অসংসদীয় ভাষা ও স্পিকারের ভূমিকা

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২০:৫৬
সংসদে অশালীন ও অসংসদীয় ভাষার চর্চাটা এতকাল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও হালে তা নিরবচ্ছিন্ন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের কতিপয় নারী সাংসদের বাক-প্রতিভায় (?) সংসদ ‘আইনখানা’ থেকে যেন ‘গালিখানা’য় রূপান্তরিত হবার উপক্রম হয়েছে। এটা সত্যি, সংবিধানের ৭৮ (৩) অনুচ্ছেদ মতে সংসদে প্রদত্ত বক্তব্য বিষয়ে সাংসদদের বিরুদ্ধে আদালতে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এই দায়মুক্তি কোনো অর্থেই লাগামহীন বেপরোয়া ও অশালীন বক্তব্য দেয়ার লাইসেন্স নয়। তা কোনোভাবেই ৩৯ (২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত শালীনতা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে বাক ও ভাব প্রকাশের সীমারেখার ঊর্ধ্বে নয়। তাছাড়া এই দায়মুক্তির উপভোগ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রাণালী বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ওই বিধির ২৬৭ ধারায় সংসদে সাংসদদের অবশ্য পালনীয় আচরণবিধির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ ১। কোন সাংসদের বক্তৃতাকালে তাকে উচ্ছৃঙ্খল উক্তি বা গোলমাল সৃষ্টি বা টিকা টিপ্পনী শিস বা অন্য কোনরূপ বিশৃঙ্খল আচরণ দ্বারা বাধা প্রদান করা যাবে না। ২। অপ্রাসঙ্গিক কোন বই, সংবাদপত্র বা চিঠিপত্র পাঠ করা যাবে না। ৩। স্পিকারের ভাষণদানকালে সংসদ কক্ষ ত্যাগ চলবে না। ৪। সংসদে বক্তৃতা ব্যতিরেকে নীরবতা পালন করতে হবে। ৫। সংসদের কাজে বাধাপ্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি নিষিদ্ধ। ৬। কোন সাধারণ গ্যালারি বা বিশেষ গ্যালারিতে কোন আগন্তুকের প্রবেশকালে কোনরূপ হর্ষ ধ্বনি বা বক্তৃতাকালে তার উদ্দেশ্যে কোন উক্তি করা যাবে না। অন্যদিকে ২৭০ ধারাতে আছে বক্তৃতাকালে পালনীয় নিয়ম নীতির বর্ণনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ ১। সংসদে বক্তৃতাকালে আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কথা বলা যাবে না। ২। প্রাসঙ্গিকভাবে একান্ত অপরিহার্য না হলে মন্ত্রী বা সরকারি পদে অধিষ্ঠিত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ চলবে না। ৩। সংসদের পরিচালনা বা কার্যপ্রবাহ সম্পর্কে অপ্রীতিকর ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। ৪। রহিত করার প্রস্তাব ব্যতীত সংসদের কোন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কটাক্ষ করা যাবে না। ৫। বক্তৃতায় কোন আক্রমণাত্মক, কটূ বা অশ্লীল ভাষা কিংবা দেশদ্রোহিতামূলক রাষ্ট্রবিরোধী বা মানহানিকর উক্তি নিষিদ্ধ। ৬। কোন বিতর্কে অসৌজন্যমূলকভাবে কোন সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ চলবে না। সংসদীয় কার্যপ্রাণালীতে প্রচলিত কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ দূরে থাক, সংসদে কারো বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ পেশের সুযোগ পর্যন্ত নেই। সেক্ষেত্রে স্পিকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে আগে তা জানাতে হয়, যাতে তারা তদন্তপূর্বক উত্তরদানের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। স্পিকার অনুমতি দিলেই পরে অভিযোগ সংসদে পেশ করা যাবে (ধারা ২৭১)। এমনকি কোন সাংসদের কাছে সরাসরি কোন প্রশ্ন উত্থাপনের নিয়মও নেই। করতে হয় স্পিকারের মাধ্যমে (ধারা ২৭২) অথচ সংসদে ধান ভানতে শীবের গীত শোনাতেই আমাদের সাংসদদের তৃপ্তি। ওই কার্যপ্রণালীতে বর্ণিত আচরণবিধি বা