বিজিএমইএ ভবন আর কতদিন টিকে থাকবে?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৩, ২১:৩২
সাধারণ মানুষ প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধরে নিয়েছিল যে, বিজিএমইএ সদস্যদের অদৃশ্য ক্ষমতার সাথে (যে ক্ষমতা বাহ্যত দেখা যায় না—কিন্তু নেপথ্য থেকে বাইরের ফলাফলকে ঠিকই নিয়ন্ত্রণ করে) সরকার বা জনগণ কিছুতেই পেরে উঠবেন না। ফলে আইন ও জনমতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিজিএমইএ ভবন হাতিরঝিলের বুক চিরে এর জলাভূমিতে ঠিকই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। এমনি পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে হঠাত্ করেই মহামান্য আদালত কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারির প্রেক্ষিতে মানুষ আবার অনেকটাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল যে, বিজিএমইএর পক্ষে এবার হয়তো আইনের বিধানকে আর তোয়াক্কা করা সম্ভবপর হবে না। কিন্তু উক্ত রুলের বিষয়ে শুনানি শেষে ইতোমধ্যে রায় প্রকাশিত হওয়ার পর বিজিএমইএর আপিলের প্রেক্ষিতে আবার তা ঝুলে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে ইতিপূর্বে জেগে ওঠা সে আশাবাদ ক্রমশই আবার ম্রিয়মাণ হয়ে পড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের প্রেক্ষিতে মানুষ আবার বিজিএমইএ ভবন নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছে যার মূল সুর হচ্ছে যে, দরিদ্র শ্রমিকের রক্ত শোষণ করে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় নির্মিত এ ভবনের সেখানে টিকে থাকার কোনোই অধিকার নেই। এরপরও যদি তা টিকে থাকে তাহলে সেটি হবে আইন, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি তাদের অব্যাহত স্বেচ্ছাচারিতামূলক অবজ্ঞা ও দৃষ্টিভঙ্গিকেই আরো এক ধাপ বাড়তে দেয়া। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, বিজিএমইএর সদস্যরা সব সরকারের সময়ই অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারকেও যে নানাভাবে প্রভাবিত করে ভবনটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ নিয়ে এখন আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, এটি আর এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই—আদালতের এখতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আর মহামান্য আদালত যেহেতু নিজেই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টির প্রতি নজর দিয়েছেন, সেহেতু এক্ষেত্রে রাষ্ট্র অর্থাত্ জনগণ অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে—সেটাই প্রত্যাশা। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, কোনো কারণে যদি বিজিএমইএ ভবন ভাঙা না হয় বা তা ভাঙতে বিলম্ব ঘটে, তাহলে জনগণের মধ্যে এ ধারণাই ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকবে যে, আইনের প্রয়োগে রাষ্ট্র বরাবরই সবলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, আর দুর্বলেরা তার বলির পাঁঠা। অবশ্য মার্কস্ও এ কথাই বলেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রই হচ্ছে শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।’ প্রায় বস্তিসম এ রাজধানীতে হাতিরঝিলের ছোট্ট নান্দনিকতা নগরবাসীর চোখ জুড়ালেও এর বুকে বিষফোঁড়ার মত দাঁড়িয়ে আছে ‘বিজিএমইএ ভবন’। এ বিষফোঁড়া অভিধাটি স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু তারপরও ওই ভবনটির অপসারণে বিন্দুমাত্র কোন অগ্রগতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টির পরিসীমাতে একেবারেই নেই। খাস বা রাষ্ট্রীয় জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত বস্তি যদি কখনো আগাম নোটিস দিয়ে আবার কখনোবা তা না দিয়েই উচ্ছেদ হতে পারে, তাহলে বিজিএমইএ ভবনের ক্ষেত্রে তদ্রূপটি ঘটাতে পারার মতো আইনগত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে বাধা কোথায়? এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চতর আদালতে আপিল করেছেন বলেই কি শুধু বিষয়টি আটকে আছে? সাধারণ মানুষ কিন্তু তা মনে করে না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে সেটিই প্রধান বাধা, তাহলেও প্রশ্ন আসে, সে বাধা অপসারণের কোন সুযোগই কি আর অবশিষ্ট নেই? আর যদি তা থেকেই থাকে তাহলে কার স্বার্থে আমরা এর সদ্ব্যবহার থেকে বিরত থাকছি? আসলে এ দেশে আইনের কঠোর প্রয়োগটুকু বুঝিবা কেবল বিত্তহীন দুর্বলের জন্যই প্রযোজ্য, আর এর ফাঁকফোকরটুকু প্রযোজ্য শুধু বিত্তবান ক্ষমতাশালীদের জন্য। আইনের এই যে বৈষম্যমূলক প্রয়োগ, বস্তুত সেটাই পাপখণ্ডসম ওই বিজিএমইএ ভবনকে হাতিরঝিলের বুকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করেছে। মহামান্য আদালত, হলফ করে বলতে পারি, সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নির্দেশনা জারি না করলে দিনাজপুরের ইয়াসমীন, মৌলভীবাজারের কিংবা আমিনবাজারের ৬ তরুণ হত্যার বিচার কোনদিনই হতো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের উপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় আদালত যদি স্বউদ্যোগী হয়ে এগিয়ে না আসতো, তাহলে তার পরিণতি কোথায় যেয়ে দাঁড়াতো আমরা কেউই তা জানি না। অতএব মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আমরা সত্যি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কথা হচ্ছে, এতদিনেও বিজিএমইএ ভবন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনায় সাধারণ মানুষ এখন অনেকটাই হতাশ। আর রানা প্লাজা ধসের পরদিন উক্ত ভবনে ঢিল ছুঁড়ে মারার চেষ্টা তারই বহিঃপ্রকাশ (ঢিল ছোঁড়াকে সমর্থন করা হচ্ছে না)। ফলে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি জনগণের এ হতাশা দূর করার জন্যও বিজিএমইএ ভবনের বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে ত্বরিত চূড়ান্ত রায় পাওয়াটা খুবই জরুরি। আর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে এ ভবন অপসারণ সংক্রান্ত জনপ্রত্যাশা পূরণ হলে এর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিজিএমইএ’র সব সদস্যের মধ্যেই কমবেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেটি পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে তাদেরকে কিছুটা হলেও উদ্যোগী হতে বাধ্য করবে বলে আশা করা যায়। বিজিএমইএ’র প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই এবং তা থাকার কোনো কারণও নেই। তবে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি বলবার অধিকার অবশ্যই আছে যে, একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই, তা সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালীই হোন না কেন, আইন ও বিধিবিধানের আওতায় তাদেরকে আনতেই হবে; এবং তা আনা হলে এবং সে প্রক্রিয়ায় বিজিএমইএ ভবন ভেঙে দেয়া হলে এটি সাধারণ মানুষের সামনে আইনের শাসনের একটি রেফারেন্সযোগ্য অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আর এ দৃষ্টান্ত সামনে থাকলে বিত্তের দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করা প্রভাবশালীরা ভবিষ্যতে যেকোনো অনিয়ম করতে চাইলে তার আগে দশবার চিন্তা করবে। অন্যদিকে এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। আর বলা প্রয়োজন যে, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসই কেবল একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে বেগবান ও টেকসই করে তুলতে পারে। ফলে বিজিএমইএ ভবন ভেঙ্গে ফেলার প্রসঙ্গটিকে আপাতদৃষ্টে শুধুই একটি বিচারিক পরিসমাপ্তির বিষয় মনে হলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় এর একটি বিশেষ তাত্পর্য রয়েছে বৈকি! আইনি প্রক্রিয়ায় বিজেএমইএ ভবন ভেঙ্গে ফেলার মধ্য দিয়ে সে তাত্পর্যময়তা বাড়তি উজ্জ্বলতা খুঁজে পাবে—সেটাই প্রত্যাশা। লেখক : পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন