ঝালে ঝোলে অম্বলে

বৃষ্টি, রাজনীতি, মাথা এবং ছাতা

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৩, ২১:৩১
মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার সৃষ্টি হওয়ায় সারাদেশে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি নাকি আরো কয়েকদিন চলবে। বৃষ্টিতে খানা-খন্দে আকীর্ণ রাস্তাঘাটের করুণ দশা সৃষ্টি হয়েছে। শহরতলিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। অনেক স্থানে প্রধান সড়কে জল জমে গেছে। যোগাযোগ ও চলাচলের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে ভয়ানক সমস্যা। এই বৃষ্টিতে শ্রমজীবী খেটে-খাওয়া মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের কবলে পড়লেও গ্রীষ্মের অসহনীয় তাপদাহ থেকে রক্ষা পেয়েছে পুরো দেশ। স্বস্তির বৃষ্টিতে কৃষকের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি। ওদিকে দেশের প্রধান ৪টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীদের ‘বিপুল বিজয়ানন্দে আত্মহারা’ বিরোধী দল আপাতত হরতাল-নৈরাজ্যের পথ থেকে সরে এসেছে। ফলে প্রাকৃতিক উত্তাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা রাজনৈতিক উত্তাপ আপাতত কমে গেছে। ফলে মধ্যবিত্ত নাগরিকরা আপাতত কিছুটা শান্তি-স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারি উদ্যোগ এবং তত্পরতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো কিছুটা চাঞ্চল্য দেখাচ্ছে। উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুইজন প্রার্থী নিয়ে। এই নির্বাচনে কে হারবে, কে জিতবে, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর গবেষণা ও মাথা-ব্যথার কোন শেষ নেই! সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করার বিষয়টি নিয়েও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে সরকারের নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন। পক্ষান্তরে ব্যবসায়ী, বিশেষজ্ঞ, বিরোধী দলসহ অনেকেই এটাকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে সমালোচনায় সরব হয়েছেন। তারপরও বলা যায় আপাতত বৃষ্টিজনিত কারণসহ বিভিন্ন জ্ঞাত ও অজ্ঞাত কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই ‘শীতল’ এবং ‘সহনীয়’। এই পরিস্থিতি দীর্ঘজীবী হোক-আমরা সেই কামনাই করি। এই বর্ষণমুখর ‘বাদল-দিনে’ আমরা বরং আজ রাজনীতির কচকচানি বাদ দিয়ে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ‘মাথা’ বাঁচানোর অনিবার্য এক উপাদান ‘ছাতা’ নিয়ে একটু আলোচনা করি। ছাতা এবং মাথা—একটির সঙ্গে অপরটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি ছাতার প্রসঙ্গ এলেও অনিবার্যভাবেই মাথা এসে যায়। প্রচণ্ড রোদ ও বর্ষা-বাদলের দিনে ছাতা ছাড়া মাথার কথা চিন্তাও করা যায় না। আসলে মাথা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার অন্ত নেই। শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গই হচ্ছে মাথা। সবকিছু বাদ দিলে হয়তো মাথা সচল থাকে; কিন্তু মাথা বাদ দিলে সমস্তই অচল। ‘হেড’ অফিসের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব ছাড়া সবাই অসার ও নিশ্চল। সুতরাং এ মাথাকে রক্ষা করতে আমাদের সারাক্ষণই মাথা ঘামাতে হয়। আমরা বলতে পারি, সবার উপরে মাথা সত্য তাহার উপরে নাই। আর এ হেডকে ‘শেড’ দিতে, রোদ-বৃষ্টির উত্পাত থেকে মাথাকে বাঁচাতে মানুষ সৃষ্টি করেছে ছাতা। মানুষের অনেক সুমহান সৃষ্টি, এমনকি অনেক সুমহান সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেলেও ছাতা আজো অক্ষয় কীর্তি হিসেবে টিকে আছে। মাথাকে বাঁচাতে ছাতার এ ভূমিকা