নিয়মনীতি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্পিকারকে বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। যেমন সংসদ চলাকালে কোন সাংসদ গুরুতর বিশৃঙ্খল আচরণ করলে (স্পিকারের বিবেচনায়) স্পিকার তাকে অবিলম্বে সংসদ ত্যাগ ও নির্ধারিত সময়ের জন্য ওই দিনের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিতে পারেন (ধারা ১৫)। কোন সাংসদ স্পিকারের কর্তৃত্ব অমান্য করলে এবং বার বার ও ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদের কাজে বাধাদানের জন্য বিধিসমূহের অপব্যবহার করলে স্পিকার তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করতে পারেন (ধারা ১৬)। বিশৃঙ্খলা গুরুতর হলে স্পিকার প্রয়োজনবোধে নির্ধারিত সময়ের জন্য বৈঠক স্থগিত করতে পারেন (ধারা ১৭)। এমনকি বিতর্কে ব্যবহূত অবমাননাকর বা অশোভন বা সংসদ রীতি বিরোধী বা অমর্যাদাকর শব্দাবলী সংসদের কার্যবাহ হতে বাতিল করতে পারেন (ধারা ৩০৭)। অন্যদিকে কোন সাংসদ অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিলে বা বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলে স্পিকার সতর্কতাপূর্বক তাকে বক্তৃতা বন্ধের নির্দেশ দিতে পারেন। তখন ওই সাংসদ তার আসনে বসে পড়বেন (ধারা ২৭৩)। প্রকৃতপক্ষে সংসদে শৃঙ্খলা রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং তা পালনে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্ত ক্ষমতা স্পিকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে (ধারা ৩০৩)। শৃঙ্খলা রক্ষা ছাড়াও সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ বা কার্য পরিচালনার প্রয়োজনে গৃহীত যে কোন সিদ্ধান্ত কার্যকরের ক্ষমতা স্পিকারের আছে (ধারা ১৪ (৫)। এমনকি সংসদ এবং সংসদের কমিটিসমূহের কার্যাবলী সম্পর্কিত যে বিষয়ে বিদ্যমান সংসদীয় কার্যপ্রণালীতে কিছু বলা নেই, সে ব্যাপারেও স্পিকারকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে (ধারা ৩১৬)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৮ (২) মতে স্পিকারের ওইরূপ সিদ্ধান্তসমূহকে আদালতে চ্যালেঞ্জ আইনগত সুযোগও নেই। সংসদে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্পিকার সাধারণত সাময়িকভাবে মাইক বন্ধ বা কার্যবাহ হতে আপত্তিকর শব্দ বাতিলেই সীমাবদ্ধ থাকেন। জানি, নিরপেক্ষতা অর্জন বা ধরে রাখার জন্য ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এতটুকুকেই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু অশালীন, মানহানিকর কুত্সাপূর্ণ ও অসংসদীয় ভাষায় লাগাতার চর্চায় সাংসদ ও সংসদের ভাবমূর্তি যে তলানিতে ঠেকেছে তা থেকে ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্ত সাংসদকে বহিষ্কার, সাময়িক অপসারণসহ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। গত ২৪ জুন সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের সাংসদ জুনাইদ আহমেদ পলক, সংসদে অশালীন বক্তব্য বন্ধে প্রতিটি অশালীন শব্দের জন্য ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের প্রস্তাব দেন। পরদিন বিএনপির সিনিয়র নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদও তাতে সমর্থন ব্যক্ত করেন। স্পিকার চাইলে এ প্রস্তাব কার্যকর করতে পারেন। ভারতে ৯০০ পৃষ্ঠাব্যাপী অসংসদীয় শব্দের শব্দকোষ তৈরি হয়েছে। গত ৬৬ বছরের বিতর্কে স্পিকারের রুলিংয়ের ভিত্তিতে ওই শব্দকোষ তৈরি হয়। স্পিকারের উদ্যোগ আমাদের দেশেও এরূপ একটা শব্দকোষ প্রণয়ন করা যেতে পারে। লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন