বাংলাদেশে এখন রাজনীতি যেন ভীষণ খারাপ কাজ। আসলে কি রাজনীতি খারাপ না রাজনীতিকে খারাপ বানানো হয়েছে? এই যে অনীহা রাজনীতির প্রতি সেটা কেন? সাধারণ জনগণের মনে এই অনীহাটা কে এনেছে? তবে বাংলাদেশে কি ভালো রাজনীতিবিদ নেই? রাজনীতির মহাপুরুষরা কি কখনোই ভালো ছিলেন না? আমার তো মনে হয় গুটিকয়েক রাজনীতিবিদের জন্যই রাজনীতিকে মানুষ অন্য চোখে দেখে। কয়েক মাস আগে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। আলোচনা তো আর কম হয়নি, চায়ের কাপেও যথেষ্ট ঝড় উঠেছিলো। সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষও কি কম আলোচনা করেছেন? ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজের (নির্বাচকমন্ডলী) ভোটের মধ্যে জয়ী হতে হলে দরকার ২৭০ ভোট। অথচ বারাক ওবামা একাই পেয়েছেন ৩০৩ ভোট আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মিট রমনি পেয়েছেন ২০৬ ভোট। ফল ঘোষণার পর ওবামাকে অভিনন্দন জানিয়ে মিট রমনি ভাষণে বলেন, একটু আগেই ওবামাকে ফোন করেছি, তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি এবং তার সাথে যুক্ত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছি। শুধু এটাই না, এর আগেরবারেও জন ম্যাককেইন পরাজিত হয়েও একসাথে দেশের জন্য কাজ করার আশা ব্যক্ত করেছিলেন। আমাদের দেশে কি এটা ভাবা যায়? কিন্তু এটাই সত্যি। আর বাংলাদেশের নির্বাচনে এক দল জয়ী হলে অন্য দল অভিনন্দন দূরে থাক, আগে বলে চুরি করে তারা জয়ী হয়েছে। হায়-বাংলাদেশের রাজনীতি! আমার দেশে যেন পদ-পদবীই মুখ্য, জনগণের ও দেশের চিন্তা করে না কেউ। রাজনীতি যে দেশের জন্য, মানুষের জন্য এটা বাংলাদেশের রাজনীতি দেখে ভাবাই যাবে না। সবাই সবাইকে নিয়ে আছেন, দেশ গোল্লায় যাক, অত চিন্তা করতে পারবো না বাপু!
আমাদের দেশে বিরোধী দলকে কখনো কোন সরকারি দল দেখতে পারে না। বিরোধী দল যেন সরকারি দলের চরম শত্রু। বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে একজন আরেকজনকে দোষারোপের রাজনীতি। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও রাজনীতির যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না। কিন্তু পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে বিরোধীদের আস্থায় নিয়ে রাজনীতি করার। কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। যেমন,আব্রাহাম লিংকন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম রাষ্ট্রপতি। আব্রাহাম লিংকন কালো মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন। ১৮৬১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিংকন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হয়েই তিনি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস সৃষ্টি করেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় যে তিনজন তার সবচেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তারা হলেন: এডওয়ার্ড বেটস, উইলিয়াম সিওয়ার্ড এবং স্যালমন চেজ। তাদের সবাইকে তিনি মন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। সিওয়ার্ডকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, চেজকে অর্থমন্ত্রী ও বেটসকে করলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। লিংকনের মন্ত্রিপরিষদকে বলা হতো দ্য টিম অফ রাইভালস, মানে বিরোধীদের নিয়ে সংঘ। অথচ সেই মন্ত্রিপরিষদ আর বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদের মাঝে কত ব্যবধান তা ব্যাখ্যা করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
বিখ্যাত লেখক গুডউইনের একটি বই আছে “দ্য টিম অফ রাইভালস” নামে যা ২০০৫ সালে বেস্ট সেলার এবং এপর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বিলিয়ন কপি। বারাক ওবামাকে বলা হয়েছিলো যে, একটি বই নিয়ে আপনি হোয়াইট হাউসে যেতে পারবেন, তাহলে কোন বইটা নিবেন। বারাক ওবামা দ্য টিম অফ রাইভালস-এর কথা বলেছিলেন। এ তো গেল যুক্তরাষ্ট্রের কথা। টনি ব্লেয়ার যখন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন তার অসম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আরেক লেবার পার্টির নেতা গর্ডন ব্রাউন। তাদের ব্যক্তিগত বিরোধিতা এমন পর্যায়ে ছিলো যে একজনের মুখ আরেকজন দেখতে চাইতেন না। অথচ দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা করে সেই গর্ডন ব্রাউনকেই অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন টনি ব্লেয়ার। ঠিক একইভাবে ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা যখন দক্ষিণ অফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন তখন উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিযুক্ত করলেন শ্বেতাঙ্গ নেতা ও পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি ক্লার্ককে। ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা ম্যান্ডেলাকে বলতে শুরু করলেন যে, আমরা যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ক্ষমতায় এসেছি তাদেরকেই আবার ক্ষমতায় বসানো হচ্ছে? ম্যান্ডেলা বলেন, সাদারা অনেক বছর ক্ষমতায় ছিলো। দেশ পরিচালনায় তারা আমাদের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। আজ দেশের স্বার্থে ও দেশের মানুষের স্বার্থে সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমার বড়ই প্রয়োজন।
এভাবে বড় বড় বিশ্ব নেতারা কি বিরোধীদের ক্ষমতায় রেখে খুব ভুল করেছিলেন? তাদের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যাই থাকুক না কেন, তারা জনগণের কথা চিন্তা করে বিরোধীদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করেছেন। আর বাংলাদেশে? এইসব ব্যাপারে কেবল স্বপ্নেই দেখা সম্ভব। আমরা সুস্থ রাজনীতিতে কি ফিরতে পারবো না কখনো? ভালোবাসতে পারবো না দেশ ও দেশের মানুষকে? সেইদিন কবে আসবে যেদিন মানুষ রাজনীতিকে ঘৃণাত চোখে না দেখে সম্মানের চোখে দেখবে? বিরোধী দল সরকারি দল এক হয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করবে? আমরা সবাই সুন্দর গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমরা দেশকে ভালোবাসতে জানি, তা না হলে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমার ভাই-বোনেরা দেশকে স্বাধীন করতো না, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখতো না। আমরা সেই নোংরা রাজনীতি চাই না যে রাজনীতিতে মারামারি, হানাহানি ও কাটাকাটি আছে। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ, আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতি চাই, চাই অনাবিল শান্তি। আর সেজন্য প্রয়োজন পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করা, দল মত ভুলে দেশের স্বার্থে সবাই মিলে একসাথে কাজ করার অঙ্গীকার করা, নিজের জন্য রাজনীতি না করে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করা এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেওয়ার কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবেন।
লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
