[ অ র্থ নী তি ]

দারিদ্র্য কি সত্যিই কমছে

আপডেট : ৩০ জুন ২০১৩, ২১:৪৭
গত ২১ জুন দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকে ব্যানার হেডিং দিয়ে এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের অর্জন ‘বিরল’ ও ‘উল্লেখযোগ্য’। বিশ্বব্যাংকের ‘দারিদ্র্য মূল্যায়ন প্রতিবেদনের’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যকে এ রকম উচ্চ প্রশংসাসূচকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এদিকে একই দিনের প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার নিচের দিকে কিছুটা ছোট হেডিং দিয়ে প্রকাশিত আরেকটি খবরে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে ‘আয় দারিদ্র্য’ যে হারে কমেছে ‘খাদ্য দারিদ্র্য’ সেই হারে কমেনি। বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির যে তেমন একটা উন্নতি হয়নি, অনেকটা সেরূপ মূল্যায়নই এই খবরে তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় মূল্যায়নটি উপস্থিত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্বের একটি প্রভাবশালী সংস্থা ইফপ্রি (ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর গবেষণালব্ধ তথ্য অবলম্বনে। দু’টি খবরে বিপরীত ধরনের দু’রকম ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। উভয় খবরেই নানারকম পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়টিও বেশ লক্ষণীয় যে, বেশিরভাগ পত্রিকা দ্বিতীয় খবরটি প্রকাশ করেনি। মানুষের জন্য মুশকিল হলো, সে কোন্ খবরের ধারণাটিকে বিশ্বাস করবে? দারিদ্র্য পরিস্থিতির আশাতীত উন্নতির খবরকে সে সত্য বলে মনে করবে, নাকি দারিদ্র্য পরিস্থিতির যে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি কথাকে সত্য বলে ধরে নিবে? অনেক সময় তথ্যের উপস্থাপনার কায়দার ওপর নির্ভর করে যে, তা থেকে কি ধারণার জন্ম হবে। যেমন, একই সত্যকে দুইভাবে উপস্থাপন করা যায়। গ্লাসের অর্ধেকটা পূর্ণ রয়েছে। আবার একই বাস্তবতা সম্পর্কে বলা যায় যে, গ্লাসের অর্ধেকটা খালি আছে। দু’টি উপস্থাপনাতেই ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই বাস্তবতার ‘সঠিক’ প্রতিফলন থাকলেও তা থেকে বিপরীত দু’ধরনের ধারণার জন্ম হয়। তাছাড়া ‘পরিসংখ্যান’ ব্যাপারটি খুবই প্যাঁচালো একটি বিষয়। তাকে নানাভাবে ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ধারণার জন্ম দেয়া যায়। সত্য তথ্য থেকেই জন্ম দেয়া যায় মিথ্যা ধারণার। অনেকে বলে থাকেন যে, মিথ্যা তিন ধরনের হতে পারে— (ক) মিথ্যা, (খ) ডাহা মিথ্যা এবং (গ) পরিসংখ্যান। বিশ্বব্যাংকের ‘দারিদ্র্য মূল্যায়ন প্রতিবেদনে’ ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, প্রতিবছর বাংলাদেশের দারিদ্র্য কমেছে ১.৭ শতাংশ হারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও ১০ বছরে দরিদ্র কমেছে ২৬ শতাংশ। ২০০০ সালে যেখানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৭০ লাখ, ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখে। অর্থাত্ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে ২ লাখ। (এদিকে বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর তার উদ্বোধনী ভাষণে জানিয়েছেন যে, ১০ বছরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে ১ কোটি ৬০ লাখ। কোন্ তথ্যটিকে বিশ্বাস করবো?) বলা হয়েছে যে, ২০১০ সালে জনসংখ্যার ৩১.৫ শতাংশ মানুষ ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। বছরে ১.৭ শতাংশ দারিদ্র্য হ্রাসের হার অব্যাহত থাকলে ২০১৩ সালের শেষে তা ২৬.