উচ্চশিক্ষার বাজেট ও বাস্তবতা

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৩, ২১:৪৪
চলছে জাতীয় সংসদের অধিবেশন। চলতি অধিবেশনেই আগামী অর্থ বছরের জন্য জাতীয় বাজেট পাস করা হবে। জাতীয় বাজেটের আকার প্রতিবছরই বাড়ছে। সে হিসেবে প্রতি বছরের ন্যায় উচ্চশিক্ষায়ও যে বাজেট বরাদ্দ কিঞ্চিত্ বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই। তবে এই বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিও দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানকে নিশ্চিত করতে পারে না। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (বিমক) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.২ শতাংশ। ২০০১-২০০২ অর্থ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাখাতে মঞ্জুরির পরিমাণ ছিল শিক্ষা বাজেটের এবং জাতীয় বাজেটের যথাক্রমে ৭.৮৫ ও ০.৭৫ শতাংশ। ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাখাতে মঞ্জুরির পরিমাণ শিক্ষা বাজেটের এবং জাতীয় বাজেটের যথাক্রমে ৮.২২ ও ০.৮৪ শতাংশ। এই সরকারি মঞ্জুরিই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অর্থ প্রাপ্তির মূল উত্স। সরকার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ চলে যায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। বাকি টাকা ব্যয় হয় গবেষণার কাজে। অর্থ সংকটে অনেক যুগোপযোগী গবেষণাও করা সম্ভব হয় না। আবার অনেকক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হয়। ২০১০-২০১১ অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য মোট ১০৯১.২২ কোটি টাকা সরকারি মঞ্জুরি বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে বেতনভাতা, পেনশন, অন্যান্য মঞ্জুরি ও মূলধন মঞ্জুরি বাবদ ১০৮৫.২২ কোটি টাকা এবং মেরামত ও গবেষণা মঞ্জুরি খাতে ৬.০০ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য ২০১১-২০১২ অর্থ বছরের বাজেটে মোট ১১২৯.৫৩ কোটি টাকা সরকারি মঞ্জুরি বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে বেতনভাতা, পেনশন, অন্যান্য মঞ্জুরি ও মূলধন মঞ্জুরি বাবদ ১১২২.৫৩ কোটি টাকা এবং মেরামত ও গবেষণা মঞ্জুরি খাতে ৭.০০ কোটি টাকা (বিমক বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০১১)। উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে সেটা জোর দিয়ে বলা অসম্ভব। তবে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বাজেটের বরাদ্দের পাশাপাশি বাজেটের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা জরুরি। উল্লেখ্য, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সরকার কোন ধরনের অর্থ বরাদ্দ দেয় না। সেগুলো নিজস্ব অর্থায়নেই পরিচালিত হয়ে থাকে। উন্নত জাতি বিনির্মাণে শিক্ষার বিকল্প নেই, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ও এর সুবিধা সর্বত্র পৌঁছে দেয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ শিক্ষা পাঠক্রমের আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে সচেষ্ট থাকলেও সীমিত অর্থ দ্বারা তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সীমিত আকারে শ্রেণিকক্ষ উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও গবেষণাগার সমৃদ্ধকরণের কাজ চলছে। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। এর আওতা সম্প্রসারণ করে তরুণ শিক্ষকদের বুনিয়াদী ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য বেতন কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি। ঢাকা আর ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্নাতকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের স্বল্পতা, অবকাঠামোগত সমস্যা ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে তারা যখন ঢাকা, বুয়েটের গ্রাজুয়েটদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে তখন এই বৈষম্যটি চোখে পড়ে। শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ফেলোশিপ ও বৃত্তি বাড়ানো দরকার। একজন পিএইচডি গবেষকের জন্য মাসিক ৫০০০ বা ২০০০ টাকা বরাদ্দ রেখে কি গবেষণা হবে তা একবার ভেবে দেখা দরকার। একুশ শতকের একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সরকার বা মঞ্জুরি কমিশন থেকে প্রায়ই বলা হয়। সেটা সব সময় সম্ভব হয় না। কেননা যে বিশ্ববিদ্যালয় সদ্য প্রতিষ্ঠিত সে নিজেই সমস্যা কবলিত, সে কিভাবে আয় করবে। ছাত্রদের বেতন বাড়িয়ে খুব বেশি কিছু করা যায় না। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে কিছু উদ্যোগ নেয়া যায়। দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। অনেকে উচ্চতর গবেষণা শেষে দেশে ফিরে সহায়ক পরিবেশ না পাওয়ায় অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারেন না। শিল্পের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ বাড়ানো দরকার, যাতে অযথা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দরকার না হয়। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা জোরদার করা দরকার। দেশীয় শিল্পে আমাদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উচ্চতর গবেষণার প্রায়োগিক দিক সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। পিএইচডি যেন শুধু পদোন্নতির জন্য না হয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষা বিনিময় সংক্রান্ত বিষয়াদির আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। লেখক:ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন