জিএসপি সুবিধা ফিরাইয়া দেওয়া হউক

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৩, ২০:৫৯
বাংলাদেশি কিছু পণ্যে দেয়া অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। এই খবরটি মার্কিন মুল্লুক হইতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সারাবিশ্বে ছড়াইয়াছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হইয়াছে বাংলাদেশ। খবরটি থমকাইয়া যাইবার মতন। এ কী কাণ্ড করিলো যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রতি বাংলাদেশি জনগণের সমর্থনের কথা ভাবিলে ইহা আশ্চর্যের বিষয়ও বটে। যদিও আশ্চর্যান্বিত হইয়া লাভ নাই। কারণ, অতীতেও দেখা গিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র তাহার স্বার্থের জন্য সবই করিতে পারে। দরকার হয় শুধু একটা অজুহাত। আর বাংলাদেশে জিএসপি বাতিলের জন্য তাহার নিকট অনেক অজুহাতও রহিয়াছে। ইহার মধ্যে আছে বাংলাদেশি কারখানার শ্রমমান উন্নয়ন। বিশেষত গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য দরদী মার্কিন সরকার রানা প্লাজা ধস, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় ত্যক্তবিরক্ত। সত্যিই তো, শ্রমিকদের কল্যাণে মালিকদের কিছু অংশতো ব্যয় করা উচিত। তাহা না করিলে এমনটিই হইবে। যদিও কথা থাকিয়া যায় যে, গার্মেন্টস কারখানার পরিবেশ উন্নয়নের কথা বলিলেও যে সুবিধাটি স্থগিত করিয়াছে তাহা গার্মেন্টস পণ্যের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। তদুপরি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ধনী দেশ হিসাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশ এই সুবিধাটি পাইয়াছে। তাহা হইলে এই বাতিলের ব্যাপারটি কেন ঘটিয়াছে? কেহ কেহ ইহাকে রাজনৈতিক বলিয়াও আখ্যা দিয়াছেন। টিকফা চুক্তি না করা, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রবেশে বাধা, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রভৃতি ইস্যুই আবার সামনে চলিয়া আসিয়াছে। এই ব্যাপারে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বেশ কয়েকবারই বলিয়াছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আমিনুল হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়। কিন্তুু সরকার সেই মামলায় অগ্রগতি দেখাইতে পারে নাই। তখনো প্রচ্ছন্ন হুমকি আসিয়াছে জিএসপি বাতিলের। জিএসপি বাতিল হইবে এমন আশংকা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘদিন ধরিয়াই আলোচনা হইয়া আসিতেছিল। তাহারা অবশ্য, জিএসপির বদলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়াছেন। কারণ, জিএসপির আওতায় বত্সরে বাংলাদেশের যে পরিমাণ রফতানি হইয়া থাকে তাহা খুব বেশি নহে। ইহার চাইতে বরং বাংলাদেশি পোশাক শিল্প যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করিবার জন্য সেইদেশের সরকারকে বেশি হারে শুল্ক দিয়া থাকে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গত বত্সর জিএসপির আওতায় তিন কোটি ৪৭ লাখ ডলারের তামাক, ক্রীড়া সরঞ্জাম, চিনামাটির তৈজসপত্র ও প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করিয়াছেন। তাহাতে শুল্ক ছাড় পাইয়াছেন ২০ লাখ ডলারের মতো। অন্যদিকে, ৪৯০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করিয়া বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে শুল্ক বাবদ দিয়াছেন ৭৩ কোটি ডলার। এইখানে যুক্তরাষ্ট্র নীরব। বাংলাদেশের পক্ষ হইতে লবিষ্ট নিয়োগ করিয়াও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা আদায় করা যায় নাই। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিগণ বরং বারংবার চেষ্টা চালাইয়া যাইতে বলিয়াছেন। আমরাও বলি ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’। সেই শতচেষ্টা চালাইবার পথে জিএসপি বাতিলের প্রভাব কী হইবে তাহা নিয়া বড় ধরনের শংকার কারণ না থাকিলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইহা আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষু্ণ্ন করিয়াছে। শীর্ষ আমদানিকারক দেশটি সুবিধা বাতিল করিবার ফলে অন্যান্য আমদানিকারক দেশগুলিও আমাদের পণ্যের ব্যাপারে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারও অন্যান্য দেশকে চাপ প্রয়োগ করিতে পারে। সেইক্ষেত্রে আমাদের ভবিষ্যত্ রফতানি বাজার হুমকিতে পড়িয়াছে ইহাই সত্যি কথা। আর এই সত্যিটা অনুধাবন করিয়া আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পিছপা হইলে চলিবে না। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বাড়াইবার উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। কারখানার পরিবেশ উন্নয়নেও সরকার এবং গার্মেন্টস মালিকরা কাজ করিতেছে। সরকার শ্রম আইনও সংশোধন করিয়াছে। এইসব ইতিবাচক উদ্যোগগুলি বহির্বিশ্বে প্রচার অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। এইদিকে, জিএসপি বাতিলের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে না বলিয়াই মনে করিতেছেন গার্মেন্টস মালিকেরা। তাহাদের কাহারও কাহারও মতে, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি স্থগিত করিলেও আমদানি বন্ধের কথা বলে নাই। ইহা ছাড়া বিদেশি ক্রেতারা কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি সরেজমিনে দেখিয়াই কার্যাদেশ দিয়া থাকে। বাংলাদেশ সরকারও আশাবাদী যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই সুবিধা ফিরাইয়া দিবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে ইহাকে দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত আখ্যা দিয়া বলা হইয়াছে, জিএসপি বাতিলের এই কঠোর সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সমপ্রসারণে ‘নতুন করে বাধা’ সৃষ্টি করিবে। আমরা তাহা চাই না। আমরা চাই দু’দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হউক। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার কথায় আশ্বস্ত হইতে চাই। তিনি গতকাল গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাইতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলিয়াছেন, ‘শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও জিএসপি সুবিধা পেতে পারে।’ রানা প্লাজা ও তাজরীনের মতো দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকিবার পরামর্শ দিয়াছেন তিনি। নিশ্চয়ই সরকার তাহা করিবে। সেই জন্য প্রয়োজনীয় সময় বিবেচনায় রাখিয়া অতিদ্রুত যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা ফিরাইয়া দিবে- ইহাই আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসাবে ইহা আমাদের দাবিও।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন