নারীদের সুরক্ষায় দেশে নানান আইন থাকিলেও সেইসব আইন কোনো কাজে আসিতেছে না, নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়িয়াই চলিয়াছে। সব শ্রেণির নারীই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হইতেছেন। সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হইতেছে, নিজ ঘরে বা পরিবারে নারী ব্যাপকভাবে নির্যাতিত হইতেছে। নির্যাতনকারীর ভূমিকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষকেই দেখা যায়। ঘরেই নারী বাবা, ভাই ও স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হন। ঘরের বাইরে রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই নারী নিরাপত্তাহীন। ধর্ষণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রেমের প্রস্তাবে বা বিয়েতে রাজি না হইলে নারীকে ধর্ষণ করা হইতেছে, ছুঁড়িয়া মারা হইতেছে অ্যাসিড। ধর্ষকদের হাত হইতে রেহাই পাইতেছে না ছোট শিশুও। মুঠোফোনে ধর্ষণের ছবি তুলিয়া তাহা শহরময় ছড়াইয়া দেওয়া হইতেছে। অনেক সময় ধর্ষণের পর হত্যাও করা হইতছে। এইসব ঘটনায় মামলা হইলেও অনেক সময় বিচার হয় না।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে, ২০০৮ সালে নারী নির্যাতনের যত ঘটনা ঘটিয়াছে, ২০১২ সালে ঘটিয়াছে তাহার চাইতে অনেক বেশি। ২০০৮ সালে নারীর উপর অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়াছে ৮৮টি। ২০১২ সালের জানুয়ারি হইতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়াছে ৯৭টি। অর্থাত্, অ্যাসিড নিক্ষেপের হার বাড়িয়াছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০০৮ সালে যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়াছে ২৬৯টি। ২০১২ সালে ঘটিয়াছে ৭৭১টি। অর্থাত্, এই ক্ষেত্রে নির্যাতনের হার বাড়িয়াছে ৪৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ধর্ষণের হার বাড়িয়াছে ১৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে শক্ত আইন হইয়াছে। সরকারি ও বেসরকারি নানান প্রতিষ্ঠান নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে পৃথকভাবে অথবা যৌথভাবে কাজ করিয়া যাইতেছে। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজও এই ক্ষেত্রে তত্পর। অথচ এই সকল প্রতিরোধ উদ্যোগ কাজে আসিতেছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা না কমিয়া বাড়িয়া যাইতেছে। নারী আগের তুলনায় ঘরের বাহিরে আসিয়া কাজ করিতেছে, তাহার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও বাড়িতেছে। কিন্তু নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসিতেছে না। নারীর প্রতি সহিংসতার পিছনে মূল কারণ হইল অনভিপ্রেত পুরুষতান্ত্রিক অহম। এই অহমের প্রকাশ পুরুষ তেজোদ্দীপ্তভাবে প্রকাশ করিতে চাহে এই কারণে যে, সে নারীর চাইতে সকল অর্থে ক্ষমতাবান। অ্যাসিড নিক্ষেপ, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনার পিছনে থাকে প্রেম প্রস্তাব বা বিয়ের প্রস্তাব করিয়া প্রত্যাখ্যাত হইবার ঘটনা। প্রত্যাখ্যানের জ্বালা পুরুষ সহ্য করিতে পারে না। আমাদের প্রত্যেকেরই এই যৌক্তিক মনন গড়িয়া তুলিবার শিক্ষা নেওয়া বা দেওয়ার দরকার যে, কাহারও দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়াটাই জীবনের সকল কিছু নহে। একজনের অধিকার আছে অন্যকে প্রত্যাখ্যান করিবার। একজন প্রত্যাখ্যান করিলেও হয়তো অন্য কেহ তাহার বাড়াইয়া দেওয়া হাত সাগ্রহে স্পর্শ করিবে। ফলে পুরুষতান্ত্রিক অহমের জায়গায় পরিবর্তন আনয়ন অধিক জরুরি। এই স্থলে পরিবর্তন না আসিলে আইন-কানুন প্রকৃত অর্থেই বিফলে যাইবে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আমাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়েও কাজ করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অধিকতর জরুরি।
