সাভার রানা প্লাজায় সাম্প্রতিককালে যে Man made ট্র্যাজিডি ঘটেছে এটি বাংলাদেশের জন্যে অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি দেশের প্রচলিত আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে যেভাবে বিল্ডিং এর নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে- তা আসলে আমাদের এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যকার লোভ-লালসার পরিচায়ক। এই ট্র্যাজেডির ফলে ১১৩০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে এবং প্রায় দু’সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছে। সাভার রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য মূলতঃ দায়ী এক শ্রেণীর মানুষের আইন না মানার প্রবণতা। একটি দেশ যখন উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশে পরিণত হতে যায়, তখন শ্রমিক বঞ্চনা-শোষণ থাকে- যা অবশ্য নিন্দনীয় হলেও ইতিহাস বলে সব দেশে শিল্প বিপ্লবের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে থাকে। সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- শ্রমিক বঞ্চনা ও শ্রম আইনের লঙ্ঘন রাষ্ট্রটিকে পদে পদে কিভাবে দলিত-মথিত করছে। কেবল রানা প্লাজা নয়, বাংলাদেশের খোদ ঢাকা নগরীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিল্ডিং-এর নকশা না মেনে বিল্ডিং তৈরি করা, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিল্ডিং গড়ে তোলা, বিল্ডিং-এ ইচ্ছেমত পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কেবল সরকারের মুখাপেক্ষী থাকলেই চলবে না বরং বেসরকারি উদ্যোগ ও ব্যক্তিগতভাবে Ethical values মেনে চলতে হবে। সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডিতে যাদের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে তাদের জন্যে সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সাথে যারা আহত হয়েছেন তাদের পুর্নবাসনের জন্যে এগিয়ে আসতে বেসরকারি খাতকে আহবান জানাচ্ছি।
ইতোমধ্যে সাভার রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, তাজরীন ফ্যাশনসহ বিভিন্ন গার্মেন্টসে বারবার অগ্নিকাণ্ডে মানুষের মৃত্যু এবং শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার বিচার না হওয়ায় দেশের ভাবমূর্তি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে বরং বেসরকারি উদ্যোক্তারাই দায়ী। একটি কারখানা কিভাবে চলবে, তার সিদ্ধান্ত নেবেন তার মালিক। অবশ্যই সরকারের নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন রয়েছে। কিন্তু সে নিয়ম-কানুনগুলো অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা মানতে চান না। আবার অনেকে জানেনও না। সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পূর্বে তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৫ জন মানুষ মারা যান। এই যে মৃত্যু তারপরও কিন্তু কারখানার পরিবেশ সবাই ঠিক করতে ইচ্ছুক নন। যদিও সরকার বারবার তাগিদ দিয়েছেন। কিছু কিছু উদ্যোক্তা অবশ্য ব্যতিক্রম আছেন। ব্যতিক্রম দিয়ে তো একটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এটি ঠিক, উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে একটি কঠিন সময়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি অতিক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে গত এক দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ থেকে ৬.৫% হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে পোশাক শিল্প খাত থেকে Value Addition হওয়া এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা Brain gain হিসাবে দেশে অর্থ প্রেরণ করে থাকে। নচেত্ এদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক সংকটে এবং আরব স্প্রিং-এর মধ্যেও এতো ভাল অবস্থায় থাকত না। বাংলাদেশের Trade composition যদি পর্যালোচনা করা যায় তবে দেখব যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পোশাক খাতের ভূমিকা অনেকখানি মুখ্য। বাংলাদেশে প্রেরিত বিদেশে তৈরি পোশাক খাতের ৬০% যায় ইউরোপে, ২৪% যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ৫% যায় কানাডায়। অষ্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ভিক্টোরিয়া ওয়াইজ মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশের সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি একটি মর্মান্তিক ঘটনা এবং Corporate Governance-এর অভাবেই এমনটি ঘটেছে। একশ্রেণীর পণ্ডিত এদেশে আছেন যারা সরকারের ভূমিকাকে গৌণ করতে এবং সরকার regulator নয় বরং facilator হিসাবে কাজ করবে বলে মন্তব্য রেখে থাকেন। কিন্তু তারাই আবার বিভিন্ন সময়ে বৈপরীত্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পর দ্রুত যখন উদ্ধার কাজ চলছিল, তখন দেশের একজন বরেণ্য প্রকৌশলী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মতামত ব্যক্ত করলেন যে, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্যে। উনার ভাষ্যমতে যদি কলকাতা থেকে যন্ত্রপাতি আনার ব্যবস্থাও সড়কপথে হতো- তাহলে ন্যূনতম ১৬ ঘণ্টা লেগে যেত। প্রশ্ন থেকে যায় কলকাতায় এ ধরনের উদ্ধার কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রয়েছে কিনা? বরং বেসরকারি উদ্যোগ, সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, ফায়ার ব্রিগেড ও প্রশাসন যন্ত্র সম্মিলিতভাবে যত কম ক্ষয়ক্ষতি হয় তার মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করেছেন উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করতে। দুঃখজনক ও বেদনাহতের বিষয় হচ্ছে এরপরও ১১৩০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আসলে সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করায়, অমিত লোভ মানুষকে কতখানি নির্দয়ভাবে নিষ্পেষিত করতে পারে। সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির সাথে তুলনা চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতাধিক বছর আগে ঘটে যাওয়া এ ধরনের দুর্ঘটনার বিষয়টি।
সাভার রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর একে নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর এক ধরনের উত্সাহ পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের শ্রমবাজার সস্তা হওয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। প্রায় বিশ বিলিয়ন কোটি টাকা পোশাক খাত থেকে এসে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেমন সমবেদনা জানিয়েছে অন্যদিকে কিছু কিছু দেশ এটিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এবং আন্তর্জাতিক আইন-কানুনকে সুসংহত না করার উপায় হিসাবে বিবেচনা করেছে। এই পোশাক শিল্প খাত দেশের নারীর ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করেছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, গ্রামীণ ও শহরের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সহায়তা করেছে। আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ম্যধ্যমে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে Decision making process of the family-তে নারীর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়েও ১.৭% হারে বর্তমানে দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে। এক্ষেত্রে এনজিও বা গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়েও বড় অবদান হচ্ছে পোশাক শিল্প খাতের।
সেণ্টার ফর ব্র্যাক থ্রো থিংকিং ইন বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে একটি সরেজমিন জরীপে দেখা যায় যে, গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে ৪১% মনে করেন যে, পোশাক খাতের অবদান, ২৭% মনে করেন যে, বিদেশ থেকে প্রবাসী কর্তৃক অর্থ প্রেরণ; এনজিও সমূহ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সম্মিলিত অবদান ৯%; ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা ৫% এবং অন্যান্য ১৮%। ঐ জরিপেই আবার দেখা গেছে যে, গ্রামীণ এলাকায় নারীর ক্ষমতায়নে ৫৭% ভূমিকা পালন করছে পোশাক শিল্প খাত; এনজিওসমূহ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সম্মিলিত ভূমিকা হচ্ছে মাত্র ১১%। সরকারি সংস্থাগুলো অবশ্য আগের তুলনায় দারিদ্র্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারছে না। জরিপে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে আর তা হচ্ছে যে, সরকার যে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধীদের ভাতা দিচ্ছেন তা খুব ভাল বলে গ্রামীণ এলাকার লোকেরা মনে করলেও তাদের দাবি গ্রামীণ এলাকার পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সরাসরি বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করার।
২০০৬ সালে বাংলাদেশের যে শ্রম আইন ছিল তা অনেক ক্ষেত্রেই শিল্প উদ্যোক্তারা মানতেন না। যদি মানতেন তবে পোশাক খাতে এ ধরনের বারবার বিপর্যয় নেমে আসত না। যারা Internal এবং External stakeholder আছেন তারাও কিন্তু তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই একবার ন্যূনতম মজুরি পোশাক শিল্প খাতের জন্যে ৩০০০ টাকা মাসিক ঘোষণা করেন। আবার বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এনে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির জন্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এটি ১লা মে থেকে retrospective effect দিয়ে কার্যকর করা হবে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনকে সংশোধন করে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ILO এর নেতৃত্বে সরকার-মালিক ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে বলা হয়ে থাকে যে, ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশ পোশাক শিল্প খাতে করার কোন ব্যবস্থা নেই। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়ন পোশাক শিল্প খাতে না করা গেলেও অন্য সমস্ত এলাকায় করার উপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। এবং অনেক পোশাক কারখানাতেই ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে।
সাভার রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ শিরোনাম হয়ে উঠে। এই ট্র্যাজিক ঘটনার পর বিভিন্ন দেশের খুচরা ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অধিকাংশ খুচরা পোশাক ক্রেতা অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক তাদের দেশে আমদানি না করলে বাংলাদেশ আবার দরিদ্র দেশে পরিণত হবে। এবং এটি বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রকে বাধাগ্রস্ত করবে। সহানুভূতির সাথে বিষয়টি বিবেচনার জন্যে অধিকাংশ খুচরা ক্রেতারা বলেছিলেন। আবার বিদেশি কোন কোন গণমাধ্যমে এমন বক্তব্যও এসেছিল যে, বিদেশি (পাইকারী) ক্রেতারা স্বল্পমূল্য দেয়ায় বাংলাদেশের পোশাক নির্মাতাদের পক্ষে একটি উপযুক্ত পরিবেশে কাজ করার কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।
এমনিতেই বাংলাদেশের পক্ষে জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ পোশাক শিল্প খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশি একটি অনুভূত হতো না। কেননা বাংলাদেশের পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে আগের তুলনায় অনেক কড়াকড়ির মধ্যে ইতোমধ্যে পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি সুবিধা স্থগিতের ঘোষণা বাংলাদেশের জন্যে অশনিসংকেত স্বরূপ। মার্কিন প্রেসিডেণ্ট বারাক ওবামা মন্তব্য করেছেন যে, “উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশে প্রদেয় জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া উচিত।” আসলে তার এই মন্তব্যটি আমাদের জন্যে দুঃখজনক। কেননা শ্রম পরিবেশ উন্নয়নের জন্যে সরকার ও মালিক উভয় পক্ষ যে সমস্ত পদক্ষেপ ধীরে ধীরে নিচ্ছিলেন তা এখন হুমকির মুখে পড়বে। কেননা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এক ধরনের সিগন্যাল দেয় যা ঋণাত্মক তবে সেটি হবে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং রাষ্ট্রে Vicious circle of poverty তৈরি করতে পারে। একটি উন্নয়নশীল দেশের শ্রমমান উন্নত দেশের সমকক্ষ হওয়া খুবই অসম্ভব ব্যাপার। শ্রমমানের উন্নয়নের নিয়মই হচ্ছে যতবেশি competitive advantage বাংলাদেশ forward ও backward linkage এর মাধ্যমে অনুভব করবে তত দেশের জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে। মাইকেল পোর্টারের ফাইভ ফোর্সেস মডেলকে যদি বিবেচনায় আনি তবে দেখব যে, সস্তা শ্রমশক্তি বাংলাদেশের জন্যে Bargaining power। ধীরে ধীরে যে সক্ষমতা বাংলাদেশ অর্জন করছে তা দেশকে উত্সাহিত করছে জীবনমান উন্নয়নে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যই শ্রমমানে পড়েছে। রাতারাতি আন্তর্জাতিক Benchmarking অর্জন করা বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে পোশাক শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ হচ্ছেন দ্বিতীয় বা তৃতীয় জেনারেশানের। তাদের ভুলত্রুটি অবশ্যই রয়েছে। এই অবস্থায় হঠাত্ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ স্থগিত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকটা অবাক করার মত বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে কর্মপরিবেশের মান উন্নয়নে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দেয়া রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হয় কেবল তাহলে জিএসপি সুবিধা বহাল হবে। তার এই মন্তব্য একদিকে যেমন আশা দেয় তেমনি প্রশ্ন জাগায়, জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ যদি স্থগিত না করে বরং রোডম্যাপটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হতো তবে বাংলাদেশের বিশেষতঃ পোশাক শিল্প খাতে কর্মরত ৮০% নারী শ্রমিকদের লাভ হতো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের আচরণ দুঃখজনক। পোশাক শিল্প খাতের এই ক্রান্তিলগ্নে ড. মুহম্মদ ইউনূস-কে বাংলাদেশের মানুষ এখন পর্যন্ত কিছু উপদেশ ছাড়া পাশে পায়নি। বরং তিনি সামাজিক ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। যদিও জিএসপি ফ্যাসিলিটিজের মাধ্যমে ৫,০০০ বাংলাদেশি পণ্যের ডিউটি ফ্রী প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার কথা তবে পোশাক শিল্প খাতে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধাসহ প্রবেশের অনুমতি পায় না। তবে এই স্থগিতকরণ বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক না ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তার উপর ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ভূমিকা ভবিষ্যতে নেতিবাচক হলে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যে এটি মন্দ বার্তা নিয়ে আসবে। আশার কথা যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ডেলিগেশানের প্রধান উইলিয়াম হান্না অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, তারা জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ বন্ধ করবেন না কিংবা স্থগিত করবেন না। বরং তারা বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে সহায়তা প্রদান করবেন, যার জন্যে সরকার, পোশাক প্রস্তুতকারী এবং ক্রেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মপরিবেশ উন্নতকরণে সহায়তা প্রদান করবেন। এ জন্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৮ই জুলাই জেনেভা সফর করবেন। সেখানে ক্রেতা ও আইএলও-র প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সংযোগের মাধ্যমে একটি কর্মপরিবেশ তৈরির সকল ব্যবস্থাপনা গঠিত হবে বলে আশা করা যায়।
বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংশোধন, মন্ত্রী পরিষদ কর্তৃক পোশাক কারখানা পরিবেশের মান উন্নয়নের জন্যে প্রচেষ্টা নিয়েছে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর্মপরিবেশের মান উন্নত করার জন্যে নানাবিধ প্রয়াস নিয়েছেন। তবে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী আছেন যারা উন্নত কর্মপরিবেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি সব সময়ে করে থাকেন। তাদের জন্যেই প্রকৃত ও সত্ উদ্যোক্তারা সব সময়েই ঠকে থাকেন। এই জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ স্থগিত করার ফলে বিদেশি পাইকারী ক্রেতাদের একটি অংশ অন্য দেশ থেকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। ইতোমধ্যে ওয়াল মার্ট সহ বেশকিছু নামি কোম্পানি বাংলাদেশের শ্রমমান উন্নয়ন ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্যে বেশকিছু প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপির ফলে মাত্র ১% অর্থাত্ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্যের সুবিধা ভোগ করে থাকে।
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশের আর্থিক উন্নয়নের জন্যে জিএসপি ফ্যাসিলিটিজ স্থগিতকরণ একটি দুঃখজনক ঘটনা। টিকফা চুক্তিটি স্বাক্ষর করার বিষয়টি যেখানে সক্রিয় বিবেচনাধীন, সেখানে এই স্থগিতকরণের ফলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাণিজ্যের বৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বর্তমান যেখানে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তা ব্যাহত হবে তেমনি ব্যষ্টিক অর্থনীতিতেও ক্ষতি হবে। দীর্ঘমেয়াদের জন্যে অবশ্যই রপ্তানি পণ্য বহুধাবিভক্তকরণ করা প্রয়োজন। এজন্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক টিম গঠন করতে হবে যেখানে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকারকর্মী, পেশাদার কূটনৈতিকবৃন্দ, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে এই স্থগিতকরণ যাতে প্রত্যাহার করা যায় সে জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আলাপ-আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা বাংলাদেশে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে ২০১২ সালে বাংলাদেশ মার্কিন ডলার ২৪ বিলিয়ন পণ্য রপ্তানি করেছে যার ২১% হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আসলে জিএসপি সুবিধা স্থগিতকরণের ফলে স্বল্পকালীন সময়ে তেমন ক্ষতি না হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হতে পারে। আশা করব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষতিকারক প্রভাবের হাত থেকে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্যে স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার করবেন।
একই সাথে প্রতিটি কারখানায় যাতে কর্মপরিবেশ গড়ে উঠে, সে জন্যে কেবল সরকার নয় উদ্যোক্তারাও ব্যবস্থা নেবেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান থেকে উপরে উঠবে নাকি আরো নিচে নেমে যাবে সে ক্ষেত্রে কেবল কর্মপরিবেশ নয়, political decision-ও ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করবে। প্রতিটি কারখানায় যাতে Corporate Governance-এর ব্যবস্থা থাকে এবং কর্মপরিবেশ ভাল হয় সে জন্যে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আরো অধিক হারে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকার বাইরে এমন সব স্থানে গার্মেন্টস পল্লী গড়ে তুলতে হবে যেখানে গ্যাস-বিদ্যুত্-যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি আগুন লাগলে নেভানোর ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে হলে “নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ” পরিবেশ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্ধ করতে হবে; মালিকেরা যেমন শ্রমিকদের দেখাশোনা করবেন, তেমনি শ্রমিকদের উচিত হবে কারখানাকে নিজের বলে ভাবা এবং কথায় কথায় ভাঙচুর বন্ধ করতে হবে। আশা করা যায়, সাময়িক বিভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাত এগিয়ে যাবে। অন্ধকারের পথ কেটে আলোর উজ্জ্বল পথে বাংলাদেশ যাত্রা করবে এই প্রত্যাশা রইলো এবং স্থগিতাদেশ দু’মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে বলে আশা করছি।
লেখক: উপাচার্য, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ব্র্যাক থ্রো থিংকিং ইন বাংলাদেশ, ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনোমিস্ট
ই-মেইল: [email protected]
