[ রা জ নী তি ]

‘অশালীন বক্তব্য ছাড়া শেষ হলো সংসদ অধিবেশন!’

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২১:২৯
আমরা দাবি করছি নারীর ক্ষমতায়নের নামে এভাবে নারীকে আর খাটো করে দেখা নয়। এসব অনির্বাচিত আলঙ্কারিক নারী সাংসদ মনোনয়নের বিধান বাতিল করা হোক। নারী এখন আর অবলা নন যে তাকে হাত ধরে টেনে বসাতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে নারী তাদের যোগ্যতা দেখিয়ে নিজ অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। সুতরাং জাতীয় সংসদে আসতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই আসা উচিত। নির্বাচিত সাংসদদের কেউ কেউ বেপোরোয়া হলেও অশালীন বাক্য ব্যবহারে নিম্নমানের কদর্য আচরণ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম টিভিতে সংসদ অধিবেশন দেখা বয়কট করবো। রোকেয়া সাখাওয়াত, প্রীতিলতা, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমামের দেশে আরেক ধরনের বঙ্গ ললনাদের আবিষ্কার করতে হলো। এদের কেউ কেউ প্রকাশ্য সংসদ কক্ষে এবং টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে যেভাবে অশালীন শব্দে খিস্তি করেন তাতে আমরা নিজেরাই বিব্রত হয়ে পড়ি। ওগুলো দেখার ও শোনার রুচি হয় না। ভাবতে ইচ্ছে হয় বোধ হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি। তাই নিজেদের মানসিক সুস্থতা ও শান্তির জন্য সংসদ অধিবেশনের সমপ্রচার টিভি স্ক্রিনে এলে টিভি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আমার পরিবার। কিন্তু গত ২৪ জুন সোমবার বিকেলে এক টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ শুনতে গিয়ে থমকে যেতে হলো। সংসদ প্রসঙ্গ শুরু করার সময় সংবাদ পাঠিকা বললেন, ‘সোমবার কোনো রকম অশালীন বক্তব্য ছাড়া শেষ হলো সংসদ অধিবেশন।’ কি দুর্ভাগ্য আমাদের এমন সংবাদ শিরোনামও পরিবেশন করতে হয় মিডিয়া কর্মীদের। অর্থাত্ সংবাদ পরিবেশকদের কাছে এটি অবাক করা ঘটনা যে একটি দিবসের সংসদ অধিবেশন শেষ হলো অথচ একজন সাংসদও অশালীন শব্দ উচ্চারণ করলেন না। দিনদুই আগে এক টিভি চ্যানেলের টকশো শুনছিলাম। এর মধ্যে পরপর কয়েকদিন সংসদ উত্তপ্ত ও কলুষিত করে কয়েকজন মহিলা সাংসদ নির্লজ্জ অশালীন শব্দবাণে আঘাত হানছিলেন প্রতিপক্ষের নেতা- নেত্রীদের। টকশোতে উপস্থিত একজন বললেন তার এক আত্মীয়া বলছিলেন টেলিভিশনে সংসদ অধিবেশন সম্প্রচার করলে তিনি টিভি বন্ধ করে দেন। কারণ তিনি চান না এসব দেখে তার ছেলেমেয়েরা ঝগড়া আর অশ্রাব্য বকাঝকা শিখুক। জনগণের সামনে এই হচ্ছে আমাদের আইন প্রণেতাদের একাংশের পারফরমেন্স! আরো দুর্ভাগ্য ও লজ্জার যে, এখন প্রস্তাব আসছে অশালীন বক্তব্য দিলে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা যেতে পারে। ঠিক যেন পাঠশালার বেয়াড়া ছাত্রের জন্য বেত্রদণ্ডের ভীতি ছড়ানো। মাঝে মাঝে মনে হয় দুর্বল গণতন্ত্রের এদেশে এটুকু গণতন্ত্র না থাকলেই বা কি! নব্বই দিন উপস্থিত না থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হোক। কৃত্রিম বা সঙ্গত অভিমান করে বিরোধী দল থাকুক না পুরো কার্যকাল সংসদের বাইরে! বেতন-ভাতাসহ সমস্ত স্বর্গসুখ বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হবে। যখন যে দল বা জোট-মহাজোট সংসদে আসুক এদের সাংসদরাই মুখরিত করবেন মহান সংসদ। নিজেরা মাঝে মাঝে ঝগড়াঝাটি করে বৈচিত্র্য আনবেন। তবুও অমন অশালীন শব্দবাণে আবহাওয়া বিষাক্ত হবে না। আর যদি বিরোধী দল সংসদে আসে তবে অনুরোধ থাকবে সংসদ বিষয়ক টিভি চ্যানেলের প্রচার বন্ধ থাকুক। অন্য টিভি চ্যানেলগুলোরও নীতি নির্ধারণ করতে হবে, তারাও সংসদ অধিবেশনের সচিত্র সংবাদ প্রচার করতে পারবে না। বিষাক্ত আবহাওয়া সংসদ কক্ষের চার দেয়ালেই ঘুরপাক খাক। বাইরের আকাশ-বাতাস আর সাধারণ টিভি দর্শক জীবাণু মুক্ত থাকুক। তবে এতেও যে শেষ রক্ষা হবে তা মনে হয় না। কারণ এসব খিস্তি করা ঝগড়াটে সাংসদরা যেখান থেকে শক্তি ও উত্সাহ পান সে উত্স তো বন্ধ করা যাবে না। আমাদের বড় এবং প্রতিপক্ষ দলগুলোর নেতা-নেত্রী মঞ্চে দাঁড়ালে বা দলীয় কর্মীদের সভায় বসলে অসাধারণ সারল্যে নিজ অবস্থান ও মর্যাদা ভুলে যান। যা বলার নয়—যে শব্দ চয়ন করার কথা নয় তা অবলীলায় বলে নিজেদের পদমর্যাদাকে খাটো করেন। শালীনতা রইলো কি রইলো না তার বাছবিচার না করে ব্যক্তিগত কাসুন্দি ঘাঁটতে থাকেন। স্বামী, সংসার, পুত্র, কন্যা, জন্ম পরিচয় ইত্যাদি নিয়ে রসাত্মক কথা বলে নিজেদের নিম্নরুচির পরিচয় দেন। প্রকাশ্যে এসব বলে যেন আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যেন বলেন—‘কেমন দিলাম’! নিম্নমানের রুচি ও শিক্ষার কোনো কোনো মেঠো কর্মীকে নিজেদের সুরের দোহার বানাতেই যেন আমাদের নেত্রীরা সাংসদের পোশাক পরিয়ে আলংকারিক পদে বসিয়ে দেন। এসব অলংকার খাঁটি সোনা না বিষাক্ত খাদে গড়া তা খুঁজে দেখেন না অথবা পরখ করে খাদকেই দরকারি মনে করেন। সুতরাং এ ধারার সাংসদদের বোধ-বিবেচনা আটকে থাকে নেত্রীকে ঘিরে। দেশের মানুষ যা খুশি ভাবুক তাতে এদের কিছু যায় আসে না। মানুষ ছি ছি করুক, ঘৃণায় থুথু ছিটাক তা তাদের মোটেও ছুঁয়ে যায় না। নেতা-নেত্রীরা খুশি হলেন কিনা এটিই হচ্ছে প্রধান বিবেচনা। কারণ মই বেয়ে উপরে উঠতে হলে নেত্রীর মনঃতুষ্টিই জরুরি। আমাদের ধারণা দলের নেতা-নেত্রীদের মনেও এই ধরনের অশালীন শব্দে কষে ঝগড়া করার মানসিকতা থাকে। কিছুটা চক্ষুলজ্জা থাকায় তা তেমনভাবে সম্ভব হয় না বলে তালবে এলেম রাখেন। যে কারণে আওয়ামী লীগের আলঙ্কারিক সাংসদ অভব্য শব্দে কথা বললে দলীয় সিনিয়র নেতা নেত্রীরা তাদের থামান না। হয়তো মনঃতুষ্টিতে উপভোগ করেন। হতে পারে নম্বরসিট নিয়ে বসে থাকেন। বিপক্ষ দলের সাংসদের অশালীন বক্তব্যের যোগ্য উত্তর দিতে পেরেছেন কিনা সে বিচারে গ্রেড প্রদান করেন। বিরোধী দলে থাকার সুবিধা হচ্ছে এখানে ঝগড়ার মওকা থাকে বেশি। তাই চলমান সংসদে ঝগড়া আর কুিসত শব্দাবলী প্রয়োগের জন্য দক্ষতাসম্পন্ন সাংসদ মনোনীত করতে পেরেছেন বিএনপি নেতৃত্ব। তাই তারা গুডবুকে থাকার প্রতিযোগিতায় অশালীন বক্তব্য প্রদানে নিজেদের রেকর্ড নিজেরা প্রতিদিন ভাঙ্গছেন। দলের সিনিয়র নেতারা তা নির্মোহ দৃষ্টি মেলে শুনছেন। কখনো টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থনও দিচ্ছেন। ব্যক্তি আর পদ এক কথা নয়। কৃতকর্মের কারণে ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিক জায়গা থেকে সমালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু তিনি যখন পদাধিকারী থাকেন তখন পদের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব সকলের। জাতীয় সংসদে স্পিকারের পদটি অত্যন্ত সম্মানিত এবং সকলের উপরে। দলমত নির্বিশেষে এই পদটির সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব সকলের। কিন্তু যখন মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আলঙ্কারিক নারী সাংসদদের কেউ কেউ চেঁচিয়ে মাননীয় স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এই মাইক দে’ তখন লজ্জায় আমাদের মাথা কাটা যায়। খারাপ শোনালেও সেসব দলের নেতা-নেত্রীদের বলতে ইচ্ছে করে শিক্ষা ও রুচিবোধের খোঁজ না নিয়ে কোন জঙ্গল থেকে তালবে এলেম ধরে আনছেন আপনারা? সৌভাগ্যক্রমে বা ঘটনাক্রমে মনোনীত নারী সাংসদের কয়েকজন শিক্ষা ও সংস্কৃতিবোধে শোভন অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু তাদের পক্ষে তো আর পরিবেশ বিষমুক্ত করা সম্ভব নয়! তারাও মনে হয় অসহায়। এই তো সেদিন বিএনপির নারী সাংসদের অঙ্গভঙ্গি ও বচনে যখন ধরণী দ্বিধা হও বলার দশা তখন সাংসদ তারানা হালিম উপায় না দেখে মওদুদ আহমদসহ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করলেন। কিন্তু নেতারা গা করলেন না। নিশ্চুপ থেকে নিজেদের জাত চিনিয়ে দিলেন। এদেশের সাধারণ মানুষ এ অবস্থায় নিশ্চুপ বসে থাকতে পারে না। মানুষ তাদের কষ্টের টাকায় এসব রুচিহীন নিম্নমানের অলংকার পুষতে রাজি নয়। জনগণের ভোটে সাংসদ হয়ে এলে কিছুটা দায়বদ্ধতা থাকতো। এদের তাও নেই। আইন প্রণেতা হিসেবে তারা কী ভূমিকা এপর্যন্ত রাখতে পেরেছেন সংসদের নথি ঘেঁটে তা কি জাতিকে জানাতে পারেন? বাজেট নিয়ে আলোচনায় দাঁড়িয়ে বাজেট সংক্রান্ত দুটো দরকারি শব্দ যোগ করার যোগ্যতা দেখাতে না পারলেও অপ্রাসঙ্গিক এবং অশালীন শব্দমালা প্রকাশ করে সংসদকে ভারাক্রান্ত করতে পারেন। আর নিরুপায় মাননীয় স্পিকার ছয়বার মাইক বন্ধ করেও নিবৃত্ত করতে পারেন না। ফলে আমরা দাবি করছি নারীর ক্ষমতায়নের নামে এভাবে নারীকে আর খাটো করে দেখা নয়। এসব অনির্বাচিত আলঙ্কারিক নারী সাংসদ মনোনয়নের বিধান বাতিল করা হোক। নারী এখন আর অবলা নন যে তাকে হাত ধরে টেনে বসাতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে নারী তাদের যোগ্যতা দেখিয়ে নিজ অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। সুতরাং জাতীয় সংসদে আসতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই আসা উচিত। নির্বাচিত সাংসদদের কেউ কেউ বেপোরোয়া হলেও অশালীন বাক্য ব্যবহারে নিম্নমানের কদর্য আচরণ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তারা তা করতে পারেন না। কারণ এই সাংসদদের দায়বদ্ধতা রয়েছে জনগণের কাছে। ভোটের জন্য আবার তাদের কাছে ফিরতে হবে। জবাবদিহিতার জায়গায় নিজেদের দাঁড় করাতে হবে। মনোনীত নারী সাংসদদের সে দায় নেই বলে কেউ কেউ নিজেদের ভারমুক্ত মনে করেন। সেই সাথে নিজেদের ব্যক্তিগত শিক্ষা-রুচির সংকটতো রয়েছেই। যদিও তোপানলে পড়ার আশংকা রয়েছে তবুও বলবো আমাদের বড় দলগুলোর প্রধান নেতা-নেত্রীদের প্রতিদিন আয়নায় নিজ স্বরূপটি দেখা উচিত। জনগণের সামনে তারা কী শব্দমালা ও বাক্যে কথা বলেন তার স্বমূল্যায়ন করা উচিত। সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন—অনেক আলোকিত। পথের পাশের ক্যানভাসারও এখন তার বচন পাল্টে ফেলছেন। মানুষকে যা খুশি তা বলে বুঝিয়ে আর বোকা বানানো যাচ্ছে না। একারণে এখন আর আগের মত পথের পাশে বা বাজারের কোণায় যাদু, তিন তাসের ভেল্কি অথবা স্বপ্নে পাওয়া দাওয়াইঅলাদের তেমন দেখা যায় না। অথচ নিজেদের পাল্টাতে চাচ্ছেন না আমাদের রাজনীতিকরা। বরাবরের মত করেই জনগণকে বোকা ভাবছেন। নিজ অবস্থানের সাথে বেমানান চটুল শব্দে এক পক্ষের নেতা-নেত্রী অন্য পক্ষের নেতা-নেত্রীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক চরিত্রে কালি ছিটাচ্ছেন। এতে হয়তো ঝগড়ায় জেতার আনন্দে নিজে তৃপ্তি খুঁজে নিতে পারেন কিন্তু বিশ্বাস করা উচিত পাশাপাশি আপনারা সাধারণ মানুষের বিরক্তি উত্পাদন করছেন। আমরা আশা করবো, আমাদের অসীম ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রীরা এবার অন্তত বাস্তবের উঠোনে নেমে আসবেন। কারণ আপনাদের অনুসরণ করতে গিয়ে—আপনাদের বিশেষ মনঃতুষ্টির আশায় শিষ্য-শিষ্যারা যেভাবে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলছেন তার দায়ভার কিন্তু আপনাদের সকলকেই বহন করতে হবে। লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]