৫১ শতাংশের নিচে নেমে আসবে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী যে টার্গেট কিনা ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জন করার কথা। নির্ধারিত সময়ের দু’বছর আগেই দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কি কম কৃতিত্বের কথা? এদিকে ইফপ্রি-র জরিপের তথ্য বলছে যে, ২০০৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে (৬ বছরে) ৪.২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। অর্থাত্ দারিদ্র্য হ্রাসের হার বছরে মাত্র ০.৭ শতাংশ। আর অতিদরিদ্র অবস্থা থেকে এ সময়কালে (৬ বছরে) বেরিয়ে আসতে পেরেছে মাত্র ১.৪ শতাংশ মানুষ (অর্থাত্ বছরে ০.২৩ শতাংশ)। ইফপ্রি অবশ্য শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা দারিদ্র্যসীমার হিসাবটি করেছে একজন মানুষের দৈনিক খাদ্যশক্তি (ক্যালরি) পাওয়ার সামর্থ্যের হিসাবে, দৈনিক আয়ের পরিমাণের হিসাবে নয়। খাদ্য সামর্থ্য ও আয় সামর্থ্য দু’টি বিষয় এক নয়। আয় ১০ টাকা বাড়লেও খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যও যদি ১০ শতাংশই বাড়ে, তাতে একজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একই থাকে। ফলে এমন অবস্থায় দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও কোনো হেরফের হয় না। ২০০১-১২ সালে চালানো ইফপ্রি-র এই জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৩৪ শতাংশ কৃষকই ধান চাষে লাভ পায় না। বাংলাদেশের ৩৬ শতাংশের চেয়ে বেশি শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন নিয়ে বেড়ে উঠছে। ৪১ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি থেকে বের হতে পারছে না। ৯০ শতাংশ শিশুর রক্তশূন্যতা রয়েছে। ৩৩ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২,১২২ কিলোক্যালরি পর্যন্ত খাদ্যশক্তি গ্রহণের সামর্থ্য রাখে (দরিদ্রের পরিমাপক) এমন মানুষের সংখ্যা ২০০৫ সালে ছিল ৩৯.৫ শতাংশ। সে সময় ১,৮০৫ কিলোক্যালরি পর্যন্ত খাদ্যশক্তি পাওয়ার সামর্থ্য সম্পন্ন (অতিদরিদ্রের পরিমাপক) মানুষের সংখ্যা ছিল ১৭.৯ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে খাদ্য কেনার সামর্থ্য তথা আয় বৃদ্ধির পরিমাণকে হিসাবে নিলেও বাস্তবে কি পরিমাণ খাদ্যশক্তি প্রকৃতভাবে গ্রহণ করা হয় তা হিসাবে নেয়া হয়নি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে খানাভিত্তিক জরিপ চালিয়ে ইফপ্রি-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, খাদ্য-দরিদ্রের সংখ্যা ৬ বছরে ৩৯.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০১১ সালে হয়েছে ৩৫.৩ শতাংশ। আর হতদরিদ্রের সংখ্যা ১৭.৯ শতাংশ থেকে কমে ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬.৫ শতাংশে। দারিদ্র্য হ্রাসের হিসাবে বিশ্বব্যাংক ও ইফপ্রি-র প্রদত্ত তথ্যের পার্থক্য খুবই স্পষ্ট। দারিদ্র্যের সংজ্ঞায়নে সামান্য হেরফের পরিসংখ্যানকে কি বিপুলভাবে এদিক-ওদিক করে দিতে পারে উপরোক্ত বিবরণ থেকে তা বেশ স্পষ্ট। ইফপ্রি-র এদেশীয় পরিচালক বলেছেন, ‘পরিসংখ্যান ব্যুরো যতো বেশি হারে দারিদ্র্য হ্রাস হচ্ছে বলে বলছে, বাস্তব অবস্থা তেমনটা নয়। খাদ্যশক্তি গ্রহণের সূচকের ভিত্তিতে বিবেচনা করলে দারিদ্র্য হ্রাসের পরিমাণ সরকার ঘোষিত হারের অর্ধেকেরও কম।’ ইফপ্রি-র জরিপে বলা হয়েছে যে, দেশের এক তৃতীয়াংশ কৃষকের নিজস্ব কোনো জমিই নেই; অর্থাত্ তারা ভূমিহীন কৃষক। এই ভূমিহীনরাসহ মোট ৪০ শতাংশ কৃষক অন্যের জমি চাষ করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরাই একরপ্রতি এবং মোট উত্পাদন করে বেশি। কিন্তু সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ ও ঋণ সুবিধার বেশির ভাগটা তাদের বদলে পায় বড় কৃষকরা। ৩৪ শতাংশ কৃষককেই উত্পাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দ্বারা দেশের যে ৪৫ শতাংশ মানুষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়, তার অর্ধেকই (২২ শতাংশ) সচ্ছল মানুষের পকেটে চলে যায়। ইফপ্রি-র জরিপের এসব এবং অন্যান্য তথ্য থেকে এই ধারণাই স্পষ্ট হয় যে, দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এখনো গুরুতর। দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য মতো মোটেও ‘বিরল’ ও ‘উল্লেখযোগ্য’ নয়। দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা ও তর্ক-বিতর্কের কোনো শেষ নেই। বৃটিশ ঔপনিবেশিক সরকার দাবি করতো যে তাদের শাসনের ফলে দারিদ্র্যক্লিষ্ট ভারতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ‘উল্লেখযোগ্য’ হারে হ্রাস পাচ্ছে। পাকিস্তানি শাসকরা দারিদ্র্য হ্রাসে তাদের সাফল্যের জন্য গোল্ড মেডেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখে বলে দাবি করতো। স্বাধীন বাংলাদেশের সব সরকারই সব সময় দাবি করেছে যে, তাদের একটি প্রধান সাফল্য হলো ‘উল্লেখযোগ্য’ হারে দারিদ্র্য হ্রাস করতে পারা। বৃটিশ ও পাকিস্তানের শাসনকালের ব্যাপ্তি দুইশ’ বছরের বেশি। সেই দুইশ’ বারো বছরে যদি ০.৩ শতাংশ হারেও দারিদ্র্য হ্রাস পেত, তাহলে এতোদিনে এদেশ শূন্য দারিদ্র্যের দেশে পরিণত হতো। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরেও যদি বছরে ১.২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমানো হতো, তাহলেও আজ আমাদেরকে ‘দারিদ্র্য’ সমস্যা নিয়ে ভাবতে ও কথা বলতে হতো না। দারিদ্র্য ‘হ্রাসের’ অতি প্রয়োজনীয় এই কাজটির বিষয়ে কাজের কাজ অতিসামান্যই হয়েছে। অথচ দারিদ্র্য বিমোচন বা দারিদ্র্য হ্রাস নিয়ে কথাবার্তা ও হৈ-হুল্লোড় হয়েছে বিস্তর। এই বিষয় নিয়ে সেমিনার, কমিশন, রিপোর্ট প্রণয়ন, জরিপ কাজ ইত্যাদি করতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে কত শতাংশ দারিদ্র্য হ্রাস করা যেতো, সেটিও একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে। সমাজে দারিদ্র্য বিরাজ করাটাকে অস্বাভাবিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেয়া হয়। দারিদ্র্য পরিস্থিতি ‘বিমোচনের’ কথা তেমন জোরালোভাবে না বললেও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে ‘সহনীয়’ পর্যায়ে রাখার বিষয়ে শাসক-শোষকদেরকে তাই কথা বলতে হয়। দরিদ্র মানুষদের প্রতি মানবিকতা থেকে যতোটা না এটি উত্সারিত, তার চেয়ে বেশি তা দরিদ্র মানুষদের বিদ্রোহের ভয় থেকে সৃষ্ট। গরিব মানুষ বিদ্রোহ করলে শোষণের পুঁজিবাদী কাঠামো গোটাটাই ধসে পড়তে পারে। তাই, দারিদ্র্যকে এমন পরিমাণে সীমিত রাখতে হবে যাতে বিদ্রোহ-বিপ্লব না ঘটে। অগণিত প্রজেক্ট চালু করে দারিদ্র্য দূর করার মূলা ঝুলিয়ে রাখা ও সাথে সাথে এসব প্রজেক্টের নামে কিছু তাঁবেদার লোকের জন্য টু-পাইস কামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা তারা করে চলেছে। বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যম, প্রতিষ্ঠান ও মহলের যতো হৈ-চৈ তা প্রধানত এসব নিয়েই। গবেষণা করলে হয়তো দেখা যাবে যে, দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত দেশের শাসক শ্রেণি সরকারিভাবে বা এনজিওদের মাধ্যমে যতো টার্গেট নেয়া হয়েছে, তাতে দেশের মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যার চেয়ে দশগুণ বেশি মানুষের দারিদ্র্য-জাল থেকে মুক্ত হয়ে সচ্ছলতায় উত্তরণ ঘটার কথা। শোষক শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ও সমাজে সব সময়ই দারিদ্র্য লাঘবের কর্মসূচি থাকে। গরিবকে ভিক্ষা দাও, সাহায্য করো—এই ধরনের উদার মানবিক আহ্বান ও শিক্ষা যুগ যুগ ধরে সমাজে প্রচলিত রয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দরিদ্রদের জন্য ‘নিরাপত্তা বেষ্টনীর’ কার্যক্রম আজকাল বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম, আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ চতুর্দিকে প্রজেক্টের অন্ত নেই। বছরের পর বছর ধরে এসব কর্মকাণ্ড চলছে। কিন্তু এতোসবের পরেও দারিদ্র্য দূর হয় না। এক-আধবার সাময়িকভাবে হ্রাস পেলেও পরক্ষণেই প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে সব অর্জন প্রায় ধুয়েমুছে আগের অবস্থা ফিরে আসে। এক হাতে দারিদ্র্য কমানোর কাজ চললেও দশ হাতে চলে দারিদ্র্য পুনরুত্পাদনের কাজ। দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাটির ভিত্তি যেহেতু ক্রমাগতভাবে দারিদ্র্য সৃষ্টি করা, তাই যেমন কিনা ভাঙ্গা কলসে যতোই পানি ঢালা হোক কলস কখনো ভরে না, দারিদ্র্য কমানোর শত শত প্রজেক্ট সত্ত্বেও দারিদ্র্য কোনোদিন শেষ হয় না। সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে দারিদ্র্য পরিস্থিতির মাঝে থাকতে বাধ্য করাটা একদিকে যেমন পুঁজিবাদের ফলাফল, তেমনি তা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার আবশ্যক পূর্বশর্ত। শোষণের পরিণতিতে দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। আবার কম দামে মানুষের শ্রমশক্তি কিনে নিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাত্ করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত মুনাফা বৃদ্ধির জন্যও বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের উপস্থিতি অপরিহার্য। সে কারণেই পুঁজিবাদ এবং বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের উপস্থিতির নিশ্চয়তা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। দারিদ্র্যের পরিমাপ করা হয় মানুষ কর্তৃক বস্তুগত উপাদান ভোগ করার সংগতি শক্তির মাপকাঠি দিয়ে। আয়-উপার্জন, খাদ্য গ্রহণ সামর্থ্য, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্তি, গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুর হার ইত্যাদি সূচক দিয়ে একজন মানুষ দরিদ্র না সচ্ছল—তার পরিমাপ করা হয়ে থাকে। দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য কোন্ সূচকটিকে অগ্রাধিকারমূলকভাবে বিবেচনায় নেয়া উচিত, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। একেক সূচকের ভিত্তিতে পরিমাপ করলে দারিদ্র্যের হার ও তার হ্রাস-বৃদ্ধির হার একেক রকম হবে। কিন্তু দারিদ্র্যের বোধ বা উপলব্ধি কি শুধু বস্তুগত উপাদান প্রাপ্তির সংগতি দ্বারা নির্ধারণ করা যায়? আদিম বর্বর যুগে গুহাবাসী মানুষের বৈষয়িক ভোগের মাত্রা, গড় আয়ু ইত্যাদি সবই ছিল বর্তমানের তুলনায় অতি নিচু মাত্রায়। কিন্তু সকলের ভোগ সক্ষমতা ছিল একই মাত্রার। সে সমাজের কেউ কাউকে দরিদ্র বলে বিবেচনা করতো না। ‘দরিদ্র মানুষ’ বলে কোনো ধারণাই সমাজে সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ সে কারণে তখন ছিল না। এখনকার সমাজে একজন দরিদ্র মানুষ (আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি আমেরিকা-ইউরোপেও) সে সময়ের যে কোনো মানুষের তুলনায় শতগুণ বেশি বৈষয়িক বস্তু ভোগ করে। তা সত্ত্বেও তারা দরিদ্র বলে বিবেচিত এ কারণে যে, তাদের প্রাপ্তির সক্ষমতা সমাজের উপর তলার কিছু বিত্তবান মানুষের তুলনায় সহস্রভাগের একভাগও না। সুতরাং দারিদ্র্যের উপলব্ধি ও ধারণার প্রকৃত উত্স হলো বৈষম্য। সমাজে অতি কুিসত হারে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের পরিমাপ থেকে কি এ বিষয়ে কেউ আপত্তি করতে পারবে যে, আমাদের দেশে ‘দারিদ্র্য’ হ্রাস নয়, বরঞ্চ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে? লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন