গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দৈনিক ইত্তেফাক ফলমূলে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ‘আমে বিষ : কখন কোথায় কিভাবে’ শিরোনামে পত্রিকাটির ১৫ জুনের এক বিশেষ প্রতিবেদনের ফাইন্ডিংস হলো—এক. সাধারণ চাষিরা নয়, আমে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট; দুই. বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত আম আর বিষ খাওয়ার মধ্যে খুব তফাত নেই; এবং তিন. অসময়ে আম কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অধিক সচেতন হওয়া দরকার। কেমিক্যালযুক্ত আম মানবদেহের জন্য কি মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ১৭ জুনের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত আম খাওয়ার ফলে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারসহ নানা মরণব্যাধি দেশে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। এছাড়া বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়ার পেছনেও কেমিক্যালযুক্ত ফলসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দায়ী। মুকুল আসার পর থেকে ফল পাড়ার আগ পর্যন্ত বাগান কিনে নেয়া ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ফড়িয়ারা লিচুতে কত প্রকার কীটনাশক মেশান এবং ফল পাড়ার পর তা তরতাজা ও টাটকা রাখতে কি পরিমাণ ফরমালিন ব্যবহার করেন তার একটি চিত্র ১৮ জুনের এক প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে। উল্লেখ্য, গত বছর এ সময়ে কীটনাশক দেয়া লিচু খেয়ে দিনাজপুরে ২ থেকে ৬ বছর বয়সের ১৪ জন শিশুর মৃত্যুর খবর জনগণ এখনো ভুলেনি। ক্ষতিকর কেমিক্যালের হাত থেকে রেহাই পায়নি জাতীয় ফল কাঁঠালও। ১৯ জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকাতে ও পচন রোধে নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল এবং ফরমালিন মিশ্রিত পানিতে চুবানো হচ্ছে কাঁঠাল। আনারস গাছে ফুল আসা থেকে শুরু করে ফল তোলার আগ পর্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক এবং ফল তোলার পর ফরমালিনের ব্যবহার নিয়ে ২০ জুন প্রকাশিত হয়েছে একটি প্রতিবেদন। কলা পাকাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ডিডিটি ও অন্যান্য কেমিক্যাল মেশানো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ২২ জুন। দেশে উত্পাদিত ফলমূলে ব্যবহারের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিক কিভাবে আনা হচ্ছে তা নিয়ে ২১ জুন পত্রিকাটিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বরাত দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের ২৭টি প্রতিষ্ঠানকে কৃষিজ ফসলের উত্পাদন বাড়াতে বিভিন্ন হরমন আমদানির অনুমোদন দেয়া আছে। কিন্তু ৬টি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফল পাকানোর বিষাক্ত রাসায়নিক অবৈধভাবে দেশে আনছে।
শুধু দেশি ফল নয়, বিদেশ হতে আমদানি করা ফল টাটকা রাখতে এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। ইত্তেফাকের ২৩ জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একশ্রেণির অসাধু ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী আমদানি করা মাল্টা কেমিক্যাল ও ফরমালিন মিশ্রিত পানিতে চুবিয়ে কিংবা স্প্রে করে গুদামে রেখে দেন। ওই মাল্টা মাসের পর মাস রেখে দিলেও পচন ধরে না। ‘রাসায়নিক ছাড়া একটি আপেল পাওয়া যাবে না বাজারে’ শিরোনামে ২৪ জুনের এক প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে আপেল আমদানি করে আনার পর আড়তে উঠানো হয়। সেই আপেল সাধারণত দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের বেশি সময় রাখা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন রেখে বিক্রির জন্য ও পচন রোধে কেমিক্যাল ও ফরমালিন সংমিশ্রণে তৈরি বিষাক্ত উপাদান স্প্রে করে আড়তের আলাদা ঘরে রেখে দেয়া হয় আপেল।
এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে পত্রিকাটি সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ফরমালিনসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ফলমূল জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে এবং তা প্রতিরোধে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই অবস্থা? ফলমূল বিষাক্ত কেমিক্যাল ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ থেকে মুক্ত রাখার কোনো আইন দেশে নেই কি? থাকলে তার প্রয়োগ হচ্ছে না কেন?
দেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রধান আইনটি হলো ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ। এটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত সংশোধিত। এই আইনে চাল, গম, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদির সঙ্গে ফল খাদ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত। অন্যান্য খাদ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে যেসব আইনি পদক্ষেপ গ্রহণীয়, সেগুলো সমভাবে ফলমূলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজে বা অপরের মাধ্যমে (ক) এমন কোনো বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা উপাদান বা রঞ্জকদ্রব্য বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন ও কীটনাশকের মতো এমন কোনো পদার্থ বা স্বাদগন্ধযুক্ত কোনো দ্রব্য খাদ্যে মেশাবেন না, যা মানবদেহের ক্ষতিসাধন করতে পারে; (খ) এমন কোনো খাদ্য বিক্রি করবেন না, যাতে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা উপাদান বা রঞ্জকদ্রব্য বা ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন ও কীটনাশকের মতো এমন কোনো পদার্থ বা স্বাদগন্ধযুক্ত কিছু মেশানো হয়েছে, যা মানবদেহের ক্ষতি করতে পারে। কোনো ব্যক্তি আইনের উপর্যুক্ত বিধানাবলী ভঙ্গ করলে তাকে পাঁচ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে।
এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪- এর আওতায় খাদ্য ও পানীয়তে ভেজাল মেশানোর জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯-এর অধীনে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
মানুষের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা অন্য কোনো পদার্থ ফলমূলে মেশানো বন্ধ করতে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট ২০১১ ও ২০১২ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিসের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এরূপ নির্দেশ দেয়। কিন্তু অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, উপর্যুক্ত আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ফলমূলে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অন্যান্য দ্রব্য মেশানো বন্ধ হচ্ছে না কেন? এর উত্তরে বলা যায়, ফলমূলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যারা ফলমূলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোসহ খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণের জন্য মূলত দায়ী, সেসব রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার চুনোপুঁটি খুচরো বিক্রেতার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে গুটিকয়েক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এসব রাঘববোয়ালের ক্ষমতার ভিত খুব শক্তিশালী। তাদের রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। এদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সক্রিয় সদস্য। অন্যরা নানাভাবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে। সেজন্য ফলমূলে বিষাক্ত রাসায়নিকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহারের জন্য এসব মূল হোতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার উদাসীন।
এক বছরের বেশি সময় ধরে শোনা যাচ্ছে, বাজারে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহে সরকার বিদ্যমান বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯-এর স্থলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন নামে একটি আইন প্রণয়ন করবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেয়া খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আইনটির খসড়ায় ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠনের সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটির মূল কাজ হবে ফলমূলসহ নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সমন্বয়হীনতা দূর করা। এদিকে পত্র-পত্রিকার সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, নতুন নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে পরস্পর বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দাবি হচ্ছে, অতীতের ন্যায় নিরাপদ খাদ্য কার্যক্রম আগে যেসব সংস্থার উপর ন্যস্ত ছিল তা বহাল রাখতে হবে। এ বিবাদে সময়ক্ষেপণের ফলে আদৌ নতুন করে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফলমূলসহ নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী যে কোনো আইন প্রণয়নকে জনগণ স্বাগত জানাবে। যতদূর জানা যায়, প্রস্তাবিত আইনের খসড়া এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়নি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে আইন হিসেবে পাসের জন্য এটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকট বিরাজমান অবস্থায় আইনটির প্রণয়ন নিয়ে জনমনে রয়েছে সংশয়। আর যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার তা হলো, প্রস্তাবিত নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়নের অপেক্ষায় থেকে সরকার সংশোধিত বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯সহ প্রাসঙ্গিক অন্য সব আইন বাস্তবায়নে নির্লিপ্ত থেকে জনস্বাস্থ্যকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে তা কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারে না।
লেখক :সাবেক সচিব ও কলাম লেখক
E-mail:latifm43¦gmail.com