সত্যিই বিস্ময়কর। ছাতার সঙ্গে মাথার এ চমত্কার সমপর্কের কারণে কবিও আনন্দে লিখেছেন: ‘পেটের উপর বুকে বসতি, বুকের উপর মাথা তাহারও উপর মুখের বসতি, মাথার ওপর ছাতা’। সমাজে কম-বেশি সবাই ছাতা ব্যবহার করেন। তবে সমাজে মাথার মূল্য যাদের যত বেশি, তারাই তত বেশি ছাতা ব্যবহার করেন। আমাদের সমাজে নিম্নবিত্ত গরিব, কৃষক, মজুর, মুটেরা খুব একটা ছাতা ব্যবহার করে না। কারণ তারা জানে, জীবনে তাদের মাথার মূল্য নেই, প্রয়োজনও নেই, মাথা খাটিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না। তাই তাদের মাথা রোদে-জলে খোলা থেকে ওয়াটার প্রুফ, অ্যান্টিম্যাগনেটিক হয়ে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের বেলায় তা হয় না। এই শ্রেণির লোকেরা মাথা খাটিয়ে এবং মাথা বেচেই খান। তাদের জীবনে মাথার মূল্যই বেশি। তাই তাদের মাথা বাঁচানোর জন্য ‘উপরে ছাতা’র দরকার হয়। যার যত মূল্যবান মাথা, তার তত মূল্যবান ছাতা। প্রতিটি বস্তুর যেমন একটি ইতিহাস থাকে, ছাতারও তেমনি একটি ইতিহাস আছে। অন্য অনেক জিনিসের মত ছাতার আইডিয়াটাও মানুষের মনে এসেছিল প্রকৃতির গাছপালা থেকে। আজো তাই রোদ-বৃষ্টিতে গাছের তলায় আমরা আশ্রয় নিই। সম্ভবত আদি মানবেরা লতাপাতার তৈরি ছাতা দিয়েই প্রথম যাত্রা শুরু করে। সভ্যতার বিবর্তনের পথ ধরে এসেছে কাপড়ের ছাতা, প্লাস্টিকের ছাতা। ছাতার আধুনিক সংস্করণই হচ্ছে ‘রেইন কোট’। বর্তমানে নানা রঙের, নানা বর্ণের, নানা সাইজের ছাতায় বাজার ছেয়ে গেছে। মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মাথাকে ছাতা চিরকাল প্রটেক্ট করে এসেছে। ছাতা শুধু চির সেবাতুর নয়, প্রটেকশন ও ‘পিস’-এর প্রতিমূর্তিও বটে। ছাতা নিরাশ্রয়ের আশ্রয় প্রতীক বলে আমরা আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয় ঘরবাড়িও যথেষ্ট ছাতার মত করে তৈরি করি। হিন্দুদের দেবতা আশ্রয় দেন, তাই দেবতার মন্দিরের ওপর ছাতা আশ্রয়ের প্রতীকরূপে বিরাজমান। রাজা প্রজাদের আশ্রয় দেন বলে রাজাদের যুগে রাজসিংহাসনের ওপর রাজছত্র দেখা যেত। সত্যিকার আশ্রয়দাতা কেউ সংসার থেকে বিদায় নিলে আজো আমরা বলি, মাথার ওপর থেকে ছাতা সরে গেলো। মানুষের জীবনে ও ইতিহাসে এই হলো ছাতার ভূমিকা। ছাতা মাথায় দিয়েই আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের মাথা বা বংশ রক্ষা করেছেন। তারা মাথা বাঁচাতে না পারলে আজ আমরা বেঁচে থাকতাম কি-না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। ছাতা দেখে অনেক সময় আমরা মানুষ চিনতে পারি। যার ছাতাতে যত বেশি তালি, জীবনে সে তত বেশি হোঁচট ও ঠোক্কর খাওয়া লোক। নতুন ছাতা যার, তিনি ছাতা হারাতে ওস্তাদ এবং অত্যন্ত ভাবপ্রবণ উদাসীন কবি প্রকৃতির মানুষ। আর যাদের ছাতা নেই, তারা অত্যন্ত সুবিধাবাদী তথা মতলববাজ। দরকারমত এর ওর ছাতার তলায় কাজ চালিয়ে নেন এবং নিজে কোনো দায় না নিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপতে চান। রাজনীতিবিদদের মত এই ছাতাহীন ব্যক্তিরাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ ধরনের লোক সম্পর্কে সতর্ক থাকাই ভালো। কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করার আগে জেনে নেয়া দরকার তিনি নিয়মিত ছাতা ব্যবহার করেন, না অন্যের ছাতা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেন। ছাতার প্রকার ভেদ আছে। ব্ল্যাক ছাতা, কালার ছাতা, ট্রাডিশনাল ছাতা, অটোমেটিক ছাতা। এমনকি ছাতার জেন্ডার পর্যন্ত আছে। ছাতার আকার এবং চেহারা দেখলেই এই ইকোফেমিনিজমের যুগেও লেডিস এবং জেন্টস ছাতা চেনা যায়। ছাতা আজ আর শুধু মাথায় সীমাবদ্ধ নেই। নিরক্ষর ‘নির্বোধ’ বাঙালি জাতিকে প্রজনন-নিয়ন্ত্রণের উপায়-উপাত্ত জানাতে ‘সবুজ ছাতা’র প্রতীক চালু হয়েছে। এই ‘সবুজ ছাতা’ অঙ্কিত অফিসে আপনি গেলেই প্রয়োজনীয় ‘সেবা’ পেতে পারেন। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ছাতা নামক ক্ষুদ্র বস্তুটির ভূমিকা সত্যিই অপরিসীম। ছাতাহীন অবস্থায় আমরা কেউই ভালোভাবে বাঁচতে পারি না। এ দেশে মতলববাজ, চোর-গুণ্ডা-বদমাইশ, খুনি-সন্ত্রাসী-লম্পট, চাঁদাবাজ সবাই আশ্রয় খোঁজে ক্ষমতাসীন দল বা প্রধান বিরোধী দলের ‘রাজনৈতিক ছাতা’র নিচে। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসার ছাতা হচ্ছে—কালো টাকার মালিক। আবার কালো টাকার মালিকদের ছাতা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও সরকার। দু’জনে দু’জনার। সরকারের ছাতা হচ্ছে আমলা, সেনা ও দাতাগোষ্ঠী। বিপদে পড়লে আমাদের দেশে কম-বেশি সবাই শক্তিমানের ছাতার নিচে আশ্রয় নেন বা আশ্রয় খোঁজেন। বর্তমান যুগে সাফল্যের অন্যতম শর্তই হচ্ছে যখন যার ছাতার তলায় লাভ বেশি, সেই ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়া। নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ হচ্ছে বুলি, অভিধানের অব্যবহূত শব্দ। সুযোগ মত ছাতা ধরতে পারলে অথবা যোগ্য ছাতার তলায় আশ্রয় পেলে অনেক কিছুই অর্জন করা যায়। শ’ শ’ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ, ব্যাংকের টাকা মেরে খাওয়ার সুযোগ, লাইসেন্স-পারমিট, মন্ত্রিত্ব-সবকিছুই বাগানো বা অর্জন করা সম্ভব। এদেশের আমজনতা ছাড়া সবারই কম-বেশি ছাতা আছে। আমজনতা নিজেরাই হচ্ছে ব্যাঙের ছাতা। অকারণে অবহেলায় জন্মায়, অতঃপর দলিত-মথিত হয়ে মারা পড়ে। ক্ষমতার পালাবদল হয়, সিংহাসনের ছাতা বদলে যায়। কিছু লোক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যায়। কিন্তু আমজনতার জীবনের ছাতার কোনো পরিবর্তন হয় না। মিছেই ওরা ‘আওয়ামী-ছাতা’, ‘বিএনপি-ছাতা’কে নিজের মনে করে। ওদের জীবনে আসলে কোনো ছাতাই নেই, নেই কোনো সান্ত্বনা। বর্ষাকালে যখন সবছাতা হাতে হাতে ফিরে, তখনো এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ছাতা-বঞ্চিতই থাকতে হয়! উল্লেখ্য, আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে ডাণ্ডা হিসেবেও ছাতা ব্যবহার হয়। আপদে-বিপদে জুতাপেটার মত ছাতাপেটাও মোটামুটি প্রচলিত। তবে ছাতার ব্যবহার ও গুরুত্ব যত বিচিত্রই হোক না কেন, মূলত ছাতা হচ্ছে ‘হারানোর জিনিস’। পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বেশি হারানো যায় সম্ভবত ছাতা (এর খুব কাছেই রয়েছে কলম ও প্রেমিকা)। বাঙালির আশার মত ছাতাও ‘এই আছে এই নেই’। ছাতা হারানো নিয়ে কত কেলেংকারি হতে পারে, সেটা অনুধাবন করতে তারাপদ রায় থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে: প্রিয় মেঘনাদ বাবু, গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমাদের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের বাসার কাজের ছেলেটি পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে চেয়ে এনে দিয়েছিল, সেই ছাতাটি পাশের বাড়ি ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছেন। ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি অফিসের বড়সাহেবের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলেন। বড়সাহেবের ভায়রাভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়সাহেবের ভায়রাভাই যে বন্ধুর কাছ থেকে ছাতাটি আনেন, সেই বন্ধুর মামা তার ছাতাটি ফেরত চাইছেন। ছাতাটি পত্রবাহকের হাতে ফেরত দিয়ে বাধিত করবেন। লেখক :কলামিষ্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন