যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বহুল আলোচিত অভিবাসন সংস্কার বিলটি অবশেষে পাস হইয়াছে। এখন উহা প্রতিনিধি পরিষদে অর্থাত্ মার্কিন কংগ্রেস বা আইন পরিষদের নিম্নকক্ষের অনুমোদন লাভ করিলে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত এক কোটি দশ লক্ষ মানুষের ভাগ্য খুলিয়া যাইবে। এই বিলটি প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন লাভ করিলে আইনে পরিণত হওয়ার পথে আর কোন বাধাই থাকিবে না। আর সেক্ষেত্রে ঐ বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বা নাগরিকত্ব লাভের অধিকার অর্জন করিবে। এই বিলটি লইয়া বিগত অনেকগুলি বত্সর যাবত্ যুক্তরাষ্ট্রে তর্ক-বিতর্ক ও বাক-বিতণ্ডা চলিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র তাবত্ বিশ্বের কর্মনিষ্ঠ ও সৃজনশীল মানুষের নিকট বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উহার বিপুল সম্পদশালিতা এবং শক্তিময়তার জন্য শুধু প্রসিদ্ধই নহে সকলের নিকট আকর্ষণীয়ও বটে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকেই ‘সব পেয়েছির দেশ’ রূপে গণ্য করিয়া থাকে। অভাবগ্রস্ত কর্মনিষ্ঠ ও সৃজনী প্রতিভার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাইয়া সেখানে স্থায়ী ঠিকানা গড়িয়া তুলিবার জন্য তাই এতো ব্যাগ্র-ব্যাকুল।
যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর হাতেগোনা দুই-চারিটি দেশের অন্যতম, যে দেশটিকে ইমিগ্র্যান্টদের দেশ হিসেবে অভিহিত করা হইয়া থাকে। প্রকারান্তরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মনিষ্ঠ ও সৃজনশীল মানুষেরা সেখানে গিয়া নিজেদের শ্রম ও মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পায় আর সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সকল বিচারেই বিশ্বের অগ্রগণ্য দেশরূপে বিবেচিত হয়। একটি মাল্টিরেসিয়াল ও মাল্টিকালচারাল সোসাইটির বুনিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে শক্তরূপে গড়িয়া উঠিয়াছে উহা বিস্ময়কর। মেধা-মনন কাজে লাগাইয়া আত্মোন্নয়নের এমন অবারিত সুযোগ বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া ভার। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণপ্রথা খুবই প্রকট রূপ ধারণ করিয়াছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতো মানবদরদী মহত্প্রাণ মানুষের নেতৃত্বে সেই জঘন্য প্রথার উচ্ছেদ সম্ভব হইয়াছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়িয়া তোলার পশ্চাতে ইহার যে পিতৃপুরুষেরা তাহাদের মেধা-মনন এবং চিন্তা-চেতনাকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন উহারই পরিচর্যা আর অনুশীলনের মধ্য দিয়া একটি সহনশীল সমাজ কালক্রমে সেখানে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। ক্রীতদাস প্রথার উচ্ছেদসাধনকে কেন্দ্র করিয়া যে গৃহযুদ্ধ এবং উহার পূর্বে ইহার অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে যে স্বাধীনতা যুদ্ধ সেখানে সংঘটিত হইয়াছিল উহার সাফল্যের মধ্য দিয়াই কালক্রমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের নিকট স্বপ্নের দেশ হইয়া উঠিয়াছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সকল দেশের সকল শ্রেণি-পেশা-বর্ণ-ধর্মের মানুষ আসিয়া একাকার হইয়া গিয়াছে। ইহাকেই বুঝি রবীন্দ্রনাথ ‘এক দেহে লীন’ হইয়া যাওয়া বলিয়াছেন। এম্নিভাবে প্রতি বত্সরই হাজার হাজার মানুষ মার্কিন মুলু্লকে পাড়ি জমায়। ‘সোনার হরিণ’ ধরিবার দুরন্ত বাসনায় বৈধ-অবৈধ পথে স্বপ্নের আমেরিকায় গিয়া ডেরা বাঁধে। যুক্তরাষ্ট্রও একটি মেল্টিংপটের মতো সকলকেই উহার কোলে আশ্রয় দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোগ্রাফিক ভারসাম্য রক্ষার্থ ডিভি লটারী প্রবর্তনের ফলে বিভিন্ন দেশের এমনকি বাংলাদেশেরও বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য সেই দেশের স্থায়ী বাসিন্দা হইবার পথ খুলিয়া গিয়াছে। যাহারা অবৈধ পন্থায় সেখানে বিভিন্ন সময়ে গিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র বহুবারই এ্যামনেস্টি ঘোষণা কিংবা নূতন কোন বিল বা আইনের আওতায় তাহাদেরকেও সেখানে নিঃসংকোচে ঠাঁই দিয়াছে। এবারও এক কোটিরও অধিক মানুষ সেই সুযোগ লাভ করিতে চলিয়াছে। বর্তমানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নিজেও মন্দার শিকার সেখানে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের বাড়তি বোঝা বহনের শক্তি ও সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্র কোথা হইতে পায় ইহাও অনেকের মনের প্রশ্নই বটে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন কর্মপটু ও সৃজনশীল মানুষের তথা উত্পাদনশীল জনগোষ্ঠীর চাহিদা সেখানে সর্বদাই থাকিয়া যাইবে উহার বিপুল সম্পদশালিতার কারণে। আর সুদীর্ঘ ও সুমহান ইতিহাসের সংগ্রামী পথ বাহিয়া যুক্তরাষ্ট্র যোগ্য মানুষের অপরিমেয় শক্তিতে পরিপূর্ণভাবে আস্থাশীল হইয়া উঠিতে পারিয়াছে বলিয়াই আজ কৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামা সেখানকার প্রেসিডেন্টের পদে অধিষ্ঠিত হইতে পারিয়াছেন।
