নি র্বা চ ন

একই কাজ করে ভিন্ন ফলের আশা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২০:৫৫
চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন যত সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হোক (আর তার প্রমাণ হিসেবে বিরোধী দল মনোনীত প্রার্থীরা যত বিপুলভাবেই বিজয়ী হোন না কেন), তাতে বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপিকে জাতীয় নির্বাচনে আনার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হবে না। বিএনপি অর্থাত্ প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো না গেলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। আগামী জাতীয় নির্বাচন শুধু দেশে গ্রহণযোগ্য হলে চলবে না—সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যিকভাবেও বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রফতানিমুখী উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রয়েছি আমরা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমরা প্রধান অংশগ্রহণকারী। বিদেশি বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে চাইছি আরও বেশি করে, চাইছি যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে। বিদেশি ঋণ সহায়তায় ‘মেগা প্রোজেক্ট’ বাস্তবায়ন করতে চাইছি আমরা। উন্নয়নের চাহিদা আমাদের তীব্র। এসবের জন্যও চাই দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকার। মুশকিল হলো, বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলেও একই ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ (বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায়) নেই। মতান্তরে সুযোগ থাকলেও তাতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই বিরোধী দলের। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তাদেরও অবিশ্বাস ছিল তীব্র। জাতীয় নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বলতে গেলে তাদেরই আন্দোলনের ফসল। সেজন্য তারা গর্বও বোধ করতেন। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে যত যা-ই ঘটে যাক না কেন—বিরোধী দলে বিশ্বাস জন্মেনি যে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে রায় হয়ে সংবিধান সংশোধিত হয়ে যাওয়ার পরও তারা তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকারের পক্ষে অনড় অবস্থান নিয়ে আছেন। স্থানীয় সরকার শুধু নয়—একাধিক মানসম্মত উপ-নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের পরও তাদের মধ্যে এ প্রত্যয় জাগানো যায়নি যে, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে থাকলে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনে তা কোনো বাধা হবে না। বিরোধী দলের নেতারা স্পষ্ট করেই বলছেন, উপ ও স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। দ্বিতীয়টিতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন জড়িত। সে কারণেই এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশ্বাস করা যায় না। পরস্পরের প্রতি এই তীব্র অবিশ্বাস গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক বৈকি, তবে আমাদের রাজনীতিতে এটি রয়েই গেছে কিংবা বলা যেতে পারে আরও বেড়েছে। সেজন্য রাজনীতির উভয়পক্ষকেই হয়তো কমবেশি দোষ দেয়া যাবে, কিন্তু সমস্যাটি অস্বীকার করা যাবে না। বাস্তব সমস্যার অস্বীকৃতি তো কোনো কাজের কথা নয়। চার সিটির নির্বাচনে যা লক্ষ্য করা গেল এবং আগামীতে গাজীপুরসহ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যেরকম ফল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাতে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা চাঙ্গা ভাব এখন স্পষ্ট। এর আগে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয়ও কিন্তু তারা ভালো করেছেন। তাই রাজপথে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে বিএনপি কিছুই অর্জন করেনি, এমনটি বলা ভুল হবে বৈকি। সরকার মোটের ওপর তাদের সঙ্গে যে আচরণ করে এসেছে, তাতেও তারা অর্জন করেছেন মানুষের সহানুভূতি। এসবের পর চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বড় বিজয় তাদের মধ্যে এনে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস। সরকার পক্ষও এখন মনে হয় তাদের গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়াতেও নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে বিএনপির দাবি ক্ষমতাসীনদের কাছে তেমন কল্কে পায়নি বললে কী ভুল হবে? আমরা এও লক্ষ্য করেছি, সংলাপ নিয়ে সরকার পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে দেয়া হয়েছে হেঁয়ালিপূর্ণ বক্তব্য। তাতে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে এখানকার ধাবমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশে-বিদেশে যারা উদ্বিগ্ন, তারাও বিরক্ত হয়েছেন কমবেশি। বিরোধী দল অবশ্য নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে এ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তবে তাদের মনোভাব অস্পষ্ট নেই আর। অন্য সব মেনে নিলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। অন্যান্য বিরোধী দলেরও একই মনোভাব। দেশে যে ধরনের সংসদীয় শাসন চলছে, সেটিকে আজকাল অনেকেই বলতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শাসিত ব্যবস্থা। বিএনপি ও বিএনপি-জামায়াত শাসনামলেও বিষয়টি এ থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না। এজন্য নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ‘পিন পয়েন্ট’ করেই বক্তব্য দিচ্ছে বিরোধী দল। এখন প্রধানমন্ত্রী যদি ঘোষণা দেন ওই সময়ে তিনি আর সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে থাকবেন না, তাহলেই যেন বেরিয়ে আসবে সমাধান সূত্র। এ কারণেই বোধ হয় কিছুদিন আগে সংলাপ নিয়ে একটু তোড়জোড় চলার সময় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী দলের এক সভায় জোরগলায় বলে বসলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই জাতীয় নির্বাচন হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তো বলেই চলেছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় এখানেও সেভাবে হবে। তার এমন ‘বিশ্বাসের’ কথাও মাঝে-মধ্যে ব্যক্ত করছেন যে, বিএনপি ঠিকই আসবে নির্বাচনে। এ প্রশ্নে জনগণ কী মনে করে, সেটি কিন্তু বড় প্রশ্ন। অবশ্য নির্বাচন কেবল জনগণ করে বললে ভুল হবে। এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দত হুসাইনের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নির্বাচনে ভূমিকা রাখে আরও নানা উপাদান। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন (সামরিক ও বেসামরিক), মিডিয়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও শেষত নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনকালে এসব উপাদান পরস্পরের ওপর কাজ করে এবং এগুলোর ভূমিকা ভোটার মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলে। আমাদের মতো দেশে যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনেও সেভাবে গড়ে ওঠেনি বা গড়ে উঠতেই দেয়া হয়নি, সেখানে গণতন্ত্র আর দশটা অগ্রসর গণতান্ত্রিক দেশের মতো কার্যকরভাবে এগুচ্ছে বলা যাবে না। এখানে নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র বা এর চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হওয়া না হওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়ে গেছে। ইসির মতো প্রতিষ্ঠানকেও এদেশে শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠতে দেয়া হচ্ছে না। বিশ্বাসযোগ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারছেন না তারা। এখন প্রধানমন্ত্রী তার মতো করে বলে যাচ্ছেন, তত্ত্বাবধায়ক আসলে এবার আর যাবে না, নির্বাচনও দেবে না। এমনটি তিনি কীসের ভিত্তিতে বলছেন, তা বোধগম্য নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কিন্তু নির্বাচন দিয়েছে এবং তার সব ক’টাই কমবেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে দেশে-বিদেশে। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারও জাতীয় নির্বাচন দিয়েছে—দু’বছর পর হলেও। আর এতে প্রধানমন্ত্রীর অত ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ দেখি না। যেসব কাণ্ডের পর ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে কিছুটা অনুকূল পরিবেশ তো পেয়েছিলেন তারাই। বিএনপির ওইরকম একটা পরাজয় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল তাতে। সন্দেহ কী, অবস্থান পুনরুদ্ধারের আত্মবিশ্বাসটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল দলটি। আর সুবিপুল বিজয়ের মর্ম বুঝতে না পেরে অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপির মধ্যেও একই জিনিস আমরা দেখতে পেয়েছিলাম ২০০১-এর নির্বাচনের পর। আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তি উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো যাচ্ছে না এখানে—Doing something over and over again and expecting different results is insanity. (অর্থাত্ একই কাজ বারবার করে তা থেকে ভিন্ন ফল আশা করাটা পাগলামি)। রাজনীতিকদের সম্মানে ‘পাগলামি’র বদলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা যেতেই পারে; তাতে কিন্তু মহাবিজ্ঞানীর মূল কথাটি বদলাবে না। সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে ক্ষমতাসীনরা যা বলছেন, যে আচরণ করছেন, তার সঙ্গে বিএনপিও মিলিয়ে দেখতে পারে ক্ষমতায় থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে নিজেদের বক্তব্য ও আচরণ। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ক্ষমতা হস্তান্তর হয়, সেদিকে এগুনোর লক্ষ্যে দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই বারবার বলা হচ্ছে—এভাবেই নির্বাচন হবে। এদিকে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে এ প্রশ্নে যেমন রায় দেয়া প্রয়োজন, তা দিয়ে বসে আছেন সর্বোচ্চ আদালত। বিরোধী দলকে সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেও সমাধান সূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন সুধী সমাজের কেউ কেউ। তাদের কথা শুনতেও যদি দেরি করে ফেলে সরকার, তবে পরিস্থিতি আরও সংঘাতের দিকে যাবে। তীব্র গালমন্দে ভরা বাজেট অধিবেশন চললেও ইতিবাচক যে, বিরোধী দল সংসদে আছে এখন। সিটি নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতরকম ভালো করায় তারা আছেন ফুরফুরে মেজাজেও। আপাতত রাজপথ গরম করার কোনো আয়োজনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। রমজান মাস শুরু হতেও বেশি দেরি নেই। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে চলতি অধিবেশনে একটা ‘মুলতবি প্রস্তাব’ দিয়ে বিএনপি তা নাটকীয়ভাবে ফিরিয়ে নিলেও ক্ষতি নেই। সংসদের বাইরেও কথাবার্তা শুরু হতে পারে এ বিষয়ে। অন্তত বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন করে যে কোনো ফায়দা হবে না চার সিটির ভোটাররাও তো সেটা বুঝিয়ে দিল সম্প্রতি হয়ে যাওয়া নির্বাচনে। এ অবস্থায় আমরা ধরেই নিতে চাইব, আইনস্টাইনের উক্তি সত্য প্রমাণ করে বর্তমান সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই বিএনপির ১৫ ফেব্রুয়ারি ধাঁচের কোনো নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার পক্ষ ও তার মিত্রদের জন্য সেটা হবে অনেক বেশি বিপর্যয়কর। জাতিকেও মূল্য দিতে হবে শুধু শুধু। বিশেষত বিনিয়োগে সংকট আরও বেড়ে উঠলে অর্থনীতি ও জনজীবনে এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। লেখক : সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন