হয়েছে, যে দেশের মানুষ ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, যে দেশের মানুষ ১৯৭১ এনেছে সেদেশের মানুষকে যখন সরকার বোকা ও অর্বাচীন মনে করে যাচ্ছে তাই আইন তৈরি করে তখনই সে সরকারের সমাধি রচিত হয়। জনগণের মতামত ও মনোভাবকে শ্রদ্ধা না দেখিয়ে কোন স্বৈরাচারী সরকারই পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারেনি। দেশের প্রবল সংকটের কালে দেখা যায় অতুলনীয় রাজনৈতিক সম্প্রীতি। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারকে হটানোর আন্দোলনে আমরা বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদল বিএনপির মধ্যে পরম বন্ধুত্বের সম্পর্ক লক্ষ্য করেছি। সে সম্পর্কই এদেশের সামরিক শাসনের কলঙ্ক দূর করে এরশাদের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল যে সম্প্রীতি সৃষ্টির কৌশল জানে না তা কিন্তু নয়। ওয়ান ইলেভেনের সময় বর্তমান দুই প্রধান বিরোধীদলের নেত্রীদের মধ্যে নাকি নিজেদের রান্না খাবার দাবার বিনিময় হতো। আমরা সে সময় এ খবর সংবাদপত্রে পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পরে সেই সম্পর্কের লেশমাত্র আমরা দেখলাম না। বরং দুজন দুজনার চরম প্রতিপক্ষের ভূমিকায় আজ অবতীর্ণ হয়েছেন। বর্তমান সরকারি দল ক্ষমতায় এসে চমক সৃষ্টিকারী বেশকিছু নীতি প্রণয়ন করেছেন। যা ২০০৮ সালের এককোটি নতুন ভোটারসহ দেশবাসীকে নতুন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল নতুন দেশ গড়ার সুন্দর সুন্দর স্লোগানগুলো বিরোধীদলের কঠোর সমালোচনার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি দলে বেশি সংখ্যক সংসদ সদস্য থাকার কারণে তাদের যথেষ্ট স্বেচ্ছাচারী হবার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সে সুযোগ সরকার পুরেপুরি কাজে লাগিয়েছেন। সরকারি দল ও বিরোধীদলের পরস্পরের প্রতি যে সমালোচনা তা একটা জায়গাতেই স্থির হয়ে আছে। আর সেটা হচ্ছে গুণের চেয়ে দোষগুলো খুঁজে খুঁজে তা নিয়ে নোংরা ছড়ানো। তবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট সরকার গঠনকারী দলটি আওয়ামী লীগ। এই দলটি এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে এবং সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশপ্রেমিক বিবেকবান মানুষ তাই এই দলটিকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চায়, কিন্তু তারা বার নৈবেদ্য সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই প্রয়াত এই দুই নেতার অনুসারীদের প্রতি অনুরোধ, শুধু বিতর্কের জন্য কাউকে হেয় করে কথা বলবেন না। দেখবেন আপনি যেমন এতে সম্মানিত হবেন তেমনি আপনার নেতা এবং দেশও সম্মানিত হবে। আর এর মাধ্যমেই একদিন এদেশে রাজনৈতিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। লেখক:বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, পাংশা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, রাজবাড়ী [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন