আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। আবার কেউ বলছেন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে যখন তাদের আর কোন কর্তৃত্ব থাকবে না তখন দেশ পরিচালিত হবে কিভাবে এই চিন্তা না করেই কেউ আবার বলছেন- সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর শুধু নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন হবে। সবাই নিজ নিজ অবস্থানকে দেশ ও জাতি বিশেষ করে দেশের রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক মনে করে নিত্যনতুন যুক্তি দাঁড় করিয়ে চলেছে। তবে কার যুক্তি কতটুকু যুক্তিযুক্ত ও উপযুক্ত তথ্য বিশ্লেষণেই তা বেরিয়ে আসবে।
নিজস্ব যুক্তি-তর্কের উপর ভিত্তি করে সরকারি দল তাদের আগের অবস্থানে থাকার পাশাপাশি সদ্য সমাপ্ত চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির জয়কে পুঁজি করে বিএনপিসহ সমমনা দলকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, তাদের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। তাই তারা তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে দেখাতে চায় তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। তাতে ‘জনগণ ভোট দিলে আছি না দিলে নাই’ বলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন। তাই যদি হয় এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মত যদি আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয় আর বিএনপি ক্ষমতায় যায় তবে আওয়ামী লীগের বর্তমান দাবি অনুযায়ী বিএনপি সরকার তাদের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন দেবে। তখন যদি আবার মাগুরার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে আওয়ামী লীগ কি আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করবে? এক্ষেত্রে কি আওয়ামী লীগ নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিচ্ছে না?
আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে নিজের ফাঁদে নিজে পা দিয়ে ফেলেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। তারা একদিকে তারেক, কোকো এমনকি খালেদা জিয়ার দুর্নীতির ওয়াজ করছে অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক এলে গতবার তারা (বিএনপি) যেভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল আবার সেই নির্যাতনের শিকার হতে পারে বলে তাদেরকে নসিহত করছে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বাতিল করাকে জায়েজ করতে। ‘তত্ত্বাবধায়ক এলে তাকে (বিরোধী দলীয় নেত্রী) এবং আমাকে (প্রধানমন্ত্রী) আবার জেলে যেতে হবে’ বলে প্রধানমন্ত্রী একদিকে আশংকা প্রকাশ করছেন অথচ বিচার করলেন না গতবারের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের, যারা বিনা দোষে তাদের জেলে পাঠিয়েছিলেন! তারা বলছে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ সংবিধান পরিপন্থী অথচ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করে কেন বাতিল করা হল যদি তত্ত্বাবধায়ক শুধুমাত্র সংবিধান পরিপন্থীই হয়? বিশ্বের অন্যসব গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় এদেশেও সেভাবে নির্বাচন হবে বলে একদিকে তারা জনগণকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিচ্ছে অন্যদিকে সংলাপে বসানোর জন্য গণতান্ত্রিক দেশের যে আহ্বান তা উপেক্ষা করছে! এই হল গণতন্ত্র চর্চা!
আসলে সংবিধান ও গণতন্ত্র কী? অধিকাংশ জনগণ যা চায় তার বাস্তবায়নই গণতন্ত্রের নীতি। আর সংবিধানে নেই বলে বাস্তবতাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না তাতো হতে পারে না। আমরা যদি নিজেদের দেশের স্বার্থে কোন বিষয়কে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করি এবং যদি তা বিশ্বের অন্য কোন দেশের জন্য ক্ষতিকর না হয় তবে আমাদের তা মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? শীত প্রধান কোন গণতান্ত্রিক দেশের লোকজন সারা বছর মোটা কাপড় পরে বলে আমাদেরও কি তা অনুসরণ করতে হবে? অন্য দেশে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় সত্য এবং পরাজিত দল হাসিমুখে জয়ী দলকে স্বাগত জানায় সেটা আরও সত্য। কিন্তু আমাদের দেশে? মাগুরার নির্বাচন ও ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কি গণতন্ত্রের কথা বলে? নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে আবার সেই মাগুরার নির্বাচন ও ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? আর যাই হোক যেনতেনভাবে তো আর সংসদীয় নির্বাচন হতে পারে না।
বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও দলীয় বিচারপতিদের নিয়োগই সেজন্য দায়ী। অতএব প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি থাকলে শুধু ঝামেলা নয় মহাঝামেলা হবে সবার জন্য সবসময়। তাই এ পদ্ধতিটি সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি পদ্ধতি বের করতে হবে যাতে সবার কাছে সমাদৃত হয় এবং বিতর্কিত হওয়ার ফাঁক-ফোকর না থাকে। এক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি কমিটি হতে পারে যারা নির্বাচনকালীন সময়ে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে পারে।
স্বাধীনতার চার দশক পার হলেও আমরা যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে পারিনি এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে? এজন্য প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে বিরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে! এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অচিরেই আলোচনার মাধ্যমে সংসদীয় নির্বাচনের নতুন কোন পদ্ধতি বের করতে হবে যা সবার জন্য মঙ্গলজনক ও দেশের গণতন্ত্রের অগ্রগতির জন্য সহায়ক।
লেখক :কলামিস্ট
E-mail: [email protected]
