প্রসঙ্গ :নারী ও নির্বাচন

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২১:৩০
নির্বাচন ও জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকার গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান। গণতন্ত্রের স্বপ্ন চোখে মেখে স্বাধীনতা অর্জন করেছি বুকের রক্ত আর নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে—কিন্তু জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকার পাওয়ার জন্য হাঁটতে হয়েছে অনেক পথ। অপশক্তির ষড়যন্ত্র, মৌলবাদের কালো থাবা বা সামরিক শক্তিকে ব্যবহারের অপকৌশল বিগত চার দশকে আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নস্যাত্ করার জন্য শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। এখনো মাঝে মাঝেই তাদের বিকৃত দাঁত-নখ দেখিয়ে চলছে। অপশক্তির ধারালো দাঁত-নখের আঘাত জয় করে বারবারই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এই বাংলার জনগণ। বিশেষ করে বাংলার নারী, আপাত নিরীহ কোমল এই নারীটি যেমন শত প্রতিকূলতাকে জয় করে হাল ধরেছেন সংসারের, তেমনি নীরবে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বরবারই তাদের শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন নির্বাচনে, বদলে দিয়েছেন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ। প্রমাণ করেছেন বর্তমান সময়ে নির্বাচনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক বাংলার নারীশক্তি। নারীরা বিবেচনা করেই প্রয়োগ করেন তার ভোটাধিকার । সম্প্রতি ৪টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অন্যের মতামত দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়া ও প্রয়োগ করার ক্ষমতা বলে দিচ্ছে বাংলার নারী গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে জানে। এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম বৃহত্ সিটি করপোরেশন গাজীপুরের নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচারণাকার্য চলছে। এই নির্বাচনে প্রায় ৫ লক্ষাধিক নারী ভোটার অংশগ্রহণ করবেন। এই নারী ভোটারদের বৃহত্তম অংশটি শ্রমজীবী নারী— বিশেষ করে কারখানায় কর্মরত শ্রমিক নারী। এই উপার্জনশীল নারীরা অর্জন করেছেন পেশাগত দক্ষতা, সে সঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতার সু-স্বাদটি সীমিত পর্যায়ে হলেও অনেকটাই গ্রহণ করতে শিখেছেন তারা। নিম্নবিত্ত পরিবারে এই নারীটি এখন অনেকাংশে গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রমিক নারীটি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এবং চেষ্টায় দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে শিখেছেন। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র দায়ভার নিয়ে তাকে শেখায়নি অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যের চক্রটি কি করে সামজ ও রাষ্ট্রে একজন ব্যক্তির অবস্থানকে নির্ণয় করে। রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির জন্য তার প্রতি হাত বাড়ায়নি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও। শুধু ভোটের সময় তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তাদের নির্বাচনী প্রতীক। যে সহজ শক্তিময়ী নিজে এবং পরিবারকে বাঁচানোর জন্য টিকে থাকে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে, তাকে বোঝানো হয় না ধর্মকেও ব্যবহার করা যায় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে। আইন ও সংবিধানে দেয়া তার অধিকারগুলো কি এবং কিভাবে তা আদায় করতে হয়, আর কিভাবেই ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে দূরে সরিয়ে রাখে। মৌলবাদের অপশক্তি এখানেই মিষ্টি হেসে ধর্মের নামে তাকে বিভ্রান্ত করে। নারীকে আবদ্ধ করতে চায় চার দেয়ালের ভেতর। একজন রাজনৈতিককর্মী হিসাবে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করে দেখেছি আমাদের প্রধান দলসমূহের মহিলা অঙ্গ সংগঠনগুলোর কর্মতত্পর নারী নেতাগণ— পাশাপাশি তারা নারী শ্রমিক ভোটার এবং পুরুষদের মাঝে সমহারেই ছড়িয়ে দিতে চাইছেন নিজেদের প্রত্যাশা। যা পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে লক্ষণীয় মাত্রায় অপ্রতুল। ভোটের রাজনীতিতে এর দায়ভাগ অনেক ক্ষেত্রেই দেশের সর্ববৃহত্ দলটিকেই ভোগ করতে হয় মৌলবাদিদের অপপ্রচারের শিকার হয়ে। প্রসঙ্গক্রমে এক শক্তিময়ীর গল্প শোনাই—সরকারি সংস্থায় নিয়োজিত এক শ্রমিকের স্ত্রী রাহেলা, এক কামরার ফ্ল্যাটে ১২ বছর থেকে ৪ বছরের তিনটি সন্তান নিয়ে তার সংসার— রাত পোহালে দিন, আর দিন পোহালে রাত এই ঘেরাটোপে তার জীবন আটকে নেই, কেননা ক্ষয়রোগে ইতিমধ্যেই তার দুই ‘পা’ চলত্শক্তিহীন, দাঁত পড়ে যাচ্ছে চল্লিশের আগেই, দুই হাতের আঙ্গুলও হারাচ্ছে কর্মক্ষমতা— কিন্তু হারায়নি মনোবল। শরীরের অচল অবস্থাকে মেনে নিয়েই ঘোষণা করেছে জীবনের জয়গান, প্রার্থিত প্রার্থীর জন্য ভোট প্রার্থনায় তিনি জানতে চাইলেন: প্রার্থীর সততা ও যোগত্যা সম্পর্কে। উত্সুক হয়ে জানতে চাইলাম সততা ও যোগত্যা কেন প্রয়োজনীয়? উত্তরে তিনি বললেন- যে ব্যক্তিটি আমার প্রতিনিধি হবেন, শত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন তার যোগ্যতা ও সততা বিচার না করে তাকে কেন নির্বাচিত করবো? রাহেলা যাবেন ভোটকেন্দ্রে- সততা ও যোগত্যার প্রতীক নিয়ে। জয় হোক নারীর। লেখক:সহকারী এটর্নি জেনারেল

